ক্যাটেগরিঃ bdnews24

খ্যাতনামা পরিচালক গৌতম ঘোষের এক পা ভারতে তো আরেক পা বাংলাদেশে। দুই জাতিরই পরিচয়ের প্রতিনিধিত্বধারী ঘোষ বাংলাদেশ আর পশ্চিম বঙ্গের একীভূত সংস্কৃতির বিশ্বাসী। তিনি বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রযোজনায় বানানো দুটি পুরস্কার বিজয়ী ও বাণিজ্যিক ছবির পরিচালক- ১৯৯৩ সালের পদ্মা নদীর মাঝি এবং ২০১০ সালের মনের মানুষ। দুটো ছবিই বাঙালির মানসে ছাপ রেখে গেছে।

কলকাতার বাসিন্দা ঘোষ গর্বভরে তার শিকড় খোঁজেন ফরিদপুরে। বলেন, তিনি বাংলাদেশের বাতাসে শ্বাস নিতে ভালোবাসেন, এখানে তিনি খুবই স্বাচ্ছন্দ্য থাকেন।

দুই বাংলায় জনপ্রিয় এই চলচ্চিত্রকারের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এস এন এম আবদি।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের কোন চিত্রটা আপনার মনের পর্দায় ভেসে ওঠে?

উত্তর: আমি বাংলাদেশকে মনে করি পশ্চিমবঙ্গ আর আসামের কিছু অংশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালি নিয়ে গঠিত বৃহত্তর বাংলার কেন্দ্রবিন্দু। আমাদেরকে একই সূতায় গেঁথেছে ভাষা এবং আমাদের মিলিত সংস্কৃতি। বাংলাদেশ আমাকে মনে করিয়ে দেয় দুটো মহান নদী গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র বিধৌত ভূমিকে যাকে আমি ভালোবাসি আর শ্রদ্ধা করি।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে মনমোহন সিংয়ের ঐতিহাসিক সফরকে সামনে রেখে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আপনার কোনো পরামর্শ আছে?

উত্তর: তাদের সার্কের চেতনা মাথায় রাখা উচিত। প্রতিবছর আমি পড়ি যে সার্ক সম্মেলনের ফলাফল শূন্য।
কেন সার্কভুক্ত দেশগুলো ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলোর মতো হতে পারে না। আমাকে বাংলাদেশে আসতে ভিসা নিতে হবে কেন? কেন আমার ছবির বাংলাদেশী সহ-প্রযোজক হাবিবুর রহমান খানের ভারতে আসতে ভিসা লাগবে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। এটা একটা রাজনৈতিক সমস্যা। আমার তো নেপাল যেতে ভিসা লাগে না। অথচ এ দেশটির ভাষা আর সংস্কৃতি আমাদের চেয়ে আলাদা। আর সীমান্তের দুই পাশে বাস করা বাঙালিদের ভিসা লাগে। বাহ!

ড. সিং আর শেখ হাসিনার প্রথমেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভিসামুক্ত যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ১৯৪৭ ব্রিটিশ ভারত বিভক্তির সময় ছিন্ন হয়ে যাওয়া পরিবহন আর যোগাযোগের পথটাকে চালু করতে হবে। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে। আমাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সমৃদ্ধশালী হবে।

বাংলাদেশকে তাদের চাহিদামতো পোশাক ভারতে রপ্তানি করতে দিতে হবে। তাহলে আপনি-আমি কলকাতাতেই কমদামে অসাধারণ সব জামা-প্যান্ট কিনতে পারব। বাংলাদেশের বিস্কুট, কেক, কুকি এবং পাউরুটির মতো বেকারি পণ্য অনেক ভালো। এগুলো কেন ভারতে পাওয়া যায় না?

