ক্যাটেগরিঃ bdnews24

 

ঢাকা, জুলাই ৩০ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- সম্পদের ‘সৃজনশীল’ ব্যবহার দেশের অটিস্টিক শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে পারে বলে মনে করেন সদ্যসমাপ্ত আন্তর্জাতিক অটিজম সম্মেলনের অন্যতম উদ্যোক্তা সায়মা হোসেন পুতুল।

তার মতে, এক্ষেত্রে পারিবারিক বন্ধন, স্বাস্থ্যসেবার প্রাচুর্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

প্রধানমন্ত্রীকন্যা সায়মা হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে অটিজম সম্মেলন প্রসঙ্গে বলেন, প্রতিবন্ধিতা নিয়ে যারা কাজ করে তাদের জন্য ওই সম্মেলন বিরাট প্রেরণা।

দক্ষিণ এশিয়ায় অটিজম বিষয়ক প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় গত মঙ্গল ও বুধবার।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্কুল সাইকোলজিস্ট’ সায়মা বলেন, “অটিস্টিকদের সেবার জন্য অতিরিক্ত বিনিয়োগের কোনো প্রয়োজন নেই। বর্তমানে যে সম্পদ রয়েছে তার সৃজনশীল ব্যবহার প্রয়োজন।”

শৈশবের কোনো পর্যায়ে বুদ্ধিমত্তার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলা হয় অটিজম। এ ধরনের শিশুদের মস্তিষ্কের গঠন হয় অন্যদের চেয়ে আলাদা। ফলে তারা অন্যদের মতো করে নিজের যতœ নেওয়া শেখে না। নিজে নিজে কাপড় পরা, একা একা খাওয়া বা টয়লেট করা কিংবা অন্যদের কাছে নিজের প্রয়োজন বা ইচ্ছার কথা প্রকাশ করা শিখতেও তাদের সমস্যা হয়।

অটিজমে ভোগা শিশুর সংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশে কোনো সরকারি হিসাব নেই। তবে একটি বেসরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখের মধ্যে ২৫০টি অটিস্টিক শিশু।

‘আঞ্চলিক আন্তর্জাতিক সমর্থন পেয়েছি’

সরকারের বর্তমান বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনায় অটিজমকে অন্তর্ভুক্ত করার তাগিদ দেন সায়মা হোসেন।

তিনি বলেন, “অটিজম বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে আমরা এ অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতা, বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমর্থন পেয়েছি।”

“এ সম্মেলনের মাধ্যমে অটিজম সচেতনতায় বাংলাদেশ আদর্শ হয়ে উঠেছে।”

সরকারের সহায়তায় এ সম্মেলন আয়োজন করে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অটিজম স্পিক্স। এতে ভারতের কংগ্রেস পার্টির সভাপতি সোনিয়া গান্ধী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শ্রীলঙ্কার ফার্স্ট লেডি শিরান্থি রাজাপাকশা এবং মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্টের স্ত্রী ইলহাম হুসাইন। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধিও এ সম্মেলনে অংশ নেন।

এ সম্মেলনকে শুরু হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীকন্যা বলেন, এটি সামনের দিকে বড় একটি পদক্ষেপ।

সম্মেলনে যারা অংশ নিয়েছেন এ উদ্যোগে তাদের শতভাগ সমর্থন রয়েছে জানিয়ে সায়মা হোসেন বলেন, সম্পদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের সৃজনশীল হতে হবে।

অভিভাবকদের এগিয়ে আসা উচিত’

অটিজম সচেতনতার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের এগিয়ে আসার তাগিদ দেন সায়মা হোসেন। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে তারা ভূমিকা রাখতে পারেন।

“আমি আপনাদের সঙ্গে আছি। আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি জানাবেন। আপনারা আমার পথপ্রদর্শক এবং আমার শিক্ষক।”

সবার ওপর কোনো না কোনোভাবে অটিজমের প্রভাব পড়ছে উল্লেখ করে সায়মা হোসেন বলেন, এ বিষয়ে অনেক কিছুই আমরা বুঝি না। এটি একটি জটিল øায়ু-বিশৃঙ্খলা।

“বিশ্বে খুব কম মানুষই এটা একশ ভাগ বুঝতে পারে।”

“কিন্তু একেক শিশুর প্রতিবন্ধিতা একেক রকম। এটি একটি বিশেষায়িত বিষয়।”

কোনো একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে অটিজম চিহ্নিত করা যায় না বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, এক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়।

“তাদের বাচিক অবস্থা, অঙ্গভঙ্গি, বুদ্ধিমত্তা, মস্তিষ্কের কেন্দ্রীয় øায়ুতন্ত্রের দক্ষতা এবং সামাজিক দক্ষতা বিবেচনায় রাখতে হয়।”

