ক্যাটেগরিঃ bdnews24

 

বীণা সিক্রি ২০০৩ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার থাকার সময় শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া দুজনের সঙ্গেই কাজ করেছেন। ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসের ১৯৭১ সালের ব্যাচের এই কর্মকর্তা ২০০৮ সালে অবসরে গেছেন। দিল্লি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমি অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বাংলাদেশ স্টাডিজ প্রোগ্রামের প্রধান হিসেবে তিনি চোখ রেখেছেন বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ এবং পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্কের ওপর।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফর সামনে রেখে বীণা সিক্রির সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন এস এন এম আবদি।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের কোন কোন চিত্র আপনার মনের পর্দায় ভেসে ওঠে?

উত্তর: বাংলাদেশের কথা মনে হলেই আমার মনে পড়ে খুবই বন্ধুভাবাপন্ন মানুষদের কথা যারা ভারত ও ভারতীয়দের বন্ধু হতে চায়। বাংলাদেশিরা উষ্ণতা আর সুনাম ছড়ায়।

প্রশ্ন: শেখ হাসিনা আর মনমোহন সিংয়ের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

উত্তর: তাদের দুইজনের প্রতি রইল আমার শুভকামনা। এ সফরটির প্রস্তুতি খুবই ভালো। পরিকল্পনার এই ছাপ পাওয়া যাবে উন্মোচনের অপেক্ষায় থাকা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকগুলোতে। ড. সিংয়ের এই সফর আর শেখ হাসিনার ২০১০ সালের ভারত সফরকে তুলনা করা যায় ৭০ দশকের সফর বিনিময়ের সঙ্গে। ইন্দিরা গান্ধী ঢাকায় গিয়েছিলেন ১৯৭২ সালের মার্চে এবং শেখ মুজিব দিল্লি সফরে এসেছিলেন ১৯৭৪ সালের মে মাসে। ৭০ দশকের মতো এখন দুই দেশেই প্রত্যাশা অনেক বেশি।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ মনে করে, তারা ভারতের জন্য অনেক করেছে, কিন্তু বিনিময়ে কিছুই পায়নি বা যৎসামান্য পেয়েছে।

উত্তর: আমি তা মনে করি না। হাসিনার ২০১০ সালের সফরে নেওয়া অনেক সিদ্ধান্ত এখন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এর ফলগুলো ড. সিংয়ের সফরের সময় ঘোষণা করা হবে। তাই তার সফরের পরই এ ইস্যুটি নিয়ে কথা বলা ভালো।

প্রশ্ন: বড়ভাইসুলভ ভাবমূর্তি মুছে ফেলার জন্য ভারতের কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন? দিল্লি সব ইস্যুতে নিজেকে সব সময় ঠিক বলে মনে করে বলে বাংলাদেশ প্রায়ই ভারতের মনোভাবকে কর্তৃত্বপরায়ণ বলে থাকে।

উত্তর: কেউ বলতে পারে না যে, সে সব ইস্যুতে ঠিক। আমি মনে করি মতপার্থক্য থাকতেই পারে যা কেবল আলোচনা এবং বন্ধুত্ব, বিশ্বাস আর বোঝাপড়ার ভিত্তিতে সমাধান করা যাবে। গত দুই বছরে অনেক আলোচনা হয়েছে। ড. সিংয়ের সফরের পর আমরা এর ফল দেখতে পারব।

প্রশ্ন: ভারতের প্রধানমন্ত্রী আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিরাপত্তা বিষয়ক ইস্যুগুলোয় সহযোগিতা করায় খোলাখুলিভাবেই বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্র”পগুলো এবং বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারতে আইএসআই-এর সন্ত্রাস রপ্তানির প্রতি ঢাকার দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশের নিরাপত্তায় হুমকি নিয়ে ভারত কী করছে সে বিষয়ে আলোকপাত করবেন কি?

উত্তর: নিরাপত্তা ইস্যুতে আলোচনা খুবই ফলপ্রসূ হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকার দ্বিধাদ্বন্দ্ব না করে দৃঢ়ভাবে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্র”পগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন। গ্র”পগুলো বাংলাদেশের মাটি থেকে তখন পর্যন্ত কোনো বাধা ছাড়াই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলো। বাংলাদেশের কঠোর অবস্থানের কারণে এসব গ্র”প দমনে ভারত সরকারের হাত শক্তিশালী হয়েছে।

কিছু বাংলাদেশি অপরাধী ভারতে লুকিয়ে আছে এবং ঢাকা তাদের ফেরত পাঠাতে বলছে। আমরা তাদের এই চাহিদাকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছি।

প্রশ্ন: সড়কপথে ট্রানজিট করিডোর দেওয়া হলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্য রপ্তানিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরা শঙ্কিত। ভারতের অনেক আশার এই করিডোরের ফলে ঢাকার রপ্তানি আয়ের যে ক্ষতি হবে, তা পূরণে দিল্লির কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

উত্তর: বাংলাদেশের পণ্য সবসময়ই উত্তর-পূর্বাঞ্চলে খুবই প্রতিযোগিতামূলক দামে পাওয়া যাবে। যে কোনো ধরনের ট্রানজিট বা যোগাযোগের পথ বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদন করে তা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিক্রির জন্য ভারতীয় বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করবে। ভারতীয় পণ্য কোনোভাবেই উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রতিযোগিতামূলক দামে বিক্রি করা যাবে না।

ট্রানজিটের ফলে ভারতের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে ভোগ্যপণ্য, নির্মাণ শিল্পের জন্য পণ্য এবং শিক্ষা পণ্য যৌথ উদ্যোগে উৎপাদন করতে বিনিয়োগ করবে। ট্রানজিট করিডোর বাংলাদেশের পণ্যকেও ভারতের উত্তর-পূর্ব এবং অন্যান্য অংশে পৌঁছতে সাহায্য করবে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশীদের জন্য ভারতের ভিসা পাওয়াটা এত অর্থসাধ্য, কঠিন ও সময়সাধ্য কাজ কেন? ভারতীয়রা বাংলাদেশের ভিসা পেতে যে ফি দেয় তার দ্বিগুণ ফি বাংলাদেশিদের ভারতীয় ভিসা পেতে ব্যয় করতে হয় কেন?

