ক্যাটেগরিঃ bdnews24

ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২২ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- মুহাম্মদ ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে সরানোর জন্য যাকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হয়, সেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই এবার এ নোবেল বিজয়ীকে ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্ব ব্যাংকের প্রধান করার প্রস্তাব দিয়েছেন।

সবসময় আমেরিকানদের দখলে থাকা ওই পদটি বাংলাদেশের মতো গরিব ঋণগ্রহিতা দেশগুলোতে অনেক ক্ষমতার আধার। তবে এ পদে ইউনূসের নাম প্রস্তাব করার ধারণাটি স্বাভাবিকভাবেই অনেককে বিস্মিত করার মতো।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধিদল বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কার্যালয়ে দেখা করতে গেলে শেখ হাসিনা তাদের এই প্রস্তাব দেন।

বৈঠকে উপস্থিত একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বিষয়ক প্রতিবেদক সুমন মাহবুবকে বলেন, জ্যঁ ল্যাম্বার্টের নেতৃত্বে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা শেখ হাসিনার এ প্রস্তাবের প্রশংসাও করেছেন।

ওই কর্মকর্তা বলেন, “বৈঠকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, যোগাযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, সন্ত্রাস দমন এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে এবং এসব ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।”

তবে ইউনূস প্রসঙ্গে বিস্তারিত আর কিছু জানাননি ওই কর্মকর্তা।

বিশ্ব ব্যাংকের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রবার্ট জেলিক গত সপ্তাহে জানিয়ে দেন, তিনি আর এ পদে পুনঃনিয়োগ চান না। পাঁচ বছর মেয়াদ শেষে আগামী ৩০ জুনই তিনি পদ ছাড়বেন। এ সংস্থার পরবর্তী প্রধান কে হচ্ছেন- তা নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই আলোচনা চলছে, যাতে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের নামও।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ সংস্থার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন কোনো না কোনো আমেরিকান, যেখানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শীর্ষ পদে সবসময়ই ছিলেন ইউরোপীয় কেউ।

গরিব দেশগুলোতে পাশ্চাত্যের নীতি-পরামর্শ চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগে প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে এ দুটি প্রতিষ্ঠানকে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেসব নীতির কারণে উল্টো ফল হয়েছে বহুবার।

এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির ‘ভালো বন্ধু’ হিসেবে পরিচিত ইউনূসকে বিশ্বব্যাংক প্রধানের পদে মনোনীত করা হলে তা হবে এ সংস্থার দীর্ঘদিনের অবস্থানের বড় পরিবর্তন। আর ওই পদে যেতে পারলে ইউনূসকেও ‘দরিদ্রদের ব্যাংকার’ থেকে নিজেকে পরিণত করতে হবে ‘দরিদ্র দেশের ঋণদাতায়’।

দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্ব ব্যাংক স¤প্রতি ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের পদ্মা নেতু প্রকল্পে অর্থায়ন স্থগিত করে দেওয়ায় সরকারের সঙ্গে তাদের টানাপোড়েন চলছে। এই সেতু নির্মাণে অর্থের জন্য এখন হন্যে অন্য উৎস খুঁজতে হচ্ছে সরকারকে।

বিস্ময়কর পদক্ষেপ

নরওয়ের টেলিভিশনে ২০১০ এর ডিসেম্বরে প্রচারিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে গ্রামীণ ব্যাংককে দেওয়া বিদেশি অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ ওঠে ইউনূসের বিরুদ্ধে। এরপর শেখ হাসিনা ও তার মধ্যে যে ‘তিক্ততা’ তৈরি হয়েছে, তাতে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবটি বিস্ময়কর বলতেই হবে।

ওই প্রামাণ্যচিত্রে দেখা যায়, নরওয়ের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা নোরাডের পক্ষ থেকে গ্রামীণ ব্যাংককে দেওয়া ১০ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ ১৯৯৬ সালে গ্রামীণ কল্যাণ নামের অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নেন ইউনূস।

বিষয়টিকে চুক্তির লঙ্ঘন বিবেচনা করে সে সময় নরওয়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে কড়া ভাষায় অভিযোগ জানানো হয় গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে।

এরপর ইউনূস অসলোতে গিয়ে নোরাড প্রধানের সঙ্গে দেখা করেন এবং দুই পক্ষ একটি মীমাংসায় পৌঁছায়।

