ক্যাটেগরিঃ bdnews24

ঢাকা, জুলাই ৩০ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- সীমান্তে হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি আবার মিলেছে ভারতের কাছ থেকে। দুই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে সীমান্তে চোরাচালান ও মানব পাচার রোধে একটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়েছে।

ছিটমহল ও অপদখলীয় ভূমি নিয়ে প্রতিবেশী দুই দেশের বিরোধের নিষ্পত্তি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সফরের সময় হবে বলে দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে।

সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশের পদক্ষেপের ভূয়সি প্রশংসা করেছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম।

শনিবার সকাল পৌনে ১১টার দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠকে বসেন প্রতিবেশী দুই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বৈঠকে ১২ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন চিদাম্বরম। এর মধ্যে বিএসএফ প্রধান রমন শ্রীবাস্তবও ছিলেন। সাহারার নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলে ছিলেন বিজিবিপ্রধান মেজর জেনারেল আনোয়ার হোসেনসহ ১৭ জন।

দুই ঘণ্টার ওই বৈঠকে সীমান্তে গোলযোগ কমাতে বর্ডার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান সই হয়েছে বলে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। বৈঠকে সীমান্ত নিরাপত্তা, ভূমি নিয়ে বিরোধ, চোরাচালান, মানব ও অস্ত্র পাচার বন্ধ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত নানা বিষয়ে আলোচনা হয়।

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর সামনে রেখে ২৪ ঘণ্টার সফরে শুক্রবার রাতে ঢাকা পৌঁছান চিদাম্বরম।

সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশের সহযোগিতার প্রশংসা করে চিদাম্বরম বলেন, “নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সহযোগিতার গুরুত্ব উভয় দেশই বুঝতে পেরে যৌথভাবে সন্ত্রাস, জঙ্গি ও বিচ্ছিন্নতাবাদ মোকাবেলার জন্য সংকল্পবদ্ধ।”

“আমরা আনন্দিত যে আমাদের রাষ্ট্রনেতারা এ বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, উভয়েই নিজের এলাকার মধ্যে অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো তৎপরতা মেনে নেবেন না”, বলেন তিনি।

এক জনের ভূমিতে অন্যের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের স্থানীয় বা বিদেশি কোনো সন্ত্রাস, জঙ্গি বা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের প্রশিক্ষণ, আস্তানা বা অন্য কোনো ধরনের কার্যক্রম অনুমোদন না করার বিষয়ে মতৈক্য হয়েছে বলে জানান চিদাম্বরম।

সীমান্তে হত্যা

ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীদের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সীমান্তে গুলি না চালানোর জন্য কড়া নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

“আমরা কড়া নির্দেশ দিয়েছি- যেন ভারত থেকে বাংলাদেশ অথবা বাংলাদেশ থেকে ভারতে সীমান্ত অতিক্রমকারী কারো দিকে কোনো অবস্থাতেই গুলি না চালানো হয়”, বলেন তিনি।

সীমান্তে নিহতের সংখ্যা বছরে ৩০-৩৫ জন থেকে এখন সাত-এ নেমে এসেছে বলে জানান চিদাম্বরম।

সীমান্তে বিএসএফকে প্রাণঘাতি নয়, এমন অস্ত্র সরবরাহও করে ভারত। তবে অভিযোগ উঠেছে স¤প্রতি সীমান্তে পাথর ছুড়ে কয়েকজন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা।

সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি তোলা হলে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে চিদাম্বরম বলেন, “এরকম কোনো লাশ পাওয়া যায়নি বা বিএসএফও বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকেও এমন কোনো লাশ হস্তান্তর করেনি। এ বিষয়ে তদন্ত করে সত্য অনুসন্ধানের জন্য বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাচ্ছি।”

সাহারা খাতুন বলেন, সীমান্তে হত্যার ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশ সবসময়ই তার প্রতিবাদ করেছে।

পাথর ছুড়ে বাংলাদেশি হত্যার বিষয়ে তিনি বলেন, “আপনারা তো শুনলেন, মন্ত্রী (ভারতীয়) কী বলেছেন।”

সীমান্তে হত্যা বন্ধে ভারতের প্রতিশ্র”তিতে সন্তোষও প্রকাশ করেন সাহারা।

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফেরত

ভারতীয় মন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের জন্য দণ্ডিত অন্তত দুজন ভারতে লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, “আমরা তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছি। তা পেলে আমরা আমাদের সবটুকু শক্তি তাদের খুঁজে বের করে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করবো।”

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মধ্যে ক্যাপ্টেন মাজেদ ও রিসালদার মোসলেউদ্দিন ভারতে গা ঢাকা দিয়ে আছেন বলে মনে করা হয়। ১২ খুনির মধ্যে পাঁচ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, এক জন দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে এবং অন্যরা পালিয়ে আছে বিভিন্ন দেশে।

