ক্যাটেগরিঃ bdnews24

 

ঢাকা, জানুয়ারি ২৬ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর সমালোচনার মুখে থাকা মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন বলছেন, তদন্তেই প্রমাণ হবে যে তার কোনো দোষ নেই।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্থগিত থাকা পদ্মা সেতু এবং এই বিষয়ে যোগাযোগমন্ত্রী থাকাকালে নিজের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন তিনি।

আবুল হোসেন বলছেন, একটি গোষ্ঠী স্বার্থ হাসিলের জন্য এ প্রকল্প নিয়ে অপপ্রচার চালিয়েছে, যার প্রভাবে ‘বিভ্রান্ত’ হয়েছে বিশ্বব্যাংকও। আর এতে দেশের মানুষের স্বপ্নপূরণে দেরি হচ্ছে।

প্রকল্পে দুর্নীতি হওয়ার সন্দেহে গত অক্টোবরে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন স্থগিত করে। ২৯০ কোটি ডলারের এই প্রকল্পে ১২০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার কথা এই আন্তর্জাতিক সংস্থার। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশনও, যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই দুর্নীতির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

আবুল হোসেন বলেন, “যখন আসল সত্য বেরিয়ে আসবে, যখন বানানো অভিযোগগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হবে, তখন সব বিভ্রান্তির অবসান ঘটবে। মিডিয়া ও বিশ্বব্যাংকও আসল ঘটনা বুঝতে পারবে। আমি আশাবাদী যে, শেষে সত্যই টিকে থাকবে এবং পদ্মা সেতু প্রকল্প সামনে এগিয়ে যাবে।”

দেশের দীর্ঘতম সেতু, যা হবে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে মধ্যাঞ্চলের যোগসূত্র, নির্মাণে গত বছরের এপ্রিলে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের ঋণ চুক্তি হয়।

এরপর প্রকল্পের আওতায় নদী খনন, পরামর্শক নিয়োগ ও নির্বাচন নিয়ে আবুল হোসেনের দিকে অভিযোগের আঙুল ওঠায় বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়।

একই সঙ্গে কয়েকটি দুর্ঘটনার পর বেহাল সড়ক নিয়ে দেশে সমালোচনায় পড়েন তখনকার যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন।

এই প্রেক্ষাপটে গত বছরের শেষ দিকে এসে মন্ত্রিসভায় রদবদলে দপ্তর পরিবর্তন হয় আবুল হোসেনের, নবগঠিত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আনা হয় তাকে।

আবুল হোসেন দাবি করেছেন, তাকে যে দায়িত্বই দেওয়া হয়, সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তা পালন করেন তিনি।

এর উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, “১৯৯৮ সালের দুটি পাসপোর্টের বিষয় গণমাধ্যমে খুব গুরুত্বপূর্ণ আইটেম হয়েছিলো। যদিও তারা এ বিষয়টি কখনো প্রকাশ করেনি যে পরবর্তীকালে ওই ঘটনার একটি তদন্তে দেখা গেছে, সেটা আমার নয়, বরং সংশ্লিষ্ট এক প্রশাসনিক কর্মকর্তার ভুলে ওই ঘটনা ঘটেছিলো। সর্বোচ্চ পর্যায়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আমি তখন স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছিলাম। তবে বিস্ময়করভাবে তখন আমার ওই পদক্ষেপের কোনো স্বীকৃতিও গণমাধ্যমে আসেনি।”

শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন বিগত সরকারে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ছিলেন আবুল হোসেন।

পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ দাবি করে তিনি বলেন, “নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য কিছু গোষ্ঠী বেনামী চিঠির মাধ্যমে এবং গণমাধ্যমকে ভুল পথে চালিত করে গুজব ছড়িয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে এই মিথ্যার ফুলঝুরি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তাতে বিশ্বব্যাংকও উদ্বিগ্ন হয়েছে।”

“এসব গুজব শুধু আমার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করলে তাতে আমি এতোটা উদ্বিগ্ন হতাম না। কিন্তু এর সঙ্গে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প জড়িত থাকায় এই ভুল ধারণা দূর করে প্রকৃত ঘটনাকে সবার সামনে নিয়ে আসার বিষয়ে আমি প্রচণ্ড দায় অনুভব করছি,” বলেন আবুল হোসেন।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের তদারকি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ পাওয়ার আবেদন জানানো এসএনসি-লাভালিনের কার্যালয়ে গত সেপ্টেম্বরে কানাডীয় পুলিশ অভিযান চালানোর পরপরই ‘দুর্নীতি’র বিষয়টি প্রকাশ্য হয়। এরপর অর্থায়ন স্থগিতের সিদ্ধান্ত আসে।