এর কয়েক বছর পর টেলিভিশনে প্রচারিত প্রামাণ্যচিত্রে সেই সময়ের নথিপত্র তুলে ধরা হলে আরেক দফা তদন্ত করে নরওয়ে কর্তৃপক্ষ। তখনও জানানো হয়, দুইপক্ষ সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলেছে।

ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের চেষ্টাকে ‘শান্তি স্থাপন’ বিবেচনা করে ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংককে, যে প্রতিষ্ঠানটির সূচনা হয়েছিল ১৯৮৩ সালে একটি সামরিক অধ্যাদেশের মাধ্যমে।

ইউনূসের নোবেল জয়ের খবরে যারা তাকে সবার আগে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন, তখনকার বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা তাদেরই একজন। গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋণ উদ্যোগের প্রশংসায় একটি বিবৃতিও দিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের ব্যর্থ চেষ্টার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন নোবেল বিজয়ী ইউনূস। জরুরি অবস্থার মধ্যে বড় সব দল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখতে বাধ্য হলেও ইউনূসকে নতুন দল গঠনের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল তখন, যা ছিল ইউনূসের প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার অন্যতম কারণ।

এরপর সেই প্রামাণ্যচিত্র নতুন করে সমালোচনার কেন্দ্রে নিয়ে যায় গ্রামীণ ব্যাংক ও ইউনূসকে। ঋণ দেওয়ার পর গ্রামীণ ব্যাংক গ্রহীতাদের কাছ থেকে যে প্রক্রিয়ায় কিস্তি আদায় করে- তা নিয়েও শুরু হয় নতুন সমালোচনা।

দেশে ও বিদেশে বাম ধারার অনেক বুদ্ধিজীবী দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষুদ্র ঋণের বিরুদ্ধে বলে আসছেন। তাদের মতে, দারিদ্র্য বিমোচনে এই ঋণের ভূমিকা প্রমাণিত নয়। আর গ্রামবাংলায় সুদখোর মহাজনেরা সব সময়ই পরিচিত ছিলেন ‘রক্তচোষা’ হিসেবে। সেই বিবেচনা থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সে সময় ইউনূসকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “গরিব মানুষের রক্ত চুষে খেলে ধরা খেতে হয়।”

সরকারের অর্থায়ন ও সহযোগিতায় গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইউনূস এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করে আসলেও ২০১১ সালে অবসরের বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তার পদে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই বছর মার্চে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন ইউনূসকে অব্যাহতি দেয়, তখন তার বয়স প্রায় ৭১।

যেখানে সরকারি চাকরিতে অবসরের সীমা তখন ছিল ৫৭ বছর, অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অবসরের বয়স ছিল ৬০, বিচারকদের ৬৭, ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের ৬৫, সেই পরিস্থিতিতেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই অব্যাহতির আদেশকে ‘প্রতিহিংসা’ হিসেবে দেখেছিলেন অনেকে।

ইউনূস কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই আদেশের বিরুদ্ধে আদালতে যান এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আপিল বিভাগের আদেশে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্তৃত্ব হারান।

এরপরও তাকে পদে রাখার জন্য গ্রামীণ ব্যাংক সরকারের অবস্থানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করে। ইউনূসের বিষয়টি নিয়ে দেশে-বিদেশে সমালোচনায় পড়তে হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।

অনেকেই বলছেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ঝুলে যাওয়ার পেছনেও ইউনূসের হাত রয়েছে। ওয়াশিংটনের প্রভাবশালী বন্ধুদের তিনি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে লাগিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। অবশ্য ইউনূস সব সময়ই এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

ক্লিনটন পরিবারের সঙ্গে ইউনূসের বক্তিগত বন্ধুত্বের বিষয়টি সব মহলেরই জানা। গ্রামীণ ব্যাংকের পদ নিয়ে আইনি লড়াইয়ের মধ্যেই হিলারি ক্লিনটন এ ব্যাপারে সরকারকে চাপ দিয়েছিলেন বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছিল সেই সময়ে।

এই পটভূমিতে শেখ হাসিনার উদ্যোগকে নিশ্চিতভাবেই একটি ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হিসেবে দেখা হবে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এসইউএম/টিআইকে/জেকে/জিএনএ/১৯৪৮ ঘ.