ক্যাটেগরিঃ bdnews24

মাহমুদা রহমান
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

ঢাকা, নভেম্বর ১৪ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- বিয়ে বাড়ির আলোর রোশনাই তখনও নিভে যায়নি। বিয়ের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ, কেবল কন্যা স¤প্রদান শেষে স্বজনরা তুলে দেবেন গাড়িতে শ্বশুরবাড়ির পথে-এটুকু ছাড়া।

ঠিক এমন সময় বাদ সাধলেন বরের ফুপু। বিয়ে ঠিকঠাক হওয়ার সময় বরপক্ষের কোন দাবি-দাওয়া ছিলো না। কিন্তু বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বর আর তার ফুপু ভেবেছিলেন, মুখে যৌতুক চাননি তো কী হয়েছে; কনের বাবা নিশ্চয়ই টিভি, ফ্রিজ, মটর সাইকেল মেয়ের সঙ্গেই দিয়ে দেবেন। কিন্তু সে সব যখন দেখতে পেলেন না, বরের ফুপু বিয়ের আসরেই জানিয়ে দিলেন, যৌতুক হিসেবে এসব না দেওয়া হলে মেয়েকে পাঁচ বছর বাপের বাড়ি থাকতে হবে।

ফারজানা ইয়াসমিন- স্বজন, সমাজ নিজের ভবিষ্যৎ সব কিছু নিয়ে অনিশ্চয়তার ঊর্ধ্বে গিয়ে জানিয়ে দিলেন তার অটল সিদ্ধান্ত, যে ছেলে এমন নির্লজ্জের মত যৌতুক দাবি করে তার সঙ্গে কিছুতেই সংসার নয়। ব্যাস, ভেঙে দিলেন বিয়ে। যৌতুককে বলি দিয়ে বিয়ের একদিন পর কর্মস্থলে যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে ফিরে এলেন ঢাকায়; প্রতিবাদী এক নাম হয়ে।

সোমবার সকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে কথায় ফারজানা জানালেন গত শুক্রবার ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা। মেলে ধরলেন নিজের অবস্থান।

চার বোনের মধ্যে ফারজানা তৃতীয়। ছেলেবেলা কেটেছে বরগুনার আমতলীতে। বাবা বিআরডিবিতে ছোট চাকরি করেন, মা গৃহিনী। সমাজ কল্যাণে লেখাপড়া করেছেন ইডেন কলেজে। মাস্টার্সে পড়তে থাকা অবস্থায় যোগ দেন পদ্মা লাইফ ইনসুরেন্সের প্রধান শাখায় জুনিয়র অফিসার হিসেবে।

কী করে এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন- জানতে চাইলে ফারজানা বলেন, “যে ছেলে শিক্ষক হয়েও যৌতুককে সমর্থন করেন, তার সঙ্গে সংসার করার কথা আমিই ভাবতেও পারি না।”

তাই সহজেই ছিড়ে-খুঁড়ে ফেললেন বিয়ের আভরণ। প্রদীপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন- তালাকপ্রাপ্ত স্বামী হিরণ এবং যৌতুক দাবি করা ফুপুর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

ফারজানা বিশ্বাস করেন, এ ঘুনে ধরা সমাজে নারীরা দীর্ঘ সময় ধরে যৌতুকের বলি হয়ে আসছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে পুরুষের সহযোগিতা, নারীর সচেতনতা, গণমাধ্যমের ভূমিকা, সর্বোপরি সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন।
সমাজকে নাড়িয়ে দেওয়া এ তরুণী ঘুরে দাঁড়াতে চান। সুযোগ পেলে কাজ করতে চান বঞ্চিত নারীদের জন্য।

‘পণের বিনিময়ে কনে’ এ প্রথার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, এ প্রথার যথার্থ আইনি প্রয়োগ এবং যৌতুক যারা দাবি করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।

আইনত নিষিদ্ধ হলেও যৌতুক প্রথা হিসেবে টিকে রয়েছে, যা সমাজের একটি খারাপ দিক বলে মনে করেন ফারজানা।

“বিত্তবানদের ক্ষেত্রে ফ্যাশন হয়ে গেছে- মেয়ে বিয়ে দেবো, কিছু অবশ্যই সঙ্গে দিয়ে দেবো। কিন্তু আমাদের মতো মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য এটা অভিশাপ বলা যায়। কারণ আমাকে অনেক কষ্ট করে বাবা-মা ঢাকা পড়িয়েছেন। আমাকে কেন্দ্র করে তাদের একটা স্বপ্ন আছে। অমি শিক্ষিত হয়ে যদি প্রতিবাদ না করি, অন্য পাঁচটি মেয়ে কিন্তু পারবে না,” নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন তিনি।

নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তনের কথাও উঠে আসে ফারজানার কথায়। তিনি বলেন, “আমরা সভা-সমাবেশ করি, কাজের কাজ কিছু হয় না। পুরুষশাসিত সমাজে রয়েই গেছে যে পুরুষ পছন্দ করলেই বিয়ে হবে, মেয়ের পছন্দ-অপছন্দ গৌণ।”

বিয়ের আসরের কথা তুলে ধরতে গিয়ে ফারজানা জানান, তাকে ভীষণভাবে ব্যথিত করেছে শওকত আলী খান হীরণ যখন তার ফুপুর কথা মতো যৌতুক নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানায়। হীরণ যদি তার ফুপুর কথার প্রতিবাদ করতেন, তা হলে তিনি অন্যভাবে ভাবতে পারতেন।

“এক জন শিক্ষককে বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। তারা যদি জনসম্মুখে এমন দাবি করতে পারেন, তাহলে সমাজের অন্যরা কী করবেন,” এ প্রশ্ন ফারজানার।

ফারজানা জানান, এক মাস হীরণের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়। প্রথম দিকে যৌতুকের কোনো প্রসঙ্গ আসেনি। গত মাসের ১০ তারিখে ঠিক হয়, বিয়ে হবে ১১ নভেম্বর।

বিয়ের আগে তিনটি গয়না এবং কয়েক দিন পর একটি খাটের দাবি বরপক্ষ থেকে তোলা হয় বলে জানান তিনি।

ফারজানা বলেন, “আমি আব্বাকে বললাম, এরপর কি আরো কিছু শুনবো নাকি? আব্বা ভেবেছিলেন, এতেই শেষ; আর কোনো দাবি-দাওয়া থাকবে না। আমার একটু খারাপ লেগেছিলো। কিন্তু এ নিয়ে তখন কিছু আর বল্লাম না।”

“বিয়ের দিন হঠাৎ শুনতে পেলাম যৌতুক নিয়ে কথা কাটাকাটি হচ্ছে। ছেলের ফুপু টিভি, ফ্রিজ, মটর সাইকেল দাবি করায় তা আমার বাবা-চাচা-দুলাভাইয়ের সঙ্গে বাগ-বিতণ্ডা হচ্ছে। তখন হীরণ আমাকে বললো- তোমার দুলাভাইকে বল ফুপুর কাছে মাফ চাইতে, না হলে অঘটন ঘটবে। অমি অবাক হলাম,” বলেন তিনি।

ফারজানা তখন হীরণের কাছে তার মতামত জানতে চাইলেন। “সে বললো, ফুপুর কথাই ঠিক। এটা শুনেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। উঠে ওড়না মাথা থেকে ছিড়ে ফেলি, গয়নাগুলোও ছিড়ে ফেলি,” বলেন তিনি।

বিয়ের পরক্ষণে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রথমে নিজের পরিবারের সবার কাছেও সায় পাননি ফারজানা।

“আত্মীয়-স্বজনরা ব্যাপারটা সমাধানের চেষ্টা করলে অমি তাদের বললাম, চুপ, এ বিষয় নিয়ে এক দম কথা বলবেন না। যারা এ ধরনের নোংরামি করে, তাদের সঙ্গে কথা বলতেই আমার রুচিতে বাধে, সংসার করা তো দূরের কথা,” বলেন তিনি।

এরপর দুঃখ প্রকাশ করে হীরণের স্বজনদের কয়েকজন ফারজানার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও অবস্থান থেকে এক চুলও নড়েননি তিনি।

যৌতুক আইনত নিষিদ্ধ হওয়ায় এ নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেবেন কি না- জানতে চাইলে ফারজানা বলেন, “আমি প্রতিবাদ জানিয়েছি। আমি অবশ্যই চাই, সমাজ এটি দেখবে এবং জানবে। এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

বিয়ের আসরে স্বামীকে তালাক দেওয়ার এই দৃঢ়তা কীভাবে এলো- জানতে চাইলে ফারজানা তার প্রতিবেশী এক পরিবারের মেয়েকে অতিকষ্টে যৌতুক দেওয়ার ঘটনা তুলে ধরে বলেন, এরপরও ওই মেয়েটির সংসারে শান্তি ফেরেনি।

“ওদের (হীরণের পরিবার) আচরণ দেখে আমার মনে হয়েছিলো, ওরা আমাকে নিতে পারলে জ্বালিয়ে খাবে। আমার এজন্যই সরে আসা উচিত,” বলেন তিনি।

তরুণী ও নারীদের প্রতি ফারজানার আহ্বান- প্রত্যেকটি মেয়েকে সচেতন হতে হবে। তা দেখেশুনে হোক বা নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই হোক।

“আমি কিন্তু বলিষ্ঠভাবে জানিয়ে দিয়েছি, বিয়ে হয়নি তো কী হয়েছে, প্রয়োজনে অমি আর বিয়েই করবো না,” দীপ্ত কণ্ঠ ফারজানার।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/আরএম/এমআই/১৯৪৮ ঘ.