আবুল হোসেন জানান, বিশ্বব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের ফলে সেতু নির্মাণে দরপত্র আহ্বান ও ঠিকাদার নির্বাচনের বিষয়টি আটকে গেছে।

সদা হাস্যোজ্জ্বল আবুল হোসেন বলেন, “আমি নিশ্চয়তা দিতে পারি, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে আমার মাধ্যমে পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়নি। আমার যাবতীয় কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেছি। পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করতে আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি।

“দুঃখজনক হলেও সত্যি, একটি মহল বেনামী চিঠিতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে দুর্নীতির ধুয়া তুলে এই প্রকল্পকে থামিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। আমি নিশ্চিত, বিশ্বব্যাংক এই ষড়যন্ত্রের পেছনের মূল কারণ উদঘাটন করতে পারবে”, বলেন তিনি।

মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে থেকে স্বার্থের সংঘাত ঘটানোর যে অভিযোগ এসেছে, সে বিষয়ে আবুল হোসেন বলেন, “২০০৯ সালের জানুয়ারিতে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার আগে আমি সাঁকো ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের পদ থেকে ইস্তফা দিই। আমার সংশ্লিষ্টতা থাকে এমন কোনো রাজনৈতিক খাতে ব্যবসায় না যেতে ওই কোম্পানিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ওই কোম্পানিও সিদ্ধান্ত নেয়, তারা যোগাযোগ খাতে কোনো ব্যবসা করবে না।”

যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব থাকাকালে গণমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনায় আবুল হোসেনের প্রতিক্রিয়া- তিনি অনেক সময়ই অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন; যদিও তিনি বাক ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার একনিষ্ঠ সমর্থক।

“আমি যোগাযোগমন্ত্রী থাকার সময় মন্ত্রীর দপ্তর সংস্কার নিয়ে গণমাধ্যমে সমালোচনা হয়। প্রথম আলোর এক রঙিন প্রতিবেদনে বলা হয়, এ সংস্কার কাজে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে ওই ব্যয় ছিল ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা। এছাড়া যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ব্যয়বহুল গাড়ি কিনছে বলেও অতিরঞ্জিত খবর প্রকাশ হয়, যা কখনো কেনাও হয়নি।”

“যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে আমার প্রচেষ্টার নানা দিক নিয়ে গুজবের ওপর ভিত্তি করে প্রচুর গল্পও প্রচার করা হয়েছে। ২০০৫ সালে আমার গ্রামে শেখ হাসিনা অ্যাকাডেমি অ্যান্ড উইমেনস কলেজের কাছে আমার নিজের টাকা দিয়ে আমি একটি অতিথিশালা নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলাম। এই বছর তার নির্মাণ কাজ শেষ হলেও আমি একদিনও সেখানে থাকিনি। আমার সংসদীয় এলাকার উন্নয়নের জন্য এ ধরনের একটি জনকল্যাণমূলক কাজকেও প্রথম আলো সমালোচনা করেছে,” বলেন আবুল হোসেন।

তিনি বলেন, “গণতন্ত্র ও বাক স্বাধীনতায় আমার দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে। তবে আমি এটাও বিশ্বাস করি যে স্বাধীনভাবে কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সত্য ও যথাযথ বক্তব্য দেওয়ার দায়িত্বও বর্তায়।”

সাক্ষাৎকারে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের আশা প্রকাশ করে আবুল হোসেন বলেন, বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বেশ কয়েকটি তদন্ত চলছে।

“আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আমিও তদন্তে সর্বোচ্চ সহযোগিতার চেষ্টা করছি। আমি শুধু আশা করতে পারি, এই তদন্ত শেষ হবে এবং তা প্রকৃত ঘটনাই প্রকাশ পাবে। দেখা যাবে, পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনাই ঘটেনি,” বলেন তিনি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/প্রতিনিধি/এমআই/০৯১৫ ঘ.