ক্যাটেগরিঃ bdnews24

নয়া দিল্লী, সেপ্টেম্বর ০২ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে একটি ‘রূপান্তরের’ দিকে এগিয়ে নিতে এখনই আত্মতুষ্টিতে না ভোগার জন্য ভারত সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে সে দেশের গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট অব ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস (আইডিএসএ)।

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের ঠিক আগে শুক্রবার এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, নিরাপত্তাসহ দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার জন্য দুই দেশকে ২০১০ সালের যৌথ ঘোষণা অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে।

পাশাপাশি বাণিজ্য ঘাটতি কমানোসহ ছিটমহল ও সীমানা বিরোধের মতো অমীমাংসিত বিষয়গুলো মিটিয়ে ফেলতে ভারত সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

‘ইন্ডিয়া অ্যান্ড বাংলাদেশ: মুভিং টুয়ার্ডস কনজারভেন্স’ শিরোনামের এ প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন ড. অরবিন্দ গুপ্ত, ড. আনন্দ কুমার, ড. শ্র”তি পাটনায়েক, ড, শ্রীরাধা দত্ত ও ড. অশোক বেহুরিয়ার মতো গবেষকরা। আর এর মুখবন্ধ লিখেছেন আইডিএসের মহাপরিচালক এন এস সিসোদিয়া।

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থ সহায়তায় পরিচালিত আইডিএসএ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে সরকারকে সহায়তা করে থাকে।

আগামী ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফর সামনে রেখে এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের নিরাপত্তা সংক্রান্ত দাবিগুলো পূরণে বাংলাদেশ এরইমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্যদিকে ভারতও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে বাংলাদেশের দাবির বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। এতে করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি ‘রূপান্তরের’ ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

তবে এই সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, দুর্যোগ পুনর্বাসন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য প্রযুক্তি ও যোগাযোগ, রিমোট সেন্সিং, স্বাস্থ্য ও ওষুধ, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো খাতেও সহযোগিতার ক্ষেত্র অনুসন্ধান জরুরি বলে মত দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।

এতে বলা হয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক দৃঢ় হলে এর সুফল কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডও বাণিজ্য ও ট্রানজিট সুবিধা থেকে লাভবান হতে পারবে।

২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লী সফরের প্রসঙ্গ টেনে আইডিএসএ বলেছে, ওই সময়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর যৌথ ঘোষণার মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক যে ইতিবাচক গতি পেয়েছিল তা অবশ্যই ধরে রাখতে হবে। আর এ জন্য এখনই আত্মতুষ্টিতে না ভুগে যৌথ ঘোষণা বাস্তবায়নের কাজ দ্রুত শেষ করার পদক্ষেপ নিতে হবে।

২০০৯ সালের শুরুতে সরকার গঠনের এক বছরের মাথায় শেখ হাসিনার ওই সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক মোড়’ হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকরা। সে সময় দেওয়া যৌথ ঘোষণার ফল হিসেবে ভারত ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা পেতে শুরু করেছে। ভারত থেকে বিদ্যুৎ কেনার জন্য বাংলাদেশ চুক্তি করেছে এবং রেল ও সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নে বাংলাদেশকে ১০০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে ভারতের এক্সিম ব্যাংক।

যৌথ ঘোষণায় থাকা আরো বেশ কিছু বিষয়ে মনমোহনের এই সফরেই দুই পক্ষ চূান্ত সিদ্ধান্তেপৌঁছাতে পারবে বলে আশা করছেন বাংলাদেশ ও ভারতীয় কর্মকর্তারা। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করতে দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে পাল্টাপাল্টি সফর করেছেন। দফায় দফায় বৈঠকও হয়েছে তাদের মধ্যে।

তিস্তা নদীর পনিবণ্টন নিয়ে একটি চুক্তির খসড়া ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। মনমোহনের সফরেই এ চুক্তি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া তার ঢাকায় অবস্থানকালে দুই দেশের সীমানা বিরোধ নিরসন এবং ছিটমহল বিনিময় ছাড়াও কয়েকটি ট্রানজিট প্রটোকল স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী, পররাষ্ট্র মন্ত্রী দীপু মনি এবং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিব শংকর মেনন।

দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা এসব বিরোধ নিস্পত্তিতে যতো দ্রুত সম্ভব দুই পক্ষের উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন বলে আইডিএসএর প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে ২০ দফা সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়েছে সংস্থার প্রতিবেদনে।

২০ দফা সুপারিশ

বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার বিষয়টিকে বাংলাদেশের একটি বড় দাবি উল্লেখ করে আইডিএসএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের নিরাপত্তা ইস্যুতে সাড়া দেওয়ার পর বাংলাদেশ এখন বাণিজ্য বৃদ্ধির বিষয়ে সমঝোতার প্রত্যাশা করছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ‘কাক্সিক্ষত’ হলেও স্বল্পমেয়াদী উদ্যোগ হিসেবে ভারত আমদানি পণ্যের ‘নেগেটিভ লিস্ট’ ছোট করে আনতে পারে বলে পরামর্শ দিয়েছে আইডিএসএ।

বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলার। ভারত ৪৮৪ টি পণ্যকে কালো তালিকাভুক্ত (নেভেটিভ লিস্ট) করায় এসব পণ্য সেখানে রপ্তানি করার সুযোগ পাচ্ছেন না বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা।

অভিন্ন নদীগুলোর মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত ইতোমধ্যে একটি চুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যতো দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে চুক্তি হওয়া প্রয়োজন এবং এ ক্ষেত্রে ছোটখাটো মতপার্থক্যগুলোও দূর করা উচিৎ।

মনমোহনের এবারের সফরেই তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে ১৫ বছর মেয়াদি একটি অর্ন্তবর্তীকালীন চুক্তি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে পানির প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে।

বঙ্গোপসাগরের সীমানা নিয়ে বিরোধ মীমাংসায় জাতিসংঘের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করার পরামর্শ দিলেও সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ভারতীয় কোম্পানিগুলো পেট্রোবাংলাকে ‘কারিগরি’ সহায়তা দিতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছে আইডিএসএ।

বঙ্গোপসাগরের মহীসোপনে মালিকানার দাবি নিয়ে চলতি বছর জাতিসংঘ কমিশনে নিজেদের অবস্থানপত্র দিয়েছে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার। স¤প্রতি বাংলাদেশের দাবির বিষয়ে শুনানিও হয়েছে। তবে ভারত ও মিয়ানমারের শুনানির পরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে।

দুই দেশের অচিহ্নিত সীমানা নিয়ে বিরোধ, ছিটমহল ও তিন বিঘা করিডোরে ফ্লাইওভার নির্মাণের দাবিগুলো একটি ‘প্যাকেজ’ আকারে মীমাংসা করার জন্য ভারত সরকারকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে আইডিএসএর প্রতিবেদনে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার অচিহ্নিত সীমানা নির্ধারণ করে নকশায় সই করার কাজ স¤প্রতি শুরু হয়েছে। এছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরের ভারতের ১১১টি এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল রয়েছে। মনমোহন সিংয়ের আসন্ন সফরে ছিটমহল ও ভূমি বিনিময়ের মাধ্যমে এসব জটিলতার অবসান ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নিরাপত্তা বিষয়ে বাংলাদেশের সহযোগিতার প্রশংসা করলেও এ বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আইডিএসএ, যাতে সরকার বদলালেও সহযোগিতা অব্যাহত থাকে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো মডেল অনুসরণ করে তথ্য বিনিময় এবং সীমান্তে যৌথ টহল চালুর ওপর জোর দিতে বলা হয়েছে তাদের প্রতিবেদনে।

শেখ হাসিনার প্রস্তাব অনুযায়ী দক্ষিণ এশীয় সন্ত্রাস বিরোধী টাস্কফোর্স গঠনে ভারত সরকার তহবিল যোগাতে পারে বলেও সুপারিশ করেছে আইডিএসএ। নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখেও দুই দেশের মধ্যে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

এছাড়া স¤প্রতি ভারতীয় সেনা প্রধানের বাংলাদেশ সফরের কথা উল্লেখ করে সামরিক দিক দিয়েও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

মৌলবাদ ও চরমপন্থাকে দুই দেশের জন্যই ‘হুমকি’ উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “এ বিষয়ে দুই পক্ষকেই ঘনিষ্টভাবে কাজ করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে নিতে একটি কর্মকৌশল প্রণয়ন করতে হবে।”

ভারতের গণমাধ্যমগুলোতে বাংলাদেশ বিষয়ে ‘কভারেজ’ সীমিত- এমন মন্তব্য করে আইডিএসএ বলেছে, পশ্চিমবঙ্গের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেল দূরদর্শন বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর আগ্রহোদ্দীপক খবর ও অনুষ্ঠান প্রচারে জোর দিতে পারে। এতে করে দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক বোঝাপড়াও বাড়বে।

সর্বোপরি পারস্পরিক সন্দেহের সংস্কৃতি দূরে ঠেলে একটি কৌশলগত অংশীদারিত্বে পৌঁছানোর জন্য দ্পুক্ষকেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে বলে মত প্রকাশ করেছে ভারতীয় গবেষণা সংস্থাটি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/প্রতিনিধি/জেকে/২৩১২ ঘ.