ক্যাটেগরিঃ bdnews24

আবু সুফিয়ান
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

ঢাকা, জানুয়ারি ০৩ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- ১২ সহকর্মীর সঙ্গে এবার পুলিশ সপ্তাহে বীরত্বের জন্য পুলিশ পদক (বিপিএম) পেয়েছেন র‌্যাবের মহাপরিচালক মো. মোখলেসুর রহমান।

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার এই কর্মকর্তার বীরত্বের বিবরণে বলা হয়েছে, “তার কৌশলী দিক-নির্দেশনায় ২০১১ সালে র‌্যাবের অভিযানে ১৩ জন চরমপন্থী শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার হয়েছে। তাছাড়া নয় জন শীর্ষ চরমপন্থী র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে।”

কথিত বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে দেশে-বিদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ব্যাপক সমালোচনাবিদ্ধ র‌্যাবের মহাপরিচালকের হাতে মঙ্গলবার পদক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বীরত্বের ক্ষেত্রে ক্রসফায়ারকে বিবেচনায় রাখার সমালোচনা করে আইন-সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, “বন্দুকযুদ্ধের মতো বিষয়গুলো বিতর্কিত, তার কারণে রাষ্ট্রের সম্মান দেওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক।”

‘বন্দুকযুদ্ধের’ কৃতিত্বের জন্য পদক পাওয়ার বিষয়ে মোখলেসুরের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে আত্মপক্ষ সমর্থন করে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আপনারা কি চান, সন্ত্রাসীরা আমাদের গুলি করে মেরে চলে যাক, আর আমরা দেখি।”

২০১১ সালে কর্মক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য পুলিশ ও র‌্যাবের ৫৯ সদস্যকে এবার পুলিশ সপ্তাহে বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ও রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম) দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১২ জন র‌্যাবের কর্মকর্তা।

এর মধ্যে র‌্যাবের লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মনিরুল হক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান, মো. কামরুজ্জামান, শাহ মো. আজাদ, মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, মো. তাহেরুল ইসলাম, মো. আওলাদ হোসেন পিপিএম পেয়েছেন, যাদের সাহসিকতার বিবরণে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ‘জলদস্যু’ ও ‘ডাকাত’ নিহত হওয়ার বিষয়টি রয়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল বলেন, “বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন আছে। কোন অবস্থায় বন্দুকযুদ্ধ হচ্ছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।”

“বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য র‌্যাবের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, এখনো তার মীমাংসা হয়নি। তাই ‘বন্দুকযুদ্ধ’র নামে এ ধরনের পুরস্কার অতি তৎপরতা বলে আমি মনে করি,” বলেন তিনি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি করা বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থাকার থাকার কথা তুলে ধরে সুলতানা কামাল বলেন, “এই পুরস্কার সে প্রশ্নটাকে সরাসরি নাকচ করে দেওয়ার শামিল বলে আমি মনে করি। এতে তারা আরো উৎসাহিত হবে।”

সন্ত্রাস দমনে ২০০৪ সালে বিশেষ বাহিনী র‌্যাব গঠিত হওয়ার পর থেকে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ শব্দগুলোর ব্যবহার বাড়ে। কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহতের বর্ণনায় প্রায় সব ক্ষেত্রেই বলা হয়, ‘সন্ত্রাসী/চরমপন্থীদের গোপন বৈঠকের খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি দল ওই স্থানে অভিযানে যায়। সন্ত্রাসীরা গুলি ছুড়লে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালায়। এরপর অন্য সন্ত্রাসীরা পালিয়ে গেলে … জনের লাশ পাওয়া যায়’।

পিপিএম পুরস্কার পাওয়া র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসানের সাহসিকতার বিবরণে বলা হয়েছে, গত বছরের ২২ জুন সুন্দরবনে ভোলা নদীতে ফরেস্ট স্টেশনের কাছে একটি আরোহীশূন্য ট্রলার দেখতে পান। এরপর তল্লাশি করে কিছু তাজা পায়ের ছাপ দেখতে পাওয়া যায়।

“খালপাড় ধরে বনের দিকে এগোলে অতর্কিত বনের ভেতর থেকে গুলি হয়। ঘটনার আকস্মিকতায় র‌্যাবও পাল্টা গুলি চালায়। পরে ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালিয়ে চারটি গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়।”

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, কথিত বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে।

প্রায় তিন বছর আগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের আশ্বাস থাকলেও আইন-সালিশ কেন্দ্রের তথ্য, গত বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কথিত বন্দুকযুদ্ধে এবং তাদের হেফাজতে ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সুলতানা কামাল বলেন, “বোঝা যাচ্ছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ব্যাপারটিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় আমলেই নিচ্ছে না, কানই দিচ্ছে না।”

‘ক্রসফায়ারের জন্য’ পুরস্কার বিষয়টি কীভাবে দেখছেন- এই প্রশ্ন রেখে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানকে টেলিফোন করা হলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে প্রথমেই বলেন, “কঠিন প্রশ্ন। আপনি আমাকে বিপদে ফেললেন।”

ইনডিভিজুয়াল কেইস না দেখে মন্তব্য করা যাবে না- এ কথা বলে সতর্কভাবেই প্রতিক্রিয়া জানান বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরব মিজানুর।

তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, যে কাজে প্রশ্নের উদ্রেক হয় সেকাজে পুরস্কার দেওয়ার আগে ভালোমতো ভেবেচিন্তে দেওয়া উচিত। রাষ্ট্র যখন পুরস্কার দেয়, তখন নাগরিকের মনে যাতে কোনো প্রশ্ন দেখা না দেয় এবং নাগরিক যাতে তা আনন্দচিত্তে গ্রহণ করতে পারে।”

“বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার চেয়ে চরমপন্থী, জলদস্যু বা ডাকাতদের আটক করা গেলে তা হতো বীরত্বপূর্ণ। তবে আমি বিশ্বাস করতে চাই, পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লে¬ষণ করেই এসব দেওয়া হয়েছে,” যোগ করেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এএসটি/এমআই/২১০০ ঘ.