ক্যাটেগরিঃ bdnews24

ঢাকা, মার্চ ১৬ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- কর্নেল তাহেরকে বিচারের নামে হত্যা করা হয়েছিল মন্তব্য করে ওই বিচারকে অসাংবিধানিক ও বেআইনি ঘোষণার পক্ষে মত দিয়েছেন দুই অ্যামিকাস কিউরি ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার এম আমীর-উল-ইসলাম।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু তাহেরের বিচারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের শুনানিতে বুধবার আদালতে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন তারা।

বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের বেঞ্চে এ শুনানি চলছে।
আদালতে ড. কামাল বলেন, “বিচারের নামে নাটক মঞ্চস্থ করে নিরপরাধ তাহেরকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
ওই বিচারে তাহেরকে সব বিচারিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কামাল বলেন, “তাহের অপরাধী হলে সাধারণ আদালতে তার বিচার হতে পারতো। কিন্তু তা না করে জেলখানার চারদিকে ট্যাংক, মেশিনগান তাক করে তার বিচার করা হয়েছে।”

তিনি বলেন, তাহেরের জীবন ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে ব্যবস্থা করতে হবে।

“ওই বিচারকে অসাংবিধানিক ও বেআইনী ঘোষণা করা হোক,” যোগ করেন তিনি।

ব্যারিস্টার এম আমীর-উল-ইসলাম বলেন, বিচারের মুখোশের আড়ালে এটি ছিলো একটি হত্যাকাণ্ড।
তিনি বলেন, “আমাদের সংবিধানের ২৯ ও ৩১ অনুচ্ছেদে জীবনের নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে। তাই আইনানুগ পন্থা ছাড়া কারো জান, মাল ও দেহের ক্ষতিসাধন করা যাবে না।

“তাহেরকে ফাঁসি দেওয়ার সময় ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১২১(ক) অনুচ্ছেদে মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিলো না। কিন্তু ওই বিধানেই তাকে ফঁাঁসানো হয়েছে। পরে ১৯৭৭ সালের জানুয়ারি মাসে ওই আইন সংশোধন করে মৃত্যুদণ্ড যোগ করা হয়।”

পরে করা আইনে পূর্ববর্তী দণ্ডের বৈধতা দেওয়া যায় না বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি।

আমীর-উল-ইসলাম বলেন, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে তা কার্যকর করার আগে হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে। পরে দণ্ডিত ব্যক্তির আপিল বিভাগে যাওয়ার অধিকার থাকে। এছাড়া রাষ্ট্রপতির কাছেও যাওয়ার সুযোগ থাকে।
তাহেরের বিচারে এর কোনটিই রক্ষা করা হয়নি বলে আদালতকে জানান এই আইনজীবী।

“ট্রাইব্যুনাল গঠন ও বিচারক নিয়োগেও রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নেওয়া হয়নি। বরং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিজেই এসব করেছিলেন।”

এই আদালতবন্ধু বলেন, “সুতরাং দেখা যায়, বেআইