ক্যাটেগরিঃ bdnews24

রিয়াজুল বাশার
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

ঢাকা, জুলাই ২৬ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- সরকার পুঁজিবাজারে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ায় কর কর্তৃপক্ষের আইনি ক্ষমতা খর্ব হওয়ার পাশাপশি মুদ্রা পাচার ও সন্ত্রাসী অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আন্তঃসরকার সংস্থা এশিয়া প্যাসিফিক গ্র”প অন মানি লন্ডারিং (এপিজিএমএল)।

পুঁজিবাজারে কোন প্রক্রিয়ায় অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হবে তা জানতে চেয়ে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের জন্যও সরকারকে তাগিদ দিয়েছে আন্তর্জাতিক এ সংগঠন।

অবশ্য অর্থমন্ত্রী মনে করেন, এটি বড় কোনো বিষয় নয়। সরকার ইতোমধ্যে ২০০৯ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে এবং ‘শিগগিরই’ তা চূড়ান্ত করা হবে কলে জানিয়েছেন তিনি।

থাইল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন এপিজিএমএল মুদ্রা পাচার প্রতিরোধে কাজ করে। বাংলাদেশও এ সংগঠনের সদস্য।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের ‘চাপে’ চলতি অর্থবছরের বাজেটে ১০ শতাংশ কর দিয়ে শেয়ার বাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ রাখেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। পাশাপাশি সরকারি ট্রেজারি বন্ডেও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়।

দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্যবসায়ী মহলসহ বিনিয়োগকারীরা এ বিষয়টিকে স্বাগত জানালেও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এর বিরোধিতা করে। তাদের বক্তব্য কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রচলিত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অর্থমন্ত্রী ২৮ জুন জাতীয় সংসদে সরকারের ওই সিদ্ধান্ত জানানোর পর ১ জুলাই এপিজিএমএল সচিবালয় থেকে এক চিঠিতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। ওই চিঠির একটি অনুলিপি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের হাতে এসেছে।

কালো টাকা সাদা করতে দেওয়ায় কর সংক্রান্ত আইন প্রয়োগের সুযোগ সীমিত হচ্ছে কি না- তা বোঝার জন্য অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে সরকারকে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয় ওই চিঠিতে। এছাড়া বিগত বছরগুলোতে এই সুযোগ নেওয়ার পর কারো বিরুদ্ধে কর ফাঁকি ছাড়া মুদ্রা পাচার বা অন্য কোনো আইনের আওতায় তদন্ত হয়েছে কি-না সে সম্পর্কিত তথ্যও জানতে চায় এপিজিএমএল।

এর জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী এক চিঠিতে বলেন, “অর্থমন্ত্রী বিদেশে রয়েছেন। তিনি ফিরলে সরকার অবস্থান জানাবে।”

এরপর ৫ জুলাই আরেকটি চিঠিতে এপিজিএমএল জানতে চায়- ‘অপ্রদর্শিত আয়’ বিনা প্রশ্নে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হলে মুদ্রা পাচারের ঘটনার তদন্ত ও এ সংক্রান্ত আইনের প্রয়োগ সরকার কীভাবে করবে। এ ধরনের সুযোগ নিয়ে কেউ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করলে সে বিষয়ে এনবিআর স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও ফাইনান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটকে তথ্য দেবে কি-না, তাও জানতে চাওয়া হয়।

২০০৯ সালে বাংলাদেশের ‘মিউচুয়াল ইভালুয়েশন রিপোর্ট’ (এমইআর) নেওয়ার সময়ও এপিজিএমএল সদস্য রাষ্ট্রগুলো কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছিল বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেটে (২০০৯-১০) পুঁজিবাজারসহ চারটি খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখেন অর্থমন্ত্রী। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে প্রায় ৪২৩ কোটি ‘কালো’ টাকা পুঁজিবাজারে খাটানো হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান গত শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সন্ত্রাসী অর্থায়ন যেন না হয় তা দেখতে বলেছে এপিজিএমএল। অর্থ মন্ত্রণালয় এর জবাব পাঠিয়েছে। কর আদায় বাড়ানোর জন্যই এ সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে তাদের জানিয়েছে সরকার।”

এপিজিএমএল সচিবালয় বাংলাদেশ সরকারকে জানায়, এ ধরনের সুযোগ দেওয়ায় ফলে মুদ্রা পাচার আইন প্রয়োগের সুযোগ কমে আসবে। পাশাপাশি এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রও সীমিত হয়ে আসবে।

বিনাপ্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দিলে সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ফাইনান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের সঙ্গে কর কর্তৃপক্ষের স্বতঃস্ফূর্ত তথ্য আদান প্রদানে বাধা সৃষ্টি হবে উল্লেখ করে সংস্থাটির চিঠিতে বলা হয়, এ ধরনের তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একটি মানসম্মত পদ্ধতি চালু না থাকলে মুদ্রা পাচারসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে।

মুদ্রাপাচার সংক্রান্ত অপরাধ দমনের বিষয়টি অতীতে এপিজিএমএলের সদস্যপদের শর্ত পূরণের ক্ষেত্রে ‘গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে বলেও জানায় সংগঠনটি।

কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে কয়েকটি ‘সুপারিশ’ পাঠিয়েছে এপিজিএমএল সচিবালয়।

এতে বলা হয়েছে, এ সুযোগের মাধ্যমে মুদ্রাপাচার বা সন্ত্রাসী অর্থায়ন হবে না- বাংলাদেশকে সে নিশ্চয়তা দিতে হবে। এই সুযোগ নিয়ে মুদ্রা পাচার বা সন্ত্রাসী অর্থায়নের অভিযোগ উঠলে তা তদন্তের সুযোগ রাখতে হবে। আইন সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত আগস্ট থেকে প্রতি মাসে এপিজিএমএলকে প্রতিবেদন পাঠাতে হবে এবং ৩০ ডিসেম্বরের আগে ‘সন্তোষজনক’ অগ্রগতি না হলে তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটি বড় কোনো বিষয় না। অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করা সুযোগ দিলে আমাদের আয়কর আইনে কোনো প্রশ্ন করা যায় না।”

মন্ত্রী বলেন, “২০০৯ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনেও এ বিষয়টি নেই। এ আইন সংশোধন করে সেখানে প্রশ্ন করার সুযোগের বিষয়টি যুক্ত করা হবে।”

সরকার শিগগিরই এ আইন সংশোধন করবে বলেও জানান তিনি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/আরবি/জেকে/২০৪১ ঘ.