ক্যাটেগরিঃ bdnews24

ঢাকা, ডিসেম্বর ১৩ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- তিনি ছিলেন এমন একজন শিক্ষক ও সংগ্রামী, যার সাহিত্যকর্ম যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনে জাতিকে দিক নির্দেশনা দিয়ে গেছে- সদ্য প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে এভাবেই স্মরণ করেছেন শিক্ষাবিদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী।

দীর্ঘদিন হৃদরোগে ভোগার পর মঙ্গলবার নিজের বাসায় ঘুমের ভেতরেই মৃত্যু হয় শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক কবীর চৌধুরীর। তার মৃত্যুর খবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন অঙ্গনের বরেণ্য ব্যক্তিরা নয়া পল্টনে কবীর চৌধুরীর বাসায় ছুটে যান তাকে শেষবারের মতো দেখতে। রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে তার পিএস ফজলুল হকও এই এই শিক্ষকের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।

জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, “অজস্র সাহিত্যকর্ম দিয়ে তিনি জাতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের আন্দোলনে জাতিকে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, সংগ্রাম করেছেন। দেশের মানুষ চিরকাল তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। তিনি তার সাহিত্য এবং মানুষের মনে চিরদিন বেঁচে থাকবেন।”

১৯২৩ সালের ৯ ফেব্র“য়ারি ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন কবীর চৌধুরী। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানি হানাদর বাহিনী তার ছোটভাই মুনীর চৌধুরীকে হত্যা করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও সরকারের শিক্ষা বিভাগে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন কবীর। তিনি বাংলা একাডেমীর সভাপতি পদেও ছিলেন। ১৯৯৮ সালে তাকে জাতীয় অধ্যাপক করা হয়।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এই শিক্ষক।

আইন মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, কবীর চৌধুরীর মৃত্যুতে জাতি এক বর্ষিয়ান পথপ্রদর্শককে হারালো।

“যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনে তিনি সোচ্চার ছিলেন। এই বিচারের শুরু হয়েছে, তিনি তা দেখে গেছেন। আমরা তার প্রস্থানে শোকগ্রস্ত”, বলেন শফিক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, উদার মানসিকতা ও মুক্ত চিন্তার ধারক ছিলেন কবীর চৌধুরী। জাতির দুঃসময়ে সুচিন্তিত ও মূল্যবান পথনির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

“স্বাধীনতার ৪০ বছরেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেখে যেতে না পারায় আক্ষেপ থাকবে তার। তবে আমরা আশা করি, এ বিচার শিগগিরই হবে। তিনি পরপার থেকে তা দেখবেন, তার আত্মা শান্তি পাবেন।”

এ কে আজাদ মনে করেন, কবীর চৌধুরীর জন্ম গত শতাব্দীতে হলেও চিন্তা-চেতনা ও মানসিকতায় তিনি ছিলেন একশ বছর এগিয়ে।

ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, দেশের যে কোনো সংকটে এগিয়ে এসে কবীর চৌধুরী অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। সা¤প্রদায়িকতাবিরোধী এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই তিনি সংগঠনকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

“একাত্তরের ঘাতকদের বিচারে ১৯৯২ এর গণআদালতে অন্যতম বিচারক ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। তার সাহিত্যকর্ম, দর্শন আমাদের ভবিষ্যতে পথ দেখাবে। তিনি সব সময়ই অভিভাবক হিসেবে আমাদের পাশে থাকবেন।”

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসা¤প্রদায়িক দেশ গঠনে পরিণত বয়সেও কবীর চৌধুরী সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।

“জাতির বিবেকের ভূমিকায় ছিলেন তিনি। শেষ বয়সে এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের শুরুটা অন্তত দেখে গেছেন- এটাই সান্তনা।”

বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, “তিনি জনগণের বিবেকের ভূমিকা পালন করেছেন। দেশের অভিভাবকের ভূমিকা রেখেছেন। সা¤প্রতিক সময়েও আমরা তাকে সব বিষয়ে অনন্য ভূমিকায় পেয়েছি।”

তার মৃত্যু জাতির বিবেকে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করবে বলে উল্লেখ করেন সেলিম।

এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, পরিকল্পনামন্ত্রী একে খন্দকার, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, যোগাযোগসমন্ত্রী ওবায়েদুল কাদের, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ, মাহবুবুল আলম হানিফ, সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান, চলচ্চিত্রকার নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু সকালেই কবীর চৌধুরীর বাসায় আসেন তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।

কবীর চৌধুরী মৃত্যুর আগে এক চিঠিতে কিছু নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। তিনি চেয়েছেন তাকে যাতে শহীদ মিনারে না নেওয়া হয়। তার জানাজা ও দাফন যেন খুব সাধারণভাবে করা হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে আসরের পর জানাজা শেষে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হবে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে।

চট্টগ্রামের বিশিষ্টজনদের শোক

জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রামের বিশিষ্টজনরাও। তারা বলেছেন, এই শিক্ষকের চিরবিদায় দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক অনুপম সেন বলেছেন, কবীর চৌধুরী জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অন্যায়ের প্রতিবাদ করে গেছেন, সত্যের জন্য লিখেছেন।

স্বাধীনতা উত্তরকালে অধ্যাপক কবীর চৌধুরী শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হন উল্লেখ করে অনুপম সেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তিনি শিক্ষার জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। তার মৃত্যু আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।”

কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেছেন, “কবীর চৌধুরী নাগরিক সমাজের একজন অভিভাবক হিসেবে ছিলেন। তিনি মুক্তবুদ্ধি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধের পক্ষে বারবার সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। আমাদের এ প্রগতির লড়াই আরও বেশ কিছুকাল চলবে।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষক ও উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সভাপতি অধ্যাপক আবুল মনসুর বলেন, “শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ সকল প্রগতিশীল আন্দোলনে সরব উপস্থিতি ছিল কবীর চৌধুরীর। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি কখনো নিরব থাকেননি। তার চলে যাওয়া কখনোই পূরণীয় নয়।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এএইচএ/এমএইচসি/এমসি/জেকে/১৩৫৮ ঘ.