ভূমি নিয়ে বিরোধ

চিদাম্বরম বলেন, ছিটমহল ও অপদখলীয় ভূমি এবং অনির্ধারিত সীমানা বিষয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সফরের সময় সিদ্ধান্ত হবে।

তিনি বলেন, “অনির্ধারিত সীমানার সমাধান প্রায় হয়ে গেছে। এখনো দুই-একটি ঘটনার সমাধা করা বাকি রয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীর (মনমোহন) সফরের আগেই প্রায় ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার অনির্ধারিত সীমানার বিষয়ে সমাধান হয়ে যাবে।”

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের মধ্যে ভারতের ১১১টি এবং ভারতে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল রয়েছে।

গত সপ্তাহেই ছিটমহলগুলোর জনগণনা শেষ হয়েছে। যৌথভাবে চালানো এ গণনায় ছিটমহলগুলোতে ৫১ হাজার মানুষের বসবাস থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে চিদাম্বরম জানান।

ছিটমহল বিনিময় বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে জানিয়ে সাহারা বলেন, সীমানা নির্ধারণসহ অন্যান্য বিষয়ে বিতর্কের অবসানও শিগগিরই হবে।

দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা ছিটমহলে বাংলাদেশিদের ২৪ ঘণ্টা অবাধ যাতায়াত নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা

সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি ও শান্তি বজায় রাখার উদ্দেশ্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা সই করেছে ভারত ও বাংলাদেশ। দুই দেশের পক্ষে উভয় দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর প্রধান এ সমঝোতা স্মারকে সই করেন।

চিদাম্বরম বলেন, এর মাধ্যমে তাদের যৌথসীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে বলে আশা করছি।

তিনি আরো বলেন, “সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে ভারত বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সীমান্তে সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে আমরা প্রতিশ্র”তিবদ্ধ।”

সাহারা বলেন, বিজিবি ও বিএসএফের একসঙ্গে কাজ করা সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়াবে এবং মানব, মাদক ও অস্ত্র পাচার রোধ করবে।

বাণিজ্য

ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাণিজ্য যে কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে প্রভাব ফেলে এবং আমরা বাণিজ্য অবকাঠামো ও যোগাযোগ উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, “ভারত এখন সাতটি সমন্বিত চেকপোস্ট (আইসিপি) স্থাপন করছে এবং গত মে মাসে আগরতলায় একটি আইসিপি’র ভিত্তিস্থাপন হয়েছে।

উচ্চ পর্যায়ে সফর

বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশই সুদূরপ্রসারী, বাস্তবসম্মত ও পরস্পরের জন্য লাভজনক কিছু উদ্যোগের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে বলে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক বর্তমানে গতিশীল অবস্থায় রয়েছে বলে মন্তব্য করেন চিদাম্বরম।

তিনি বলেন, “দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কটিকে আরো দৃঢ় করেছে। ”

এ সপ্তাহের শুরুতেই ভারতীয় কংগ্রেস সভানেত্রী ও ক্ষমতাসীন মোর্চার চেয়ারপাসন সোনিয়া গান্ধী অটিজম বিষয়ক একট আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকা আসেন। তিনি ইন্দিরা গান্ধীর মরণোত্তর স্বাধীনতা সম্মাননাও গ্রহণ করেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী পালন উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ভারদের উপরাষ্ট্রপতিও বাংলাদেশ সফর করেন।

এসব ঘটনা এ দুদেশের মানুষের সম্পর্কের নিবিড়তাই ইঙ্গিত করে বলে মন্তব্য করেন চিদাম্বরম।

যৌথ যোগাযোগ ব্যবস্থা

গত বছর শেখ হাসিনার ভারত সফরে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ যোগাযোগের বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে জানিয়ে ভারতীয় মন্ত্রী বলেন, “২০১০ সালে শেখ হাসিনার ভারত সফর আমাদের সম্পর্কের একটি নতুন দিক উন্মোচন করেছে।”

দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর একই ধরনের দূরদর্শী পরিকল্পনা দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সেসময় আত্মীকৃত যৌথ যোগযোগ ব্যবস্থা বিষয়ক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ বাস্তবায়নের ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক দৃঢ় হয়েছে।”

মনমোহনের সফর

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে ভারত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় এবং তা আরো গভীর ও শক্তিশালী করে তুলতে চায় বলে জানান চিদাম্বরম।

তিনি বলেন, “আমরা মৌলিক ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করেছি একটি স্থিতিশীল, প্রগতিশীত, গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ।”

ভারত এ দুদেশকেই সেই প্রগতি ও উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করার কথা রয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেথ হাসিনার আমন্ত্রণে এ সফরের জন্য তিনি মুখিয়ে আছেন বলে জানান চিদাম্বরম।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এসএসজেড/এসএইচএ/কিউএইচ/এমআই/১৯৫০ ঘ.