ক্যাটেগরিঃ bdnews24

 

নারায়ণগঞ্জ, অক্টোবর ৩০ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- সেনা মোতায়েন না হওয়ায় মধ্যরাতে বিএনপির ‘নির্বাচন বর্জনের’ ঘোষণার পর কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ভোট শুরু হয়েছে নারায়ণগঞ্জে।

এ নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রোববার নির্ধারিত সময় সকাল ৮টায় নবগঠিত এ সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। চলবে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। এ উপলক্ষে নির্বাচনী এলাকায় সাধারণ ছুটি রয়েছে।

সবকিছু শান্তিপূর্ণভাবেই চলছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এদিকে নিবাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী শুক্রবার থেকে নির্বাচনী এলাকায় সেনা মোতয়েন না হওয়ায় বিএনপি ভোট শুরুর মাত্র ৭ ঘণ্টা আগে শনিবার মধ্যরাতে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেওয়ায় তৈরি হয় খানিকটা অনিশ্চয়তাও। তবে ভোটাররা বলছেন, যাই ঘটুক, পরিবারের সবাইকে নিয়ে তারা ভোট দিতে যাবেন।

শনিবার রাত পৌনে ১টায় ‘জরুরি’ প্রেস ব্রিফিং ডেকে বিএনপির সহসভাপতি আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, “নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করা হয়নি। ভোটারদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে হুমকি দেওয়া হযেছে। এ পরিস্থিতিতে আমার নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করছি এবং আমাদের প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখছি।”

বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগও দাবি করেন তিনি।

এর পরপরই বিএনপি সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার নারায়ণগঞ্জে নিজের বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করে জানান, নেত্রীর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে, ‘তার’ নির্দেশে নির্বাচন ‘বর্জন’ করছেন তিনি।

“এই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না”, যোগ করেন এই বিএনপি নেতা।

অবশ্য নির্বাচন কমিশন বলছে, এই সময়ে এসে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা অর্থহীন।

“মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময় শেষ হওয়ার পর কারো নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ নেই। ঘোষণা দিলেও ব্যালটে তার প্রতীক থাকবে এবং তিনি প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন”, বলেন নির্বাচন কমিশনার মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন।

শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে উল্লে¬খ করে রিটার্নিং কর্মকর্তা বিশ্বাস লুৎফুর রহমান ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, “সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আপনারা নির্ভয়ে ভোট কেন্দ্রে আসবেন, নিরাপদে ফিরবেন। এখানে অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে।”

এ নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী ছয় জন। সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৫৬ জন ও সাধারণ কাউন্সিলর পদে প্রার্থী ২৫০ জন।

দেয়াল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত শামীম ওসমান, দোয়াত কলম প্রতীকে নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সেলিনা হায়াৎ আইভী, আনারস প্রতীকে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার, গরুর গাড়ি প্রতীকে আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সী, হাঁস প্রতীকে শরীফ মোহাম্মদ ও তালা প্রতীকে আতিকুল ইসলাম জীবন মেয়র পদের জন্য লড়ছেন।

নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত আছেন ৯ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ প্রায় সাড়ে তিন হাজার নির্বাচন কর্মকর্তা।

দেশে দ্বিতীয় বারের মতো ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার হচ্ছে এ নির্বাচনে। ৯টি ওয়ার্ডের ৫৮টি কেন্দ্রের চারশ ৫০টি বুথে একটি করে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ওয়ার্ডের ভোটার রয়েছে এক লাখ ৪৮ হাজার ৬২৯ জন।

এর আগে গত বছরের জুনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মাত্র একটি ওয়ার্ডে (চট্টগ্রাম মহানগরীর জামালখান রোড এলাকার ২১ নম্বর ওয়ার্ডে) ইভিএম ব্যবহার হয়।

এছাড়া ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা দিয়ে ২০টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ পর্যাবেক্ষণ করা হচ্ছে।

‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা’

শনিবার সন্ধ্যায় রিটানিং কর্মকর্তা বিশ্বাস লুৎফুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, “বিকাল ৫টার মধ্যে সব ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনী মালামাল কড়া নিরাপত্তায় পৌঁছানো হয়েছে।”

আট হাজারেরও বেশি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “এর মধ্যে পুলিশ ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন চার হাজার, আনসার ও ভিডিপি সদস্য আড়াই হাজার, কোস্ট গার্ডের একশ সদস্য এবং এক হাজার চারশ’ র‌্যাব সদস্য থাকছে।”

“প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ২৪ জন করে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য থাকবে।”, যোগ করেন লুৎফুর।

