ক্যাটেগরিঃ bdnews24

 

সুমন মাহবুব
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

ঢাকা, অগাস্ট ১৫ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- “ওই সময় যে আমাদের যা করা উচিত বলে মনে করেছিলাম, তাই সেটাই করেছিলাম। ভুলে গিয়েছিলাম অন্য সব বিষয়।”

১৯৭৫ সালে প্রতিকূল অবস্থায় ঝুঁকি নিয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে আশ্রয় দেওয়ার কথা এভাবেই বললেন হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর স্ত্রী মেহজাবীন চৌধুরী।

স্বামীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উনি বলেছিলেন, আমি শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়েদের আশ্রয় দিয়েছি। এটা আমার কর্তব্য। এর জন্য আমি ভীত নই। বিপদেই তো মানুষ মানুষকে সাহায্য করে। এটাই তো মানবিকতা।”

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যখন হত্যা করা হয়, তখন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছিলেন বেলজিয়ামে। দেশে না থাকায় বেঁচে যান দুবোন। তবে জীবন সংশয় ছিলো দেশের বাইরেও। ওই সময় ঝুঁকি নিয়ে বেলজিয়ামে বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়েকে আশ্রয় দেন জার্মানিতে (তখনকার পশ্চিম জার্মানি) তখনকার রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ। তাদের পাঠানোর ব্যবস্থা করেন ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে।

বঙ্গবন্ধুর মেয়েকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য সমস্যায় পড়তে হয়েছিলো হুমায়ূন রশীদকে। মেহজাবীন বললেন, “মার্ডার লিস্ট বানিয়েছিলো মোশতাক (খন্দকার মোশতাক আহমেদ)। তাতে পাঁচ নম্বরে ওনার (হুমায়ূন রশীদ) নাম ছিলো। ওনাকে রিকল করে দেশে আনা হবে। এয়ারপোর্ট থেকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলা হবে।

“তারপর, ওএসডি করে আনা হলো। ১১ মাস এখানে (ঢাকা) ওএসডি করে রাখা হলো। শাস্তিমূলক বদলি করা হলো, সৌদি আরবে।”

“হুমায়ূনকে বলা হয়েছিলো- সারাবছর তো পশ্চিম ইউরোপে চাকরি করে এসেছেন। এখন একটু মরুভূমিতে যান। জিয়াউর রহমান রাগের বশে একটা টাকার অঙ্কও নির্ধারণ করে দেন। সেই পরিমাণ অর্থ তিন বছরের মধ্যে জোগাড় করতে হবে”, বলেন মেহজাবীন।

হাসিনা ও রেহানাকে আশ্রয় দেওয়ার ওই পাঁচ দিনের স্মৃতি তুলে ধরে মেহজাবীন বলেন, “স্বাধীনতার পর কিছু বাঙালি পশ্চিম জার্মানিতে চলে আসে। ওরা সেসময় আমাদের বাড়িতে হামলা চালানোর চেষ্টা করেছিলো। কারণ, আমরা কেন শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়েদের রেখেছি।”

অভিজ্ঞ কূটনীতিক হুমায়ূন রশীদ পরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন, দায়িত্ব পালন করেছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকারেরও। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সভাপতিত্বকারী একমাত্র বাংলাদেশিও তিনি। ২০০১ সালের ১০ জুলাই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে মেহজাবীন বলেন, পশ্চিম জার্মানির সময় রাত ২টার দিকে লন্ডন থেকে ডেপুটি হাই কমিশনার ফারুক চৌধুরী টেলিফোন করে প্রথম জানালো।

“কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার স্বামী রেডিও ধরলো, বিবিসি ধরলো, অস্ট্রেলিয়ান চ্যানেল ধরলো। তারপর, আমরা সব জানতে পারলাম।”

শেখ হাসিনার স্বামী ওয়াজেদ মিয়া তখন গবেষণা করছিলেন পশ্চিম জার্মানির কার্লশ্র”য়েতে। রেহানাও বেড়াতে গিয়েছিলেন সেখানে। বন (পশ্চিম জার্মানির রাজধানী) এ হুমায়ূন রশীদের বাড়িতে কয়েকদিন থেকে দুই বোন বেড়াতে গিয়েছিলেন ব্রাসেলসে। ছিলেন বেলজিয়ামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাসায়। কিন্তু, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে এবং সরকার পরিবর্তন হয়েছে- এ কথা শোনার পর সানাউল হক এক প্রকার জোর করেই দুবোন তার বাড়ি থেকে বের করে দেন।

মেহজাবীন বললেন, “সে রাতেই সানাউল হক তাদের (হাসিনা ও রেহানা) ঘুম থেকে তোলে। সানাউল হক ওদের বলেছিলেন, সরকার পরিবর্তন হয়েছে। তিনি ছাপোষা মানুষ। ওরা তার বাসায় থাকলে তার ক্ষতি হবে। তাই তার বাসা থেকে চলে যেতে অনুরোধ করে।”

সানাউল হক পশ্চিম জার্মানিতে হুমায়ুন রশীদকে টেলিফোন করে বলেছিলেন, “হুমায়ুন তোমার মেহমানরা এখানে আছে। আমি ওদের রাখতে পারবো না।”

তখন হুমায়ূন রশীদ বলনেলন, হাসিনা ও রেহানাকে জার্মানি পাঠিয়ে দিতে। “কিন্তু তারা কী করে আসবে? কেউ কোনোভাবে সাহায্য করছিলো না। বেলজিয়ামে দূতাবাসের একটা সদস্যও তাদের সাহায্য করলো না। নো বডি ওয়াজ ভিজিবল। সব আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেলো। ভয়ে, চাকরির মায়ায়”, বললেন মেহজাবীন।

তখন পশ্চিম জার্মানি দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি তারিক আহমেদ করীম (এখন তিনি নয়া দিলি¬তে রাষ্ট্রদূত) হুমায়ুন রশীদের ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে যান বেলজিয়াম সীমান্তে, বনে নিয়ে আসেন হাসিনা ও রেহানাকে।

বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ের বন ফেরার পরের অবস্থার বর্ণনায় মেহজাবীন বলেন, “”উহ বলতে পারবো না। চিৎকার করে কান্না। কোনো খাওয়া-দাওয়া নেই। এখনো মনে হলে গায়ের রোম দাঁড়িয়ে যায়। ওদের সান্ত্বনা দেওয়ার কোনো ভাষা ছিলো না।”

বনে হুমায়ূন রশীদের বাসায় পাঁচ দিন ছিলেন হাসিনা ও রেহানা। এরপর সরকারি গাড়িতে করেই তাদের কার্লশ্র”য়েতে ওয়াজেদ মিয়ার কাছে পাঠানো হয়। অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কথা চালাতে থাকেন হুমায়ূন রশীদ।

ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে ১৬ অগাস্ট হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর টেলিফোনে কথা হয়। পশ্চিম জার্মানিতে ভারতের রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদের বাসায় আসেন। তার উপস্থিতিতেই আলোচনা চলে।

“ইন্দিরা গান্ধীকে টেলিফোন করে ও বললো- ‘আপনি তো সব কিছু জানেন ম্যাডাম।’ ইন্দিরা গান্ধীর জবাব ছিলো- ‘হুমায়ূন, তুমি শিগগির ওদের পাঠিয়ে দাও আমার কাছে।”

কার্লশ্র”য়ে থেকে ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের ব্যবস্থাপনায় হাসিনা ও রেহানা যান নয়া দিলি¬তে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এসইউএম/এমআই/১২৪০ ঘ.