বাংলাদেশের যে সব পণ্য ভারতে রপ্তানি নিষিদ্ধ তার তালিকা অনেক বড়। এটাকে বলা হয় ‘নেগেটিভ লিস্ট’। এটা নেতিবাচকতার চূড়ান্ত। যদি শেখ হাসিনা এবং ড. সিং কোনো ইতিবাচক সংকেত ছড়াতে চান তবে তথাকথিত এই নেগেটিভ লিস্টকে অতি দ্রুত বাতিল করতে হবে।

ঢাকা আর কলকাতার মধ্যে বিমান আর রেল যোগাযোগ আছে। কিন্তু ঢাকা আর আগরতলার মধ্যে যোগাযোগ নেই। এটা খুবই লজ্জার। গুয়াহাটি, আইজাওল ও ইম্ফলের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিটি মহানগরের মধ্যে বিমানের ফ্লাইট থাকা উচিত। ভারতকেই বড় ভাইসুলভ মহত্ত্ব এবং উদারতা দেখাতে হবে যে কিনা তার ছোট ভাইদের চেয়ে বেশি সম্পদশালী।

প্রশ্ন: ভারত রহস্যজনকভাবে বাংলাদেশকে দেওয়া তাদের প্রতিশ্র”তির প্রতি সম্মান দেখাচ্ছেন না।

উত্তর: আপনি ঠিকই বলেছেন। দিল্লিতে করপোরেট আর আমলাদের একটা লবি আছে যারা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত করছে। এই লবিটা বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুভাবাপন্ন এবং ভ্রাতৃত্বসুলভ সম্পর্ক চায় না। এই লবিকে হটাতে না পারলে ভারত ও বাংলাদেশ কাছাকাছি হতে পারবে না। আমি মনে করি ঢাকা আসার আগে ড. সিং এই ক্ষতিকারক লবিকে বকাঝকা করে আসবেন।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ-ভারতের হৃদ্যতাপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক থেকে দুই দেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে কি অনেক কিছু পেতে পারে?

উত্তর: অবশ্যই। বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো কেবল দুই দেশে বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু ঢাকা বা কলকাতায় বানানো ছবিগুলো অন্য দেশে মুক্তি দেওয়া যায় না। দুই দেশের অপরিণামদর্শী আইন এতে বাধা হয়ে আছে। তাই বাঙালি চলচ্চিত্র নির্মাতারা দুই বাংলার মিলিত চলচ্চিত্র বাজার ধরতে পারছে না। এই বাজার কিন্তু তামিল ছবির বাজারের চেয়ে বড়। বাংলা সিনেমার জন্য কিন্তু সারা বিশ্বেই বাজার রয়েছে।

আমার পরিচালিত বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত পদ্মা নদীর মাঝি আর মনের মানুষ শুধু নির্মাণ ব্যয় তুলে আনেনি, সঙ্গে বাংলাদেশী ও ভারতীয় প্রযোজকদের জন্য ভালোই মুনাফা তুলে এনেছে। কিন্তু চিত্রটা পুরোপুরি মোহনীয় কিছু ছিল না। ১৯৯৩ সালে পদ্মা নদীর মাঝির নায়ক রাইসুল ইসলাম আসাদ আমাদের জাতীয় পুরস্কারের জন্য সেরা অভিনেতার ক্যাটাগরিতে মনোনীত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বাংলাদেশের নাগরিক বলে তাকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি।

এত বছর পার হওয়ার পর আমার প্রচেষ্টার কারণে ভারত সরকার এখন তাদের বোকামি বুঝতে পেরেছে। এ বছর সেরা প্রযোজকের পুরস্কার যৌথভাবে পেয়েছে মাটির মানুষ ছবির যৌথ প্রযোজক বাংলাদেশের হাবিবুর রহমান ও ভারতের গৌতম কুণ্ডু। এটা সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটা বড় পদক্ষেপ।

এবার বাংলাদেশ সরকারের সাড়া দেওয়ার সময় এসেছে। বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনার ছবিও বিবেচনায় আনা উচিত।

প্রশ্ন: মনের মানুষ ছবির নায়ক লালন ফকির কি দুই বাংলার একীভূত সংস্কৃতিকে রূপায়িত করেছেন যা আপনি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেন?

