ক্যাটেগরিঃ bdnews24

 

আশিক হোসেন
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিবেদক

ঢাকা, জানুয়ারি ১৩ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- ছাত্রলীগের একটি অংশের প্রতি সরাসরি পক্ষপাতের মাধ্যমে উপাচার্য শরীফ এনামুল কবীর শিক্ষার্থী জুবায়ের আহমদ হত্যাকাণ্ডের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন বলে অভিযোগ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। উপাচার্যের বিরুদ্ধে দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে তাদের।

তবে অধ্যাপক কবীর তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। ছাত্রলীগের কোনো কর্মকাণ্ডের দায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নেবে না বলে উপাচার্য জানালেও জোবায়ের হত্যার পর তিনিই সাংবাদিকদের বলেছিলেন, এর সঙ্গে ছাত্রলীগের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

গত ৮ জানুয়ারি ছাত্রলীগের এক দল কর্মীর কুপিয়ে আহত করে সংগঠনটিরই কর্মী ও ইংরেজি বিভাগের ছাত্র জুবায়েরকে। পর দিন তার মৃত্যু হলে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে।

ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কমিটির (স্থগিত) নেতারা বলছেন, উপাচার্যের মদদপুষ্ট ছাত্রলীগকর্মীরাই জুবায়েরকে হত্যা করেছে।

জুবায়ের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তিন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে তার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। জুবায়েরের পরিবারও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর অনাস্থা জানিয়ে ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষক রায়হান রাইন বলেন, “তিন শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত ক্রমে বহিষ্কার না করে তাদের সাজাকে দুর্বল করা হয়েছে। তারা যদি পরবর্তীতে আদালতে যায়, তাহলে এ বহিষ্কারাদেশ নাও টিকতে পারে।”

“এ হত্যাকাণ্ডের জন্য কেবল তিন জন দায়ী নয়। সবাই জানে যে হামলাকারী অন্তত ১৫ জন ছিল। মূলত পরিকল্পনাকারী এবং অন্যদের রক্ষা করতে সবার দায় এ তিন জনের ওপর চাপিয়েছে প্রশাসন,” বলেন তিনি।

উপাচার্যসহ প্রশাসনের কর্তা-ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নাটক ও নাট্যতত্ব বিভাগের অধ্যাপক হারুনুর রশীদ বলেন, “জুবায়েরকে আহত অবস্থায় কীভাবে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো, তার কোনো উত্তর প্রশাসন দিতে পারেনি। নিরাপত্তা কর্মকর্তা আছে, বিভিন্ন স্থানে গার্ড রয়েছে, তাদের ভূমিকা কী ছিল, সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে।”

শিক্ষার্থীরা জানায়, সন্ধ্যায় জুবায়েরকে কুপিয়ে আহত করার পর হামলাকারীরাই তাকে সাভারের একটি হাসপাতালে দিয়ে আসে। প্রশাসন খবর পেয়েও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তা আজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে মদদের অভিযোগ এনে তার পদত্যাগও দাবি করে আসছিল শিক্ষার্থীরা।

দাবির মুখে শুক্রবার আজিমকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এক সময়ের ছাত্রলীগকর্মী আজিম বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার পর নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। ছাত্র থাকাকালে তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগ ছিল।

ছাত্রলীগের স্থগিত কমিটির সভাপতি রাশেদুল ইসলাম শাফিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, উপাচার্য সংগঠনের একটি অংশকে সরাসরি সমর্থন দিয়ে আসছেন। এরা এক সময় ছাত্রদল করলেও এখন উপাচার্যের পৃষ্ঠপোষকতায় ছাত্রলীগের নামে কাজ চালাচ্ছে।

সরকার সমর্থক সংগঠনের এই কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ অধিকাংশই সদস্যই বর্তমানে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত। জুবায়েরও ছিল এদের মধ্যে একজন। একটি পরীক্ষায় অংশ নিতে সেদিন ক্যাম্পাসে গিয়েছিলেন।

শাফিন বলেন, ২০১১ সালের ২ ফেব্র“য়ারি উপাচার্যের ‘নির্দেশে’ প্রক্টর আরজু মিয়া শামীম-শরীফ গ্র“পকে বঙ্গবন্ধু হলে পুনর্বাসিত করতে যায়। ওই সময় শরীফের কোমর থেকে অস্ত্র পড়ে গেলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রক্টরসহ তাদের ধাওয়া করে।

“তবে ওই রাতেই পুলিশি পাহারায় উপাচার্যের সন্ত্রাসী গ্র“পকে হলে ওঠানো হয়। বিতাড়িত হয় জুবায়েরসহ শতাধিক শিক্ষার্থী,” বলেন তিনি।

