ক্যাটেগরিঃ bdnews24

ঢাকা, অক্টোবর ১৬ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- পুঁজিবাদী অর্থনীতির বৈষম্যের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে দুনিয়াজুড়ে। ‘ওয়াল স্ট্রিট দখল করো’ আন্দোলনের আদলে ৮২টি দেশের ৯৫১টি শহরে বিক্ষোভ হয়েছে শনিবার।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, বিশ্বের বেশিরভাগ সম্পদ ভোগ করছে অল্প কিছু মানুষ, যুক্তরাষ্ট্রে যাদের হার ১ শতাংশেরও কম। রাজনীতিক আর ব্যাংকারদের ‘করপোরেট’ লোভের কারণে বাকি ৯৯ শতাংশ মানুষ বৈষম্য আর দারিদ্রের শিকার হচ্ছে।

এ আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র নিউইয়র্কে প্রায় ৫ হাজার মানুষ টাইম স্কোয়ারে জড়ো হয়ে জানিয়েছে তাদের অভিযোগ আর দাবির কথা। এ সময় অন্তত ৭০জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

রোমে বিক্ষোভের শুরুটা শান্তিপূর্ণ হলেও পরে তা সহিংস রূপ পায়। মুখোশধারী কিছু বিক্ষোভকারী গাড়িতে পোড়ানো এবং ব্যাংকসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা করলে তাদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ। বিক্ষোভ দমাতে কাঁদানে গ্যাস আর জলকামানও ব্যবহার করতে হয় পুলিশকে। সংঘর্ষে আহত হয় অর্ধশতাধিক।

এ পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ উল্লেখ করে ইটালির প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দাঙ্গাবাজদের’ অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে।

‘ওয়াল স্ট্রিটবিরোধী’ আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে পর্তুগালের লিসবনে ২০ হাজারেও বেশি মানুষ রাস্তায় নামে। তারা শ্লোগান দেয়- ‘ঋণের দায় আমাদের নয়, আইএমএফ বেরিয়ে যাও’। এক পর্যায়ে একদল যুবক পার্লামেন্ট ভবন ঘেরাওয়ের চেষ্টা করলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।

বিক্ষোভ চলে মাদ্রিদ, টরন্টো, সিউল, তাইপে, সিডনিতেও। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ‘মুনাফালোভী’ আখ্যায়িত করে সরকারি ব্যয় সংকোচনের প্রতিবাদ জানায় তারা। তাদের দাবি, ব্যাংক, বীমাসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত ‘কর্তৃত্ব’ খর্ব করে অর্থনৈতিক সংস্কার করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে ধনীদের ওপর আরো কর আরোপ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা বাড়ানোসহ অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতে গত ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ নামে এই আন্দোলন শুরু করে মার্কিন তরুণ-তরুণীরা।

শিক্ষার্থী ও সদ্য শিক্ষাজীবন শেষ করেছেন, এমন বেকার যুবকেরাই মূলত এ আন্দোলনের সূচনা করেন। শুরুতেই লোয়ার ম্যানহাটনের জুকোট্টি পার্কে তাবু টাঙিয়ে অবস্থান নেয় তারা। গত সপ্তাহের শুরুর দিকে বেশ কয়েকটি পেশাজীবী ইউনিয়নের সমর্থন পেয়ে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও আন্দোলনকারীদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন।

এরপর ফেইসবুক, টুইটারসহ ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলোর মাধ্যমে শনিবার বিশ্বব্যাপী এ বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়।

১৫ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী বিক্ষোভের আয়োজকদের ওয়েবসাইট ‘ইউনাইটেড ফর গ্লোবাল চেঞ্জ’-এ বলা হয়, “এখন আমাদের এক হওয়ার সময়, এখন তাদের শুনতে হবে। বিশ্বের মানুষ জেগে উঠেছে।

“আমরা রাজনীতিবীদ ও ব্যাংকারদের হাতে ভালো নেই। তারা আমাদের প্রতিনিধিত্ব করে না। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ, আলোচনা ও মানুষকে সংগঠিত করবো।”

এ আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে শনিবার ইতালির সবচেয়ে বড় ব্যাংক ইউনিক্রেডিটের সদরদপ্তরে ডিম ছুড়েছে বিক্ষোভকারীরা। মিলানে শিক্ষার্থীরাদের বিক্ষোভ গড়িয়েছে ভাংচুরে। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) সামনে বিক্ষোভ করেছে কয়েক হাজার মানুষ।

২৭ বছর বসয়ী স্কুলশিক্ষক টোবিয়াস বলেন, “আমি মনে করি, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পুরো পৃথিবীর জন্যই একটা টাইম বোমা।”

ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডনের রাস্তায় সমবেত হয় অন্তত এক হাজার মানুষ। তারা স্টক এক্সচেঞ্জের দিকে এগোনোর চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের আটকে দেয়।

আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে বিক্ষোভ-মিছিল করে অন্তত চারশ’ মানুষ। তবে মাদ্রিদে হয় ব্যাপক বিক্ষোভ। বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ সন্ধ্যায় পুয়ের্টা ডেল সোল স্কয়ারে সমবেত হয়।

সিডনিতে প্রায় দুই হাজার মানুষ অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক- রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার বাইরে সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। আদিবাসী, কমিউনিস্ট ও শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিরাও যোগ দেন তাতে।

মেলবোর্নের রাস্তায় সমবেত হয় এক হাজারের মতো বিক্ষোভকারী।

অকুপাই মেলবোর্ন ডট ওআরজি’র মুখপাত্র নিক কারসন রয়টার্সকে বলেন, “আমি মনে করি, মানুষ প্রকৃত গণতন্ত্র চায়।”

“তারা তাদের নেতাদের ওপর কর্পোরেটদের প্রভাব চায় না। তারা রাজনীতিবীদদের জবাবদিহি চায়”, যোগ করেন তিনি।

নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড, ওয়েলিংটন ও ক্রাইস্টচার্চেও বিক্ষোভ চলে। অকল্যান্ডে প্রায় তিন হাজার মানুষ বিক্ষোভ-মিছিলে যোগ দেয়। কর্পোরেট মুনাফার বিরুদ্ধে স্লে¬াগানে চারদিক মাতিয়ে তোলে তারা।

ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় বিক্ষোভকারীরা ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখায়। ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পতন হোক’, ‘ফিলিপাইন বিক্রির জন্য নয়’ লেখা ব্যানার হাতে ম্যানিলায় মার্কিন দূতাবাসের সামনে দিয়ে মিছিল করে তারা।

বিক্ষোভ হয়েছে টোকিওতেও। তাইওয়ানের রাজধানী তাইপের একশ’ এক তলা ভবনের সামনে জড়ো হয়ে একই দাবি জানিয়েছে শতাধিক মানুষ। তাদের বক্তব্য, শুধু কর্পোরেট সংস্থাগুলোই প্রবৃদ্ধির সুবিধা ভোগ করছে। আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বাড়লেও মধ্যবিত্তের আয়ের তেমন পরিবর্তন হচ্ছে না।

তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কর্পোরেশনের (টিএসএমসি) চেয়ারম্যান মরিস চ্যাং সাংবাদিকদের বলেন, “আমি বৈষম্যের বিরুদ্ধে। গত ৩০ বছরে এক শতাংশ মানুষের সম্পদের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে। অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট তারই প্রতিবাদ। এ বিষয়টি আমাদের খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এএইচ/জেকে/০৯৫৫ ঘ.