ক্যাটেগরিঃ bdnews24

ঢাকা, জানুয়ারি ০৭ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের তৃতীয় বছরে ‘ক্রসফায়ার’ এর নামে হত্যাকাণ্ড কমলেও গুপ্তহত্যার ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টিকে রাষ্ট্রের ‘কৌশল’ বলে মনে করছে মানবাধিকার সংস্থা অধিকার।

২০১১ সালে অন্তত ৩০টি গুপ্তহত্যা হয়েছে উল্লেখ করে এ সংস্থার বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “অস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দাবির মুখে রাষ্ট্র এই কৌশল বেছে নিয়েছে।”

অধিকারের সচিব আদিলুর রহমান খান শনিবার জানান, তাদের এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন জেলার মানবাধিকার কর্মী ও জাতীয় দৈনিক পত্রিকা থেকে সংগ্রহ করা উপাত্তের ভিত্তিতে।

এতে অধিকার বলেছে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে ক্রসফায়ারের নামে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ১৫৪টি। ২০১০ সালে এ সংখ্যা ছিলো ১২৭। ২০১১ সালে তা কমে ৮৪ তে দাঁড়ায়।

তবে গত বছর আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে গুম বা গুপ্তহত্যার ঘটনা। ২০০৯ সালে ২টি গুমের ঘটনার কথা জানা গেলেও ২০১০ সালে হয় ১৮টি। আর ২০১১ সালে গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন অন্তত ৩০ জন।

ব্যাপক সমালোচনার মুখে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে র‌্যাব, পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কথিত ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে হতাহতের ঘটনা কমে আসলেও বিভিন্ন স্থানে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের লাশ উদ্ধারের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় ওই সময় থেকেই ‘গুম’ শব্দটি আলোচনায় আসে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সাদা পোশাকের লোকজন বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর কখনো ডোবা, কখনো নদীতে এসব ব্যক্তিদের লাশ পাওয়া যায়। নিহতদের মধ্যে যাদের পরিচয় মিলেছে, তাদের অনেকেই বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নানা স্তরের নেতা-কর্মী।

অবশ্য র‌্যাব ও পুলিশ এ ধরনের ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুপ্তহত্যার অভিযোগ ওঠার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছেন, পত্রিকা পড়ে তিনি গুপ্তহত্যার খবর জেনেছেন।

আর পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেছেন, গুম-অপহরণ-হত্যা অপরাধীদের কৌশল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক ব্যবহার করে তারা এসব অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।

তিনি এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখার কথা জানালেও এখন পর্যন্ত একটি ঘটনারও কিনারা হয়নি।

অধিকারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “রিমান্ডে নিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে প্রতিনিয়ত। এই সময় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর অনেককেই আদালতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হাজির না করে থানা হাজতে আটকে রেখে নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে।”

২০১১ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে ‘নৈরাশ্যজনক’ উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, “গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনা কমলেও তা নাটকীয় মোড় নিয়েছে। পুলিশ কর্তৃক একদল মানুষকে লেলিয়ে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে ১৬ বছরের কিশোর শামসুদ্দিন মিলনকে।”

এছাড়া সীমান্তে ১৫ বছরের কিশোরী ফেলানীসহ ৩১ জন বাংলাদেশি প্রতিবেশী ভারতের সীমান্তরক্ষীদের হাতে নিহত হওয়ার পরও ‘দুর্বল পররাষ্ট্রনীতির’ কারণে বাংলাদেশ ক্ষতিপূরণ আদায়ে ব্যর্থ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে অধিকারেরর প্রতিবেদনে।

এতে বলা হয়, “আওয়ামী লীগের তিন বছরে রাজনৈতিক সহিংসতা চরম আকার ধারণ করেছে। ২০০৯, ২০১০ ও ২০১১ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় যথাক্রমে ২৫১, ২২০, ১৩৫ জন নিহত হন।”

টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ছাত্রাবাসের সিট দখল, হল দখল ও আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাকেই এসব সহিংসতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে অধিকার।

তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে ৭১১ জন নারী ধর্ষণ, ৫১৬ জন যৌতুকের কারণে সহিংসতা এবং ৬৭২ জন বখাটেদের যৌন হয়রানীর শিকার হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ‘পুরুষতান্ত্রিকতার প্রভাব’ ছাড়াও ‘রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দুর্বৃৃত্তায়ন, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিস্ক্রিয়তা ও ফৌজদারী বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতার’ কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করা যাচ্ছে না।

গত বছর প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করায় এবং ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র ও যুব সংগঠন হামলায় বিরোধী দলের অনেক সভা সমাবেশ পণ্ড হয়ে গেছে উল্লেখ করে অধিকার বলেছে, “প্রতিটি ঘটনার পেছনে ক্ষমতাসীন দল এবং পুলিশ প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা দেখা গেছে। ২০১১ সালে সারাদেশে ফৌজদারী কার্যবিধি ১৪৪ ধারা প্রয়োগ করে ১০৩ টি সভা বন্ধ করে দেয়া হয়।”

সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনির মাধ্যমে ‘৫১টি রাজনৈতিক সংবেদনশীল বিষয়ের পরিবর্তন’ ঘটানোয় এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

সরকারের তিন বছরের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নে অধিকার বলেছে, “গত তিন বছরে এটিই প্রমানিত হয়েছে যে, অগণতান্ত্রিক ও জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী কাঠামো বজায় রেখে শুধুমাত্র একটি নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত কোনো দলকে শাসন করতে দিলে তা জনগণের কোনো কাজে আসে না।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এএসটি/জেকে/১৭৫২ ঘ.