উত্তর: ভিসা প্রক্রিয়া অবশ্যই সহজ করতে হবে। ভারতের ভিসার চাহিদা অনেক বেশি, বছরে প্রায় ৫ লাখ। ভারত সরকারকে ভিসা ডিজিটালকরণ ও আউটসোর্সিং চালু করতে হয়েছে যার ফলে ভিসার খরচ অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু এসব সত্ত্ব্ওে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে যাতে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ভিসা প্রার্থীরা সমস্যায় না পড়েন।

প্রশ্ন: এটাতো ভারতের সমস্যা। আমরা তাদের চেয়ে বেশি ভিসা ফি নিচ্ছি কেন? এটা তো পারস্পরিক হওয়ার কথা ছিলো।

উত্তর: হ্যা, তাই হওয়ার কথা আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত এ সমস্যা সমাধানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলা।

প্রশ্ন: দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৈষম্যকে স্বাভাবিক করতে ভারতের কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন? আমাদের বাজার খুলে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের জোরালো আবেদনের পরও দুই দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি রয়ে গেছে।

উত্তর: এটা ড. সিংয়ের আলোচ্য তালিকায় একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমি নিশ্চিত, এ ক্ষেত্রে একটা বড় ধরণের ঘোষণা আসবে। যখন ভারতের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে উৎপাদন শুরু করবে এবং ভারতে উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং অন্যান্য অংশে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি করবে তখন এ চিত্রটি আরো ইতিবাচক হবে। বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের জন্য চাকরির সুযোগ তৈরি করবে যা তাদের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ বিদ্যুতের ঘাটতি ব্যাপক। ভারত কি তার প্রতিবেশীর চলমান বিদুৎ ঘাটতি মোকাবেলা করতে সহায়তা করবে?

উত্তর: ড. সিংয়ের সফরের সময় পাওয়ার গ্রিডের সংযোগ এবং ভারত থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানির ওপর বড় ধরনের ঘোষণা থাকবে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদের সুবিধা নিতে ভারত এ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে বলে আপনি মনে করেন কেন?

উত্তর: গ্যাসের বিষয়টি আমাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু আলোচনা থেকে কোনো ফল বেরিয়ে আসেনি। বাংলাদেশ এখনও তাদের গ্যাস খাত গোছানোর চেষ্টা করছে। আর আমরাও ইতিবাচক ফলের আশায় আছি।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের অনেকের অভিযোগ ভারত গঙ্গার পানি-বণ্টন চুক্তিকে প্রহসনে পরিণত করেছে। ড. সিংয়ের সফরের সময় তিস্তা পানি-বণ্টন চুক্তি সইয়ের প্রাক্কালে এ অভিযোগের জবাব আপনি কীভাবে দেবেন?

উত্তর: আমরা তিস্তা এবং ফেনী নদীর পানি-বণ্টন চুক্তি সইয়ের দিকে তাকিয়ে আছি। এই চুক্তি হবে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটা বড় ধাপ। আর গঙ্গার পানি-বণ্টন চুক্তি খুবই ভালো কাজ করছে। এটা বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই তদারক করছে। আর এ নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ আসেনি। দুই পক্ষ শুকনো মৌসুমে দশ দিন পর পর একসঙ্গে পানির প্রবাহ মাপে। এটা খুবই স্বচ্ছ প্রক্রিয়া।

প্রশ্ন: চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার ব্যাপারে ঢাকার একটা বিশেষ আগ্রহ আছে বলে আপনি মনে করেন কেন?

উত্তর: গত কয়েক বছর ধরে বেইজিং বাংলাদেশে চীনপন্থী লবি গড়ে তোলার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্ব অনন্য। সময়ের পরিক্রমায় তা সবসময় অটুট থাকবে।

প্রশ্ন: ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কথা সংক্ষেপে জানবেন কি?

উত্তর: আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের নিজস্ব বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলছি। চীন বা পাকিস্তান নিয়ে আমাদের একমাত্র চিন্তা হলো, বাংলাদেশ থেকে যাতে ভারতবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড না হয়।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ থেকে ভারতে অবৈধ অভিবাসন এবং আমাদের সমাজে তার প্রভাবের ইস্যুটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

উত্তর: এটি এমন একটি ইস্যু যা নিয়ে দুই দেশেরই আলোচনা করা উচিত। আলোচনা না চালালে এ ইস্যু নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে।

প্রশ্ন: ড. সিং মন্তব্য করেছিলন বাংলাদেশিদের ২৫ শতাংশই ভারতবিদ্বেষী এবং আইএসআইয়ের কব্জায় আছে। বিষয়টি বাংলাদেশ যেভাবে মোকাবেলা করেছে পেশাদার একজন কূটনীতিক হিসেবে আপনি কীভাবে তা দেখেন?

উত্তর: বিষয়টি পার করে আসছি আমরা। বাংলাদেশ খুবই বিজ্ঞের মতো প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এখন তা আলোচনা করা উচিত না।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, শরীফ উল্লাহ