ক্যাটেগরিঃ bdnews24

 

ঢাকা, মার্চ ০৩ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- গ্রামীণ ব্যাংককে কোনো ‘ধাক্কা না দেওয়ার’ আবেদন জানিয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

তিনি বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, “ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কে থাকলো সেটা বড় কথা নয়, আমি আপনাদের নিকট আবেদন করি, এখানে যেন কোনো ধাক্কা না লাগে।”

“আমি চলে যেতে চেয়েছি। কিন্তু পরিচালনা পরিষদের সিদ্ধান্তে আমাকে থাকতে হয়েছে,” বলেন তিনি।

ইউনূস জানান, গ্রামীণ বাংকের ৮৩ লাখ ঋণগ্রহিতা রয়েছে। দেশের এক তৃতীয়াংশ পরিবার এর সঙ্গে যুক্ত।

তিনি বলেন, “কারো অনুদানে নয়, নিজস্ব আমানত দিয়ে চলে এই প্রতিষ্ঠান। তাই আস্থায় চিড় ধরলে এই প্রতিষ্ঠান নড়বড়ে হয়ে যাবে।”

“চলুন আমরা সবাই মিলে এই প্রতিষ্ঠানটি রক্ষা করি,” বলেন ইউনূস।

গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে ইউনূসকে অপসারণের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে তার করা রিট আবেদনের শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের একথা বলেন তিনি।

সুপ্রিম কোর্ট বারের দক্ষিণ অডিটোরিয়ামে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মুহাম্মদ ইউনুস এক প্রশ্নের জবাবে ইউনুস বলেন, আমি চেয়েছিলাম আমার বিদায় যেন সুন্দর ও সম্মানজনক হয়।

মুহাম্মদ ইউনূসকে শেষবার গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি নেওয়া হয়নি- এ কারণে বুধবার তাকে ওই পদ থেকে অব্যাহতির আদেশ জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বুধবার সন্ধ্যায় গ্রামীণ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে বলা হয়, ইউনূস যথারীতি তার পদে বহাল আছেন বলেই ব্যাংকের আইন পরামর্শদাতারা মনে করেন। একই বিষয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের নয় জন পরিচালক হাইকোর্টের একই দিন একই বেঞ্চে আরেকটি রিট আবেদন করেছেন।
বিচারপতি মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের বেঞ্চে রিটটি করা হয়। শুনানি শেষে ইউনূসের আইনজীবীরা রুল চাইলে আদালত রোববার আদেশের দিন ধার্য করে।

এ সময়ের মধ্যে নতুন কোন পদক্ষেপ না নিতে অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে সরকারকে বলেন আদালত।

সোয়া ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত প্রথম দফা এবং ২টা থেকে পৌনে ৫টা পর্যন্ত দ্বিতীয় দফা শুনানি হয়।

শুনানির পুরো সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন ড. ইউনূস।
‘অবসরের সীমা বাড়ালেও অনুমোদন নেওয়া হয়নি’

গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদ ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেও তাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

বৃহস্পতিবার মুহাম্মদ ইউনূসের রিটের শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, “১৯৯০ সালের ২৫ অগাস্ট এক চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক শর্ত সাপেক্ষে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ইউনুসের নিয়োগ অনুমোদন করে।

“শর্তটি ছিল রেগুলেশনে যে শর্তাবলী রয়েছে, তা বর্তমান শর্তবলীর অনুরূপ না হলে নতুন করে অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।”

গ্রামীণ বাংক অধ্যাদেশ অনুযায়ী ৬০ বছর বয়সের পরে অবসর গ্রহণের কথা উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “১৯৯৯ সালের ২০ জুলাই গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচলনা পরিষদের বৈঠকে এ বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়ে তার অবসরের সীমা বাড়ানো হলেও আর অনুমোদন নেওয়া হয়নি।”