নির্বাচনী এলাকার ২৭টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে একজন করে নির্বাহী হাকিম, নয় জন বিচারিক হাকিম, ২৭ জন ইসির পর্যবেক্ষক, ২৭টি ভ্রাম্যমাণ ভিডিও ক্যামেরা, ২০টি কেন্দ্রে প্রথমবারের মতো সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনসহ সার্বিক প্রস্তুতির তথ্য তুলে ধরেন তিনি।

ভোটারদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “সুষ্ঠু নির্বাচনে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছি। নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে আসবেন, নিরাপদে ফিরবেন। এখানে অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।”

র‌্যাব অনিয়ম ঠেকাতে ভোটকেন্দ্রেও থাকতে পারে বলে জানান রিটার্নিং কর্মকর্তা বিশ্বাস লুৎফুর।

‘নাশকতার শঙ্কা নেই’

‘নাশকতার শঙ্কা’ প্রসঙ্গে ইসি যুগ্ম সচিব বিশ্বাস লুৎফুর রহমান বলেন, “যদি কেউ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড করার চেষ্টা করে, ভোট কেন্দ্রে অনিয়ম হয়- তাহলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

“প্রয়োজনে ভোটকেন্দ্র বন্ধ করা হবে”, যোগ করেন তিনি।

তিনি জানান, যিনি অনিয়ম করবেন তার সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

লুৎফুল বিশ্বাস বলেন, “অভিযোগ প্রমাণিত হলে যার অনুসারী তার প্রার্থিতা বাতিল করা হবে।”

সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন বলেন, কোনো পোলিং এজেন্ট প্রিজাইডিং বা সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে না জানিয়ে কেন্দ্র থেকে বেরোতে পারবে না।

ইসি পরিস্থিতি তদারক করবে

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে বসে সিসিটিভি’র মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ২০টি ভোটকেন্দ্র নির্বাচন কমিশন তদারক করবে বলে বলে জানান নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন।

দেশে নির্বাচনের ইতিহাসে এবারই প্রথম এনসিসি নির্বাচনে ২০টি কেন্দ্রে সিসিটিভি ব্যবহার করছে ইসি।

নির্বাচন কমিশনার ছহুল বলেন, “এসব কেন্দ্রের সিসিটিভি পর্যবেক্ষণের জন্য নারায়ণগঞ্জ শহীদ জিয়া হলেও একটি মনিটরিং প্যানেল বসানো হয়েছে। আর সেখান থেকেই ইসি সচিবালয়ের মনিটরিং প্যানেলে সিসিটিভিতে ধারণকৃত দৃশ্য নির্বাচন কমিশনে দেখা যাবে।”

একইসঙ্গে সিসিটিভি’র দৃশ্য রেকর্ড করার ব্যবস্থা থাকবে জানিয়ে এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, “নির্বাচনে কোনো ধরনের গোলযোগ হলে পরবর্তীতে এসব ভিডিও ফুটেজ দেখে ব্যবস্থা নেবে ইসি।”

নারায়ণগঞ্জে ভোটগ্রহণ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তাদেরও সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এজন্য ইসি’র যুগ্ম সচিব জেসমিন টুলিকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি সারাদিন নির্বাচনের বিভিন্ন বিষয় তদারক করবে।

ভোটগ্রহণ শেষে ফল সংগ্রহের কাজও করবে এই কমিটি।

পর্যবেক্ষক হাজার খানেক

ইসি সচিবালয়ের জনসংযোগ পরিচালক এস এম আসাদুজ্জামান জানান, নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য আবেদন করেছে দেশের ১৮টি পর্যবেক্ষক সংস্থা। দেশি পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো হলো- খান ফাউন্ডেশন, ডেমোক্রেসি ওয়াচ, গণকল্যাণ সংস্থা (জিকেএস), মানবিক সাহায্য সংস্থা, ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং এজেন্সী (ফেমা), পিআরপিএসএফ, আইইডি, ব্রতী, ইনোভেশন, জানিপপ, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, ডরপ, বামাশপ, হিউম্যান রাইটস, আভা ডেভলপমেন্ট সোসাইটি, হোমস্টেট সোসাইটি, পার্লামেন্ট ওয়াচ, এফ আর ফাউন্ডেশন, আইন সহায়তা কেন্দ্র (আসক) ফাউন্ডেশন ও স্বনির্ভর ওয়ার্ল্ড।

এছাড়া আটটি আন্তর্জাতিক সংস্থা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ইসির অনুমোদন নিয়েছে। এগুলো হলো- বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও নরওয়ে দূতাবাস; ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইন্সটিটিউট (এনডিআই), ইউএস এইড ও ইউএনডিপি।

সংবাদ সংগ্রহের জন্য আটশ’রও বেশি সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী নির্বাচন কমিশনের অনুমতিপত্র নিয়েছেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এমএইচসি/পিসি/এসআই/জেকে/০৮০১ ঘ.