ক্যাটেগরিঃ bdnews24

 

নিউ ইয়র্ক, সেপ্টেম্বর ২৪ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- সাতশ’ কোটি মানুষের এই বিশ্বকে ‘পাল্টে দিতে’ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘শান্তি-কেন্দ্রিক উন্নয়নের’ এক নতুন মডেল উপস্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শনিবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৬তম সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তৃতায় বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সামনে এই মডেল তুলে ধরে তিনি বলেন, “আসুন, আমরা শান্তির এ মডেলটি প্রয়োগ করে দেখি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এর মাধ্যমে সাত বিলিয়ন মানুষের এই বিশ্বকে আমরা পাল্টে দিতে পারব। এমন একটি বিশ্ব গড়তে সক্ষম হব, যেখানে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারবে।”

‘সারাজীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে’ এই ‘জনগণের ক্ষমতায়ন মডেল’ তৈরি করা হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, “এটি একটি বহুমাত্রিক ধারণা, যার ভিত্তি হচ্ছে জনগণের ক্ষমতায়ন, যেখানে গণতন্ত্র এবং উন্নয়নকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়া হয়েছে। এতে আছে ছয়টি পরস্পর ক্রিয়াশীল বিষয় যা শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এগুলো হচ্ছে ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বৈষম্য দূরীকরণ, বঞ্চনার লাঘব, ঝড়েপড়া মানুষদের সমাজের মূলধারায় অন্তর্ভুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং সন্ত্রাসবাদের মূলোৎপাটন।”

“এর মূল বিষয় হচ্ছে সকল মানুষকে সমান চোখে দেখা এবং মানবিক সামর্থ্য উন্নয়নের কাজে লাগানো। একমাত্র শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এসব বাস্তবায়ন করা সম্ভব”, যোগ করে হাসিনা।

শান্তিপূর্ণ মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিস্পত্তি এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “শান্তিই হচ্ছে উন্নয়নের সোপান। আর শান্তি তখনই বিরাজ করে, যখন ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। এজন্য আমি মনে করি, শান্তিপূর্ণ মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য স্বদেশে এবং বিদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি।

জাতিসংঘের এই অধিবেশনেই শুক্রবার জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ চেয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে ফিলিস্তিন। তবে ইসরায়েল ও তাদের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এর প্রবল বিরোধিতা করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র বলে আসছে, এ প্রস্তাবে তারা ভোটো দেবে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ থাকা মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনা আবারো শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তৃতার শুরুতেই জাতিসংঘের নবীনতম সদস্যদেশ দক্ষিণ সুদানকে অভিনন্দন জানান।

তিনি বলেন, “আমি বিশ্ব মানচিত্রে নতুন রাষ্ট্র দক্ষিণ সুদানকে জাতিসংঘের ১৯৩তম সদস্য হিসেবে স্বাগত জানাচ্ছি। একইসঙ্গে স্বাধীনতা ও মুক্তি অর্জনের জন্য আমি এই নতুন রাষ্ট্রের জনগণকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।”

‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বৈরিতা নয়’ এবং ‘সকল বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান’- ৩৭ বছর আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে গিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলা এ দুটি বাক্য উদ্ধৃত করে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “সাঁইত্রিশ বছর আগে এই মঞ্চ থেকে তিনি এ কথা উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি শান্তির এ বাণী শুধু উচ্চারণই করেননি, তিনি তা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন।”

শান্তির জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা বর্তমান সরকারের অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক নীতির অন্যতম স্তম্ভ হিসাবে উল্লেখ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক এবং প্রগতিশীল আদর্শ শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আইনের শাসনের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তিতে আমাদের সাহায্য করেছে।”

শেখ হাসিনা বলেন, “একবিংশ শতাব্দীতে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তিতে সবার সম্মিলিত ইচ্ছাকে আরও জোরদার করার মত সক্ষমতা সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত ও বৈধ একমাত্র আন্তর্জাতিক সংস্থা, জাতিসংঘেরই রয়েছে।”

জাতিসংঘের শান্তি স্থাপন কমিশনে (এনএএম-ন্যাম) সমন্বয়কারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সবসময়ই সংঘাত-পরবর্তী সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা, উন্নয়ন এবং প্রতিকারমূলক কূটনীতির পক্ষে অভিমত দিয়ে আসলেও কৌশল প্রণয়ন পর্যায়ে বাংলাদেশের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব না থাককে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ হিসাবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

‘প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে’ রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি তুলে ধরে জাতিসংঘ অধিবেশনে শেখ হাসিনা বলেন, “পুরো সময় জুড়ে আমি ছিলাম শান্তির পক্ষে একজন অগ্রণী ও নির্ভিক যোদ্ধা। আমি মনে করি, জবরদস্তি এবং আইনের শাসনের অনুপস্থিতির মতো অবিচার নিরসনের মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।”

অসাম্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য, বঞ্চনা, দারিদ্র্য, সাম্প্রদায়িকতা, নারী এবং ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকারহীনতা এবং সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করে বলেও মন্তব্য করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

১৯৬৪ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বিশ্বে পঞ্চাশ লাখেরও বেশি মানুষ অপমৃত্যুর শিকার হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমার দৃঢ় বিশ্বাস, জাতিসংঘের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা জোরদার করার মাধ্যমে এসব অপমৃত্যু পরিহার করা যেত। শান্তি এবং উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষকে স্থান দেওয়ার মাধ্যমে এই প্রাণহানি অবশ্যই এড়ানো সম্ভব হতো।”

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যারা যুদ্ধাপরাধের মতো অপরাধ করেছে, তাদের বিচার নিশ্চিত করা ‘অতীত ভুলের সংশোধনের একমাত্র পথ’ বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

সব ধরনের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দূর করতে তার সরকারের ‘কঠোর; অবস্থানের কথাও বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সামনে তুলে ধরেন তিনি।

জাতিসংঘের ৬৬তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে ১১ দিনের সফরে গত ১৮ সেপ্টেম্বর নিউ ইর্য়কে পৌঁছান শেখ হাসিনা।

সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়া ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সেমিনার ও উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন এবং বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাত করবেন।

২৮ সেপ্টেম্বর তার দেশের পথে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/প্রতিনিধি/এসইউএম/জেকে/২৩৪৯ ঘ.