তিনি জানান, ২০০১ সালের বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ব্যাংক পরিদর্শন প্রতিবেদনে’ এ বিষয়টি বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ড. ইউনূস এবং পরিচালক পদে মুহাম্মদ খালেদ শামস গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ অনুযায়ী অবসরের বয়সসীমা অতিক্রম করলেও তারা ওই পদে বহাল আছেন।

তিনি জানান, ১৯৯৯ সালের যে বৈঠকে ইউনূসের জন্য অবসরের বয়সসীমা শিথিল করা হয়েছিল, সেখানে তিনি [মুহাম্মদ ইউনূস] উপস্থিত ছিলেন। তার উপস্থিতিতে কিভাবে এরকম সিদ্ধান্ত হতে পারে।

“নেলসন ম্যান্ডেলাকে দ্বিতীয়বার নির্বাচন করতে বলার পর তিনি তা করেননি। সোনিয়া গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য জোরাজুরি করা হলেও তিনি ওই পদ গ্রহণ করেননি। ড. ইউনূস সেভাবে করতে পারতেন।”

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “পদ আঁকড়ে থাকায় মহত্ত্ব নেই। যথাসময়ে ছেড়ে দেওয়ার মধ্যেই মহত্ত্ব।”

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরবতা নিয়ে প্রশ্ন ড. কামালের
শুনানিতে মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষে ড. কামাল হোসেন এবং সরকার ও বাংলাদেশের ব্যাংকের পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম অংশ নেন।

কামাল হোসেন বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের দাবি অনুযায়ী ইউনূস ১০ বছর আগেই অবসরের বয়সসীমা অতিক্রম করেছেন। ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদে সরকারের প্রতিনিধি রয়েছেন। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি জানে।

“তাহলে এই ১০ বছর কি তারা ঘুমিয়ে ছিলেন?”

অব্যাহতির চিঠি মার্জিত হতে পারত- এ মন্তব্য করে কামাল হোসেন বলেন, “চিঠিতে বলা হয়েছে, আপনি গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নন।

“৩০ বছর ধরে যিনি এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন, তার ক্ষেত্রে এই ভাষা গ্রহণযোগ্য নয়।”

লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত দেশে একজন নাগরিককে এভাবে বিদায় করে দেওয়া যায় না- মন্তব্য করেন ড. কামাল।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে কারণ দর্শানো নোটিশ দিতে পারত।”

গ্রামীণ ব্যাংক একটি ইউনিক প্রতিষ্ঠান, এর পরিচালনা পরিষদে আছেন গ্রামের মেয়েরা- এ কথা উল্লেখ করে এ আইনজীবী বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি সাপেক্ষেই ১৯৯০ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ড. ই্উনুসের নিয়োগ হয়েছিল। ১৯৯৯ সালে তা বাড়ানো হয়েছে মাত্র। তাই নতুন অনুমোদন নেওয়া হয়নি।”

লাখো ঋণ গ্রহিতার নির্বাচিত পরিচালনা পরিষদ তাকে ওই পদে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল- জানিয়ে কামাল হোসেন বলেন, “তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বহাল আছেন ড. ইউনূস।”

তিনি প্রশ্ন করেন, ওই পদে নতুন নিয়োগের জন্য পত্রিকায় যদি বিজ্ঞাপন দিয়ে দেওয়া হয়, দেশে-বিদেশে ইউনূসের চেয়ে যোগ্য কাউকে পাওয়া যাবে?

“যাদের ব্যাংক, তারা ইউনুসকে রাখা প্রয়োজন মনে করছে। তাই ড. ইউনুসকে সরিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার বাংলাদেশের ব্যাংকের নেই।”

ড. ইউনূসের বয়স ৭০ হয়েছে। আমরা তো সবাই বিদায়ের পথে- এ মন্তব্য করে প্রবীণ এ আইনজীবী বলেন, “তবে এভাবে গলা ধাক্কা দিয়ে বিদায় কাম্য নয়।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এসএন/পিডি/২০১৫ ঘ.