ক্যাটেগরিঃ bdnews24

ঢাকা, অগাস্ট ১৫ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- ৩৬ বছর আগের ভয়াল এক রাতের শোকাবহ স্মৃতি স্মরণ করছে বাংলাদেশ। জনক হারানোর দিনকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণে চলছে বিভিন্ন কর্মসূচি।

১৯৭৫ সালের এই দিনের ভোররাতে সেনাবাহিনীর একদল উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তা ও সৈনিকের হাতে সপরিবারে জীবন দিতে হয় স্বাধীন বাংলার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালনের জন্য সরকার সোমবার ছুটি ঘোষণা করেছে।

শোককে শক্তিতে পরিণত করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে এবারের ১৫ অগাস্ট। সংবিধানে জাতির জনকের স্বীকৃতি দেওয়ার পর এবার ভিন্ন আবহে পালিত হচ্ছে জাতীয় শোক দিবস।

সোমবার সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ভবন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করে তোলা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু ভবন ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশে দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

ভোর সাড়ে ৬টায় রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা সেখানে ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শ্রদ্ধা জানানোর পর দলীয় নেতাদের নিয়ে আবার ফুল দেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হাসিনা। পরে জাতীয় সংসদের স্পিকার আবদুল হামিদ জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

বাবার প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু ভবনে ঢোকেন শেখ হাসিনা। দোতলায় ওঠার সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুকে যে স্থানে গুলি করা হয়েছিলো, সে স্থানটিতে গোলাপের পাপড়ি ছিটিয়ে দিয়ে দোয়া ও মোনাজাত করেন দু’বোন। তারা সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।

কেন্দ্রীয় ভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনগুলো বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দেয়। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতারা বনানী গোরস্থানে ১৫ অগাস্ট নিহতদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

এরপর সকাল ১০টায় শেখ হাসিনা টুঙ্গীপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। বাদ জোহর টুঙ্গীপাড়ায় দোয়া মাহফিলের আয়োজন এবং সারাদেশে মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা করা হবে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিভিন্ন দেশে পালিয়ে থাকা সাজাপ্রাপ্ত বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফিরিয়ে আনতে সরকারের উদ্যোগের কথা জানিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছি। অচিরেই তাদের ফিরিয়ে আনা হবে।”

জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. জিল¬ুর রহমান ১৫ আগস্টে নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে হত্যাকাণ্ডের জন্য ‘স্বাধীনতা বিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন।

প্রধানমন্ত্রী ও ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেন, “ঘাতকচক্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেও তার স্বপ্ন ও আদর্শের মৃত্যু ঘটাতে পারেনি। পনের কোটি বাঙালির অন্তরে প্রোথিত রয়েছে তার ত্যাগ ও তিতিক্ষার দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনাদর্শ।”

দিবসটি উপলক্ষে শোক প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদও। এক বাণীতে এরশাদ বলেন, “জাতির পিতা হারানোর শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।”

তবে জেনারেল এরশাদের নয় বছরের শাসনামলে ১৫ আগস্টে রাষ্ট্রীয় কোন কর্মসূচি পালন করা হয়নি।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ ২১ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এই দিনের স্মরণে কোন আয়োজন ছিল না। আওয়ামী লীগ অভিযোগ করে থাকে, উল্টো বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলার সব চেষ্টাই চালিয়েছিলেন তার উত্তরসূরি দেশশাসকরা।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ১৫ আগস্টকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়।

বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রধান বিরোধী দল বরাবরের মতোই এদিনে কোনো শোক কর্মসূচি দেয়নি। তারা ১৫ আগস্টের প্রথম প্রহরে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার জন্মদিন উদযাপন করেছে। আওয়ামী লীগ মনে করে ‘বিতর্কিত’ এই জন্মদিন পালনের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া দৃশ্যত আগস্ট হত্যাকাণ্ড উদযাপন করে থাকেন। শেখ মুজিবের মেয়ে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতারা হত্যাকাণ্ডের পেছনে খালেদার স্বামী প্রয়াত জেনারেল জিয়াউর রহমানের ইন্ধন রয়েছে বলে বিশ্বাস করেন।

দেশব্যাপী যথাযথ মর্যাদায় এবং ভাবগম্ভীর পরিবেশে দিবসটি পালন উপলক্ষে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচিও রয়েছে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) দিবস উপলক্ষে কর্মসূচি পালন করবে।

জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বেতার এবং টেলিভিশন বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার এবং সংবাদপত্রসমূহ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। সরকারি টেলিভিশনে বঙ্গবন্ধুর উপর ‘চিরঞ্জীব বঙ্গবন্ধু’ ও ‘আমাদের বঙ্গবন্ধু’ প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন করা হবে।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা নিজেদের কর্মসূচি পালন করছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন দিবসটি পালন করছে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে।

সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভা, কবিতাপাঠ, রচনা ও চিত্রাঙ্কণ প্রতিযোগিতা, হামদ্ ও নাত্ প্রতিযোগিতা আয়োজন করবে।

দিনটি উপলক্ষে মঙ্গলবার বিকেলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র) আলোচনা সভার আয়োজন করবে আওয়ামী লীগ। এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার কথা।

৩৬ বছর আগে এইদিনে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়াও তার স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, বড় ছেলে শেখ কামাল, মেজো ছেলে শেখ জামাল, ছোট ছেলে শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, শেখ জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসের ও পুলিশের বিশেষ শাখার সাব ইন্সপেক্টর সিদ্দিকুর রহমানকে গুলি করে হত্যা করে সেনাবাহিনীর সদস্যরা।

সেই রাতে আরও নিহত হন বঙ্গবন্ধুর বোনের স্বামী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ, মেয়ে বেবী ও শিশুপৌত্র সুকান্ত বাবু, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, নিকটাত্মীয় শহীদ সেরনিয়াবাত, রিন্টু ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল।

তখন থেকেই আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি সমমনা রাজনৈতিক দল ও সংগঠন দিনটি পালন করে আসছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৫ আগস্ট প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারও ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালন করে।

২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট ক্ষমতায় এসে দিনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত বাতিল করে। এছাড়া জাতীয় পতাকা বিধি সংশোধন করে সরকার নির্ধারিত দিন ছাড়া জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

এরপর থেকে আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মসূচির মধ্য দিয়েই দিনটি পালিত হয়ে আসছিল।

২০০৮ সালে হাইকোর্ট এক রায়ে ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়। সরকারও সে অনুযায়ী দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৫ আগস্ট ছুটির দিন ঘোষণা করে।

বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ বলে পরিচিত শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্রলীগ গঠনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় আসেন। এরপর ‘৫২-র ভাষা আন্দোলন, ‘৫৪-তে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ‘৬৬-তে ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা এবং ‘৬৮-তে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন।

১৯৬৯-এ ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ মুজিবকে কারামুক্ত করে তাকে বঙ্গবন্ধু খেতাবে ভূষিত করে। ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) বিপ¬বী কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার চূড়ান্ত ডাক- ‘এবারের সংগ্রাম-আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম- আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে এবং ঐক্যবদ্ধ হতে প্রেরণা যোগায়। তার নেতৃত্বেই দীর্ঘদিনের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এসইউএম/জিএনএ/এমআই/০৯৪০ ঘ.