ক্যাটেগরিঃ bdnews24

আবদুর রহিম হারমাছি
প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

ঢাকা, নভেম্বর ০৪ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া নিয়ে দেশের অর্থনীতিবিদদের মতো অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও উদ্বিগ্ন। তিনি বলছেন, ডলারের বিনিময় হার ৬৯ টাকায় বেঁধে রাখার চেষ্টা ভুল ছিল।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত কিছুদিন ধরে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম অব্যাহতভাবে বাড়ছে। এর ফলে আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ছে।

মুহিতের মতে, গত কিছুদিনে ডলারের বিনিময় হার বাড়ার একটি কারণ হজ। যারা হজে গেছেন, তাদের ডলার নিয়ে যেতে হয়েছে। আর চাহিদা বাড়ায় দামও বেড়েছে।

“আরও একটি কারণ হলো- বেশ কিছু দিন আমরা ডলারের দাম ৬৯ টাকায় বেঁধে রাখার চেষ্টা করেছিলাম। আমাদের ওই সিদ্ধান্তই ভুল ছিল। আমরা যদি তখন ওই ব্যবস্থা না নিতাম, তাহলে এখন ডলারের দাম হঠাৎ করে এতো বেশি বাড়তো না। আস্তে আস্তে বাড়তো। তখন সহনীয় মনে হতো।”

এই পরিস্থিতিতে ডলারের দাম কমাতে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো হস্তক্ষেপ করবে কি না- জানতে চাইলে বিষয়টি এড়িয়ে যান মুহিত।

বিদেশি মুদ্রা লেনদেনকারী ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএএফইডিএ) গত ১০ অক্টোবর জরুরি বৈঠক করে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। ওই বৈঠকের পর বিএএফইডিএ-এর চেয়ারম্যান ও জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম আমিনুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, আমদানি পর্যায়ে (এলসি বা ঋণপত্র খোলা) প্রতি ডলারের দর কোনো অবস্থাতেই ৭৬ টাকার বেশি হবে না। আর রেমিটেন্স ও রপ্তানির ক্ষেত্রে তা ৭৫ টাকার বেশি হবে না।

ডিলারদের ওই পদক্ষেপের পরও ডলারের বিনিময় হার বাড়তেই থাকে। এমনকি কোরবানির ঈদ সামনে প্রাবসী আয় (রেমিটেন্স) বাড়ার পরও ডলারের দর কমেনি, উল্টো বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ঈদের আগে শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার প্রতি ডলারের বিক্রয় হার ছিল ৭৬ টাকা ২৯ পয়সা। আর ক্রয়মূল্য ছিল ৭৬ টাকা ২৪ পয়সা।

এ দিন বেসরকারি উত্তরা ব্যাংক ডলার কিনেছে ৭৫ টাকা ৪০ পয়সায়। আর বিক্রি করেছে ৭৬ টাকা ৪৫ পয়সায়। আর বিদেশি ব্যাংক এইচএসবিসি ৭৬ টাকা ৩৫ পয়সায় ডলার বিক্রি করে কিনেছে ৭৫ টাকা ৩৫ পয়সায়।

দর নির্ধারণ করে দেওয়ার পরও ব্যাংকগুলো কেন বেশি দামে ডলার কেনাবেচা করছে জানার জন্য বৃহস্পতিবার রাতে আমিনুর রহমানের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

তবে বিএএফইডিএর আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আসলে ১০ অক্টোবরের বৈঠকে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ডলার কেনাবেচার ব্যবধান যাতে এক টাকার বেশি না হয়। ডলারের দর বেধে দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।”

টাকার সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার সমন্বয়ের জন্য ২০০৩ সালে দেশে ভাসমান মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা চালু হয়। এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকই ডলার কেনাবেচার দর ঠিক করে দিতো। ব্যাংকগুলো ওই দরেই ডলার কেনাবেচা করতো।

কিন্তু ২০০৯ ও ২০১০ সালে ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখতে অলিখিত হস্তক্ষেপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই দুই বছর টাকার বিপরীতে প্রতি ডলার ৬৯ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হয়। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডলারের দাম আবার বাড়তে থাকে।

‘মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ’

টাকার বিপরীতে ডলারের অব্যাহত দরবৃদ্ধিই মূল্যস্ফীতি বাড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে বলে সতর্ক করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই প্রধান অর্থনীতিবিদ।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “টাকার বিপরীতে ডলারের দর বৃদ্ধি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমাদের অর্থনীতি আমদানিনির্ভর। ডলারের দর বাড়লে আমদানি খরচও বেশি পড়ে। বেড়ে যায় পণ্যমূল্য। বাড়ে মূল্যস্ফীতিও।”

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, রোজার ঈদের আগে (২৯ অগাস্ট) প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছে ৭৩ টাকা ৬১ পয়সায়। আর বৃহস্পতিবার তা বিক্রি হয়েছে ৭৬ টাকা ২৯ পয়সায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারের গতিবিধি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত বছরের ৫ অক্টোবর প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছিল ৭০ টাকা ৪৫ পয়সায়। এই হিসাবে এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ।

কে মুজেরী বলেন, “ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় মেটাতে বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ পড়ছে। চাপ পড়ছে সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনাতেও।”

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১০-১১ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিলো ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। আর পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সেপ্টেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিলো ১১ দশমিক ৯৭ শতাংশ, যা গত দশ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

চলতি ২০১১-১২ অর্থবছরের বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে থাকবে বলে ধরা হলেও সরকারের এই লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন হবে বলেই মনে করেন মুজেরী।

“এ পরিস্থিতিতে ডলারের দর যদি বেড়েই চলে, তাহলে মূল্যস্ফীতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটাই এখন চিন্তার বিষয়।”

বিআইডিএস মহাপরিচালক বলেন, শুধু পণ্য আমদানিতে নয়, ডলারের দর বাড়লে শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির খরচও বাড়ে। আর সব আমদানি বিলই ডলারে পরিশোধ করতে হয়। ফলে ডলারের দাম বাড়লে চাপ পড়ে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদে। স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যায়।

অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে অর্থ্যাৎ জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে রপ্তানি আয়ে ২২ দশমিক ৫৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে আমদানি ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেড়েছে।

২০১১-১২ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) রেমিটেন্স প্রবাহে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ঈদের আগে প্রবাসীরা তাদের পরিবার-পরিজনের কাছে বেশি অর্থ পাঠানোয় সেপ্টেম্বর মাসের চেয়ে অক্টোবরে রেমিটেন্স বেড়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে ৮৪ কোটি ডলারের রেমিটেন্স এসেছিল। আর অক্টোবরে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ১০৪ কোটি ১৮ লাখ ডলার।

বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ১০ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে তা ৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসলেও পরে আবার ১০ বিলিয়নের ঘর অতিক্রম করে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এআরএইচ/জেকে/১১৪৫ ঘ.