চিকিৎসা পেশাজীবীরাও কখনো কখনো এ বিশৃঙ্খলা বুঝে উঠতে পারেন না বলে জানান শিশু মনোবিদ সায়মা হোসেন।

তিনি বলেন, চিকিৎসকদের শুধু সচেতন হলেই হবে না, বিষয়টি তাদের বুঝতেও হবে।

‘ওদের সহায়তা প্রয়োজন’

সায়মা হোসেন বলেন, সমাজে অটিস্টিক শিশুদের সহায়তা প্রয়োজন।

“বিদ্যালয়ে ওদের সহায়তা প্রয়োজন। নানা জটিলতায় তাদের চিকিৎসা সহায়তা প্রয়োজন।”

ইতিমধ্যে শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে দক্ষিণ এশীয় অটিজম নেটওয়ার্ক গঠিত হয়েছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, “এটি সক্রিয় হতে কিছু আনুষ্ঠানিকতা বাকি রয়েছে।”

সায়মা হোসেন জানান, অটিজম সম্মেলনে যারা অংশ নিয়েছিলেন তারা নিজ নিজ দেশের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে এসেছিলেন।

‘অবশ্যই চ্যালেঞ্জ থাকবে’

আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গৃহীত ঢাকা ঘোষণার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঘোষণার বিষয়গুলো বাস্তবায়নে অবশ্যই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।

“সবচেয়ে ভালো ও স¤প্রসারিত সহায়তা পাওয়া যায় ব্রিটেনে। তবু এখনো তাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়।”

“জনবহুল বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র জনগণকে লক্ষ্য করে কাজ করতে হবে।”

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও সমাজকল্যাণমন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলে একত্রে কাজ করার অঙ্গীকার পেয়েছেন বলে জানান সায়মা হোসেন।

“আমাদের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা দানকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। অটিজমের লক্ষণ নির্ণয় এবং তথ্য সংগ্রহের প্রথম দফার কাজটি তারা করতে পারেন।”

“তারা অভ্যস্ত হয়ে ওঠার পর অভিভাবকদের শেখাতে পারেন যে জন্মের পর শিশুর কোন্ কোন্ বিষয়ে লক্ষ্য রাখা উচিত। এতে সমস্যাটি শুরুতেই সনাক্ত করার চেষ্টা করা সম্ভব হবে।”

তথ্যপ্রযুক্তির (আইটি) ওপর ইতোমধ্যেই আমাদের একটি ভালো অবকাঠামো গড়ে উঠেছে- এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অটিজম বিষয়ক কর্মকাণ্ডে বিশেষত প্রশিক্ষণে এটা ব্যাপকভাবে সহায়তা করবে।

“সবাইকে প্রত্যক্ষভাবে আমরা প্রশিক্ষণ দিতে পারি না। এমনকি সব চিকিৎসককে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে আমাদেরকে অবশ্যই সৃজনশীল হতে হবে।”

তার মতে, অভিভাবক ও সেবিকাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তারা সচেতন হলে নিজেদের সন্তানের যতœ নিতে পারবে।

“অটিস্টিক শিশুর ক্ষেত্রে চোখে চোখে তাকানোর বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

আমরা ভাগ্যবান যে, আমাদের যৌথ পরিবার আছে এবং পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠ। তাই আমাদের পারিবারিক কাঠামো অটিস্টিক শিশুর যতœ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাবা-মাকে সহায়তা করতে পারে।

কিন্তু তাদেরকে শিক্ষা দিতে হবে। তারাই সবচেয়ে বড় মাধ্যম। একইসঙ্গে অটিজম নিয়ে তারাই শক্তিশালী ‘মুখপাত্র’। “বাবা-মা ও তাদের সন্তানদের সম্মানে আমি বলছি।”

এমনকি বাংলাদেশে আমি প্রথম অটিজমের কথা শুনি কিছু অটিস্টিক শিশুর বাবা-মায়ের পরিচালিত এক বিশেষ স্কুল থেকে।

‘অনলাইনেও প্রশিক্ষণ সম্ভব’

অটিজম নিয়ে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দুদিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পর গত ২৭ থেকে ২৯ জুলাই বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) আয়োজিত অটিজম বিষয়ক কর্মশালায় ১৩ মার্কিন বিশেষজ্ঞকে আনেন সায়মা হোসেন পুতুল।

তিনি বলেন, তিনি এ ধরনের আরো প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করতে পারেন। তবে সেগুলো ‘স্থায়ী’ হবে না।

“তারা আরো কয়েকদিন প্রশিক্ষণ দিতে রাজি আছে। তারা আমাদের সঙ্গেই আছে। তবে এটাকে স্থায়ী করতে আমাদেরকে অবশ্যই দক্ষতা বাড়াতে হবে।”

তিনি বলেন, অনলাইনেও যে কেউ প্রশিক্ষণ নিতে পারে। গবেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে সায়মা বলেন, ওয়েবভিত্তিক ও প্রত্যক্ষ প্রশিক্ষণ একইরকম কার্যকর। তাই সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের বিষয়টি মাথায় রেখে এ ক্ষেত্রে আমাদেরকে সৃজনশীল হতে হবে। আমাদের তথ্যপ্রযুক্তির যে অবকাঠামো গড়ে উঠেছে অনেক দেশেরই তা নেই।

মালদ্বীপের সব দ্বীপে ইন্টারনেট সুবিধা নেই। কিন্তু আমাদের অনেক গ্রামেই তা আছে। চলমান কর্মসূচিগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে এজন্য অতিরিক্ত তহবিলের প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

“অটিজম নিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকারের নেওয়া কর্মসূচির সঙ্গে আমাদের সমন্বয় করতে হবে।”

একটি বিষয়ের ওপর একাধিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচি নেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু অটিস্টিক শিশুদের বিষয়ে কিছু হয় না। এটার ওপর আমাদের গুরুত্বারোপ করা দরকার।

‘প্রতিবন্ধিরা সমাজের শিকার’

বাংলাদেশের অটিস্টিক ব্যক্তিদের সমাজের ‘শিকার’ বলে উল্লেখ করেন সায়মা হোসেন।

তিনি বলেন, বাইরে বের হলে আপনি কয়জন প্রতিবন্ধীকে দেখতে পান? আপনি কেন দেখেন না, তারা কি নেই? বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমরা রাস্তায় বহু প্রতিবন্ধীকে দেখতে পাই।

সেখানে তারা বাইরে বের হয়, কেনাকাটা করতে যায়। এমনকি পাবলিক পরিবহনেও তাদের চলাচল করতে দেখা যায়।

“কিন্তু এখানে দোকান বা বাইরে আপনি তাদেরকে দেখতে পাবেন না। তাই তারা সমাজের শিকার।”

তাদের বেশিরভাগেরই আর্থিক সংকট রয়েছে। তারা সবাই গাড়ি কিনতে পারে না। তাদের পাবলিক পরিবহনে চলাচলের দরকার হয়। সবাই একটা গাড়ি চালাতে পারে না।

তাই আমাদের অনেক বেশি সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সবাইকে এ বিষয়ে কথা বলতে হবে।

বিশেষ এই শিশুদের অর্জনকে সামনে তুলে আনতে গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

‘আমরা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারি’

বৈশ্বিক অংশীদারদের একে অন্যের কাছ থেকে শেখার লক্ষ্যে অটিজম স্পিক্সের উদ্যোগের প্রতিষ্ঠিত হয় গ্লোবাল অটিজম পাব্লিক হেলথ (জিএপিএইচ)।

অটিজম স্পিক্সে বাংলাদেশের প্রতিনিধি সায়মা বলেন, ওরা উন্নয়নশীল দেশে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে আমরা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারি।

“সম্মেলনে এ অঞ্চলের চারজন শীর্ষ রাজনীতিককে আমার উপস্থিত করতে পেরেছি।”

“তারা বলেছেন আমাদের সহয়তা করবেন। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালকও তার আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে এতে প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।”

তারাও সহায়তার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

বাংলাদেশের অটিজম বিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান সায়মা হোসেন বলেন, এতে বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি বিদেশি বিশেষজ্ঞরাও রয়েছেন।

এ কমিটি ছোট হলেও সচেতনতা, শিক্ষা, সেবা ও গবেষণায় চারটি টাস্ক ফোর্স কাজ করবে বলে জানান তিনি।

অটিজম সনাক্ত করা এবং অটিস্টিকদের সেবায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রাণুষঙ্গ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের এসব আছে। প্রয়োজনে আরো আনা যেতে পারে।

রাজনীতিতে তার কোনো আগ্রহ নেই জানিয়ে সায়মা হোসেন বলেন, আমার কোনো রাজনৈতিক আকাক্সক্ষাও নেই।

“আমার পরিবার আমার সঙ্গে আছে যা রাজনৈতিক পরিবার। প্রতিবন্ধি শিশুদের যদি আমি কোনো সহায়তা করতে পারি তাহলে আমি অবশ্যই রাজনৈতিক পরিবারের সঙ্গে আছি।”

“আমি সহযোগিতা ও অংশিদারিত্ব চাই।”

শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ- এ কথা উল্লেখ করে সায়মা হোসেন বলেন, আমি তাদের সাহায্য করতে চাই।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এনআইএইচ/এএইচ/পিডি/০০৩৮ ঘ.