উপাচার্যের বিভাগের (রসায়ন) শিক্ষক আরজু মিয়ার বিরুদ্ধেও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ রয়েছে। জুবায়ের হত্যাকাণ্ডের পর শিক্ষক সমিতির সভায় সমিতির সভাপতিকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। তার অপসারণের দাবি রয়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের কার্যক্রম স্থগিত দাবি করলেও গত ৪ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনারে ছাত্রলীগের ব্যানারে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটার অনুষ্ঠানে প্রক্টরকেও দেখা গেছে।

শাফিন বলেন, ২০১০ সালের ২৩ মে একই ‘সন্ত্রাসী’রা ছাত্রলীগ সহ-সভাপতি রাশেদ রেজা ডিকেনসহ সাত জনের ওপর হামলা চালায়। তবে প্রশাসনের চাপে থানা কোনো মামলা নেয়নি। পরে আদালতে মামলা করা হয়।

“ওই মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা হলেও উপাচার্য তাদের ক্যাম্পাসে আশ্রয় দিয়ে রেখেছেন। তাদের জামিনে মুক্তির জন্য উপাচার্য নিজে তদবির করছেন,” অভিযোগ শাফিনের।

২০০৯ সালের ২৪ ফেব্র“য়ারি সরকার উপাচার্য হিসেবে শরীফ এনামুল কবিরকে নিয়োগ দেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিভাগে প্রায় দেড়শ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়, যার প্রায় সবই দলীয় বিবেচনায় হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে।

সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক নাসিম আখতার হোসাইন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই শিক্ষক নিয়োগের সময় মেধাকে কোনোভাবেই মূল্যায়ন করা হয়নি।”

অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক আনু মুহাম্মদ বলেন, “বর্তমান উপাচার্য তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে সব শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন, তাদের বেশিরভাগেরই যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।”

অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবীর প্রায় তিন বছর হলো দায়িত্ব নিলেও এখন পর্যন্ত নির্বাচনের মাধ্যমে এই পদে থাকার আইনি বিধান পালিত হয়নি।

১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট অনুসারে, প্রতি চার বছর পর পর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নির্বাচন হওয়ার নিয়ম রয়েছে।

এই বিষয়ে আনু মুহাম্মদ বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ রাখতে আইনের অবমাননা হচ্ছে। মনে হয় নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত না হলে তিনি (শরীফ এনামুল) নির্বাচন দেবেন না।”

উপাচার্যকে প্রধানমন্ত্রীর এক জন উপদেষ্টার আশীর্বাদপুষ্ট অভিহিত করে নাসিম আখতার হোসাইন বলেন, “যখন নির্বাচন হয় না, তখন এ ধরনের সিন্ডিকেটগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অনির্বাচিত উপাচার্যের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা তৈরি হয় না। সে স্বৈরাচারী আচরণ করে।”

অধ্যাপক নাসিম প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আলাউদ্দিন আহমেদের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। অধ্যাপক আলাউদ্দিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকার সময় অধ্যাপক এনামুল কবীর ছিলেন কোষাধ্যক্ষ।

ওই সময় ছাত্রলীগের একদল নেতার বিরুদ্ধে ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগ ওঠলেও তৎকালীন প্রশাসনের ভূমিকা ছিলো বিতর্কিত। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ধর্ষণকারী হিসেবে চিহ্নিত এক ছাত্রলীগ নেতার এক বছরের বহিষ্কারাদেশও ‘সদাচারণের’ জন্য স্থগিত করেছিল তৎকালীন প্রশাসন।

এত অভিযোগ উঠলেও শরীফ এনামুল কবীর দাবি করেছেন, এর সবাই ভিত্তিহীন অভিযোগ।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে এ সব অভিযোগ সত্য নয়। জুবায়েরের মৃত্যুতে আমিও শোকাহত।”

তিন জনকে বহিষ্কারের বিষয়টি তুলে ধরে উপাচার্য বলেন, “অপরাধী যত জনই হোক, তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী তাদের সবাইকে শাস্তি পেতে হবে।”

ছাত্রলীগের একটি অংশের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগও নাকচ করেছেন গোপালগঞ্জের বাসিন্দা শরীফ এনামুল কবীর।

তিনি একইসঙ্গে বলেন, “ছাত্রলীগের কোনো কর্মকাণ্ডের দায়ভার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নেবে না।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এএইচএ/এমআই/১৯৫৫ ঘ.