ক্যাটেগরিঃ bdnews24

 

আবদুর রহিম হারমাছি
প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

ঢাকা, নভেম্বর ২৩ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- খাদ্য ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে গেলেও জ্বালানি তেল আমদানিতে খরচ বাড়ছে লাগামহীনভাবে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলছে, ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র্রগুলোর চাহিদা মেটাতে এবার গত অর্থবছরে তুলনায় প্রায় দ্বিগুন টাকার তেল আমদানি করতে হবে।

বিপিসির চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের হিসাবে চলতি ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হবে। আর এ জন্য সবমিলিয়ে খরচ হবে ৪৮ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা।”

২০১০-১১ অর্থবছরে ২৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তেল আমদানি করেছিল বিপিসি। ২০০৯-১০ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ১৬ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকার তেল।

বিপিসি প্রধান জানান, পরিবহন খরচ, আমদানি শুল্ক, ভ্যাটসহ প্রতি লিটার জ্বালানি তেল আনতে গড়ে খরচ হয় ৭৩ টাকা। আর বর্তমানে যে দামে তেল বিক্রি করা হচ্ছে তাতেও প্রতিলিটারে ১৫ টাকার মতো লোকসান হচ্ছে। ফলে দেশের বাজারে দাম বাড়ানোর পরও চলতি অর্থবছরে তেলের জন্য প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে সরকারকে।

আর এই টাকার সংস্থান করতে গিয়ে বড় ধরনের চাপে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। তেল আমদানি ও ভর্তুকির খরচ মেটাতে গিয়ে অর্থবছরের প্রথম সাড়ে চার মাসেই (জুলাই থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত) সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সারা বছরের লক্ষ্যমাত্রার সমান ঋণ নিয়ে ফেলেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় দশগুণ বেশি। চাপে পড়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভও।

ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বাড়ায় বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়ছে। ফলে মূল্যস্ফীতি আরও ঊর্ধ্বমুখি হচ্ছে। আবার ভর্তুকি কমাতে সরকার তেলের দাম বাড়ানোর ফলেও মূল্যস্ফীতির পারদ চড়ছে। অন্যদিকে বেসরকাারি খাতে ঋণ প্রবাহ বিনিয়োগ দিন দিন কমছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজস্ব আদায়, রপ্তানি আয়, রেমিটেন্সসহ অর্থনীতির কয়েকটি সূচক মোটামুটি ভালো অবস্থায় থাকলেও জ্বালানি তেল আমদানিতে অতিরিক্ত খরচ সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে ‘তছনছ’ করে দিচ্ছে। ফলে বার বার তেলের দাম বাড়িয়েও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না সরকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এ তসলিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা খুবই দুুর্বল। বাজেটে অর্থমন্ত্রী সবমিলিয়ে ২০ হাজার কোটি টাকার মতো ভর্তুকি দিতে হবে বলে ধারণা দিয়েছিলেন। অর্থবছরের সাড়ে চার মাসের মাথায় এসে দেখা যাচ্ছে ভর্তুকি দিতে হবে ৪৮ হাজার কোটি টাকার বেশি।

“ভর্তুকি এতো বেশি বেড়ে যাবে অর্থমন্ত্র্রীর তা ধারণা ছিল না। অর্থবছরের শুরুতেই ব্যাংক থেকে এতো বেশি ঋণ নিতে হবে- সেটাও সম্ভবত ভাবেননি তিনি। অর্থনীতির সব ক্ষেত্রেই এক ধরনের সমন্বয়হীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে”, বলেন তিনি।

অধ্যাপক তসলিমের আশঙ্কা, পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সঙ্কট আরও বাড়বে।

“সরকার যখন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে চুক্তি করেছিল তখন একটি নির্দিষ্ট দামে তেল সরবরাহ করবে বলে অঙ্গীকার করেছিল। সে চুক্তি অনুযায়ীই তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। এখন মোটা অংকের ভর্তুকি দিতে হলেও আইনগত কারণে সে চুক্তি ভঙ্গ করতে পারছে না।”