উত্তর: হ্যাঁ, লালন জন্ম নিয়েছেন হিন্দু ঘরে, কিন্তু তিনি বড় হয়েছেন মুসলমান ঘরে। তিনি মুসলমানদের সঙ্গে একই খাবার খেয়েছেন বলে হিন্দুরা তাকে বর্জন করেছে। দুই ধর্মের টানাপড়েনে লালন হয়ে গেলেন ফকির। পরিণত হলেন মরমী কবিতে। তিনি একটি ধারার জন্ম দিয়েছেন। তিনি অসা¤প্রদায়িকতা আর মানবতার প্রতীকী রূপ দিয়েছেন। আমাদের সবার উচিত সা¤প্রদায়িকতা এবং দলগত প্রতিহিংসা থেকে সমাজকে মুক্ত করতে লালনের দেখানো পথ অনুসরণ করার চেষ্টা করা।

১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার পর আমি একটা ছবি বানাতে চেয়েছিলাম। তবে বাবরি মসজিদ ভাঙা নিয়ে ভারত আর বাংলাদেশে বেঁধে যাওয়া দাঙ্গা নিয়ে আমি ছবি বানাতে চাইনি। তাই আমি নজর দেই লালন ফকিরের ওপর, কারণ তিনি সা¤প্রদায়িকতা এবং সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে বাঁধা হয়ে ছিলেন।

প্রশ্ন: ভারতে বাংলাদেশকে খারাপভাবে চিত্রিত করার পেছনে মৌলবাদীদের হাত আছে বলে মনে করেন?

উত্তর: অবশ্যই! এটার শুরু অনেক আগ থেকেই; ১৯৪৭ সালে ধর্মভিত্তিক সীমানার ওপর ভিত্তি করে বাংলা ভাগ হয়। কিন্তু এর ভিত্তি গড়ে উঠেছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গেরও আগে উনবিংশ শতাদ্দীতে হিন্দু রেনেসাঁ বা আমার মতে হিন্দু পুনর্জাগরণের সময়।

ইংরেজি শিক্ষার সৃষ্টি হিন্দু বাবুরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে একীভূত হয় এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মুসলমানদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে, শেষে হিন্দু বাবুরা পরিণত হয় জমিদারে। আর মুসলিমরা নেমে যায় প্রজার কাতারে। অবশ্য কিছু মুসলমান জমিদারও ছিল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯১ সালে শিলাইদহ, পতিসর এবং শাহজাদপুরে তার পরিবারিক জমিদারি দেখতে এসে এটা টের পান। সমাজের অভিজাত শ্রেণী বিভক্ত ছিল, কিন্তু সমাজের নিু পর্যায়ে একটা সাংস্কৃতিক ঐক্য ছিল যা লালন ফকিরের মাধ্যমে প্রতীকায়িত হয়েছিল। তার দর্শন রবীন্দ্রনাথকে অনেক প্রভাবিত করেছিল। লালন একীভূত বাঙালি সংস্কৃতির পক্ষে ছিলেন। লালন ফকির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, কুরআন আর পুরাণের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।

লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালে বাংলাকে বিভক্ত করেছেন প্রশাসনিক আর রাজনৈতিক কারণে। বিহার আর উড়িষ্যা পশ্চিম বঙ্গের অংশ হয়ে গেল। ঢাকা হল পূর্ব বঙ্গের রাজধানী যার অংশ ছিল আসামের বাঙালি প্রধান এলাকাগুলোও। কিন্তু বাঙালিদের একটা প্রভাবশালী অংশ বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল। তারা বৃহত্তর বাংলায় বিশ্বাসী ছিল যাদের একটা একীভূত সংস্কৃতি থাকবে, যেখানে হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধ ধর্মালম্বীরা একসঙ্গে বাস করে উন্নয়নের পথে যাবে। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ১৯৪৭ সালে যখন আবার বাংলা ভাগ হলে কোনো প্রতিবাদ হয়নি। কেন? কারণ ১৯৪৭ সালের মধ্যে বাঙালিরা আসলেই সা¤প্রদায়িক হয়ে পড়েছিল।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, শরীফ উল্লাহ