ক্যাটেগরিঃ bdnews24

 

ঢাকা, সেপ্টেম্বর ০৫ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- ২০০৭ সালে সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির সামরিক সমাধানে বিদেশি হস্তক্ষেপ চেয়েছিলো বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী, সুশীল সমাজ ও ব্যবসায়ী স¤প্রদায়।

বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা জারির দিন (২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি) ঢাকা থেকে ওয়াশিংটনকে এক তারবার্তায় এ কথাই জানিয়েছিলেন বাংলাদেশে তৎকালীন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া এ বিউটেনিস।

ওইসময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় দেশে সাংবিধানিকভাবে সেনাবাহিনী নিয়োজিত ছিল বলে বার্তায় জানান বিউটেনিস।

বার্তায় তিনি বলেন, ‘জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ এবং অসাংবিধানিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।’

২০০৭ এর ১১ জানুয়ারি সামরিক হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন এবং ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘ওয়ান ইলেভেন’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ওই তারিখের মাত্র দুই দিন আগে ৮ ও ৯ জানুয়ারি ওয়াশিংটনে দুটি বার্তা পাঠান যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত।

বিউটেনিস লেখেন, সেনাবাহিনী ‘বিশ্বাসভঙ্গ’ করে অভ্যুত্থান করতে পারে, কিংবা দুই নেত্রীকে নির্বাসনে পাঠানো হতে পরে- এমন কোনো আশঙ্কা মনে ঠাঁই দিতে প্রস্তুত ছিলেন না সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

এ দুটি ‘গুজব’ উড়িয়ে দিয়েছিলেন শেখ হাসিনাও। বরং তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসন দিলে তার জন্য ভালোই হবে, কেননা তাতে তিনি নাতনির সঙ্গে সময় কাটাতে পারবেন।

তখনকার নির্বাচন কমিশনের তফশিল অনুযায়ী ২২ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে বিএনপির অনমনীয় অবস্থান; আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা সামাল দিতে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের ব্যর্থতার মধ্যে ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনা এবং ৭ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার সঙ্গে একান্তে বৈঠক করেন বাংলাদেশে তখনকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিউটেনিস ও ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী।

তিন গোষ্ঠীর প্রস্তাব

বিউটেনিস তার বার্তায় বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা মার্কিন দূতাবাসসহ অন্যান্য দেশের দূতাবাসে যোগাযোগ করেছেন। তারা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সামরিক সমাধান চান; সুশীল সমাজ ও ব্যবসায়ী স¤প্রদায়েরও এ ক্ষেত্রে একই মত।

‘তাদের মত হলো রাষ্ট্রপতি/প্রধান উপদেষ্টা ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে (ক) ছয় মাস থেকে দুই বছরের জন্য নির্বাচন পেছানোয় বাধ্য করা; (খ) তার তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের পদ ছাড়া এবং (গ) [তত্ত্বাবধায়ক সরকারের] নতুন একজন প্রধান ও সরকার এবং/কিংবা একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার প্রতিষ্ঠা।’

এছাড়া একটি পরামর্শ ছিলো বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে বিদেশে নির্বাসনে পাঠানো। একইসঙ্গে এরকম পরামর্শও ছিলো যে দেশে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা ২২ জানুয়ারির নির্বাচনের পর নব নির্বাচিত বিএনপি সরকার জরুরি অবস্থা জারি করুক; যাতে সামরিক বাহিনীর এক বড় ধরনের রাজনৈতিক ভূমিকা থাকবে। এমনকি সামরিক শাসন কিংবা অভ্যুত্থানের পরামর্শও ছিলো।

বিউটেনিস তার বার্তায় বলেন, ‘আমেরিকার সংকেত ছাড়া [এতে] যুক্ত হতে ইতস্তত বোধ করছে সামরিক বাহিনী।’

তবে বিউটেনিস এবং দূতাবাসের অন্য কর্মীরা রাজনীতিক ও সেনা কর্মকর্তাদের বলেন, তারা সামরিক বাহিনীর কোনো ধরনের অসাংবিধানিক ভূমিকা সমর্থন করেন না। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, সেনাবাহিনীকে সংবিধানের আওতায় বেসামরিক সরকারের সমর্থনে ও অধীনে কাজ করতে হবে।

জরুরি অবস্থা জারির কয়েকদিন আগে (৭ জানুয়ারি) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করেন রাষ্ট্রদূত বিউটেনিস।

তারবার্তায় বিউটেনিস জানান, ওই সাক্ষাতে [রাজনৈতিক ওই পরিস্থিতিতে] সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তাদের [যুক্তরাষ্ট্রের] অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

সেনাবাহিনীর দুই শীর্ষকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ

ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের প্রতিরক্ষা বিষয়ক কর্মকর্তা ৯ জানুয়ারি তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদের সঙ্গে দেখা করেন বলে বার্তায় জানান বিউটেনিস।

তিনি বলেন, দুই সেনা কর্মকর্তাই বলেছেন, ক্ষমতা, সামরিক শাসন বা অভ্যুত্থান বা অন্য কোনো ধরনের অসাংবিধানিক পন্থার প্রতি সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে আগ্রহ নেই। তারা এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ সমর্থনও করবেন না।

‘ঢাকায় তৎকালীন বৃটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর সঙ্গে ৮ জানুয়ারি তার এ ধরনের আলোচনা হয়েছে বলেও জানান মইন উ আহমেদ।’

জরুরি অবস্থা জারি না করার অনুরোধ

ওয়াশিংটনে পাঠানো তারবার্তায় বিউটেনিস লেখেন, প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার জাহাঙ্গীর বলেছেন, তিনি রাষ্ট্রপতিকে বলেছেন তিনি যেন জরুরি অবস্থা জারি না করেন। কেননা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বেসামরিক বাহিনীকে সামরিক বাহিনীর সহায়তা এর মাধ্যমে আরো কার্যকর হওয়ার সুযোগ নেই।

জরুরি অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো স্পষ্ট পথও নেই বলে মনে করেন জাহাঙ্গীর।

বিউটেনিস তার বার্তায় লেখেন, [এ] রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জরুরি অবস্থার প্রয়োজন নেই উল্লেখ করলেও সেনাবাহিনী জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার পরিকল্পনা করছে বলে স্বীকার করেন মইন।

‘কেবল নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেই জরুরি অবস্থা হতে পারে বলে মনে করেন মইন। তবে ২২ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে এমন হতে পারে বলে তার মনে হয় না। তিনি বরং নির্বাচনোত্তর গণ অসন্তোষ নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।’

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের অনুরোধে তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন বিউটেনিস- এ তথ্য উল্লেখ করে বার্তায় রাষ্ট্রদূত বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমাধান হিসেবে একটি সেনা সমর্থিত জাতীয় ঐক্যের সরকারের প্রস্তাব দিয়েছেন।

জবাবে বিউটেনিস বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনীর কোনো ধরনের অসাংবিধানিক ভূমিকার তীব্র বিরোধী এবং এই রাজনৈতিক অচলাবস্থার সমাধান শুধু রাজনৈতিকভাবেই।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/পিডি/০২০৬ ঘ.