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বার বার তেলের দাম বাড়িয়েও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না সরকার। তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচসহ সব ধরনের পণ্যের দামও বাড়ছে। ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বাড়ায় বেসরকারি খাত ঋণ বঞ্চিত হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে গোটা অর্থনীতিতে।”

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুুল ইসলামও বলছেন, ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুুৎ কেন্দ্র নিয়ে সরকারের ‘ভুল’ সিদ্ধান্তের কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

“এ সব বিদ্যুৎ কেন্দ্র হওয়ায় দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছু বেড়েছে ঠিক, কিন্তু এসব কেন্দ্রে তেল সরবরাহ করতে গিয়ে বাড়তি যে খরচ হচ্ছে- তা যোগাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। আমার বিবেচনায় বেশি দামে তেল কিনে কম দামে এ সব কেন্দ্রে তেল সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। ওই ভুলেরই মাশুল এখন দিতে হচ্ছে।”

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও জ্বালানি তেল আমদানি বাড়ার কথা স্বীকার করেছেন। স্বীকার করেছেন ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বাড়ার কথাও। তবে এ সব নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন বলে জানিয়েছেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বাড়ায় আমি মোটেও উদ্বিগ্ন নই। অর্থবছরের প্রথম দিকে ঋণ বেড়েছে। পরে ঠিক হয়ে যাবে। বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা অতিক্রম করবে না।”

মন্ত্রীর মতে, সামনে এখন দুটি চ্যালেঞ্জ- একটি ভর্তুকি, আর অন্যটি লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালান্স অব পেমেন্ট)।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দাবি করে মুহিত বলেন, “আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি- দেশের অর্থনীতি ভালো অবস্থায় আছে।”

কয়েকদিন আগে এক অনুষ্ঠানে দেশের অর্থনীতি নিয়ে একই ধরনের কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) খাদ্য (চাল ও গম) আমদানির জন্য এলসি খোলার (ঋণপত্র) পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংেেশ কমেছ। আর এলসি নিস্পত্তির পরিমাণ কমেছে ১০ শতাংশের মতো।

অথচ ২০১০-১১ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছিল ৯০ দশমিক ৩০ শতাংশ। এলসি নিস্পত্তির পরিমাণ বেড়েছিল প্রায় ২৫০ শতাংশ।

এবার জুলাই-অক্টোবর সময়ে শিল্প স্থাপনের জন্য মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার পরিমাণ কমেছে ৪০ দশমিক ২৫ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে তা ১০২ শতাংশ বেড়েছিল।

এর বিপরীতে অর্থবছরের প্রথম চার মাসে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ১৬৭ কোটি ডলারের (প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা) এলসি খোলা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১২০ শতাংশ বেশি। এই সময়ে তেল আমদানির এলসি নিস্পত্তির পরিমাণ বেড়েছে ১০৫ শতাংশ, গত অর্থবছরে একই সময়ে এ বৃদ্ধির হার ছিল ৬৭ দশমিক ৪১ শতাংশ।

তেল আমদানি ও বিপণনের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিপিসির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৩৭ লাখ ৭৮ হাজার ৫৪৪ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে, যার জন্য ব্যয় হয় ১৬ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা।

২০১০-১১ অর্থবছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। ২৮ হাজার ২৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে আমদানি করা হয় ৪৯ হাজার টন জ্বালানি তেল।

পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ছয় মাসে তিন দফা তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। সর্বশেষ গত ১০ নভেম্বর পাঁচ ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে পাঁচ টাকা করে বাড়ানো হয়।

এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলেন, “ভর্তুকি কমাতে তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না।”

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে আসলে পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হয়ে আসবে বলে আশা করছেন তিনি।

“দেশে পর্যাপ্ত চাল মজুদ আছে। আগামী এক বছর চাল আমদানি করতে হবে না। তবে গম আমদানি করতে হবে। আর সুখবর হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তখন আমরাও স্বস্তিদায়ক অবস্থায় থাকবো।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এআরএইচ/জেকে/১১২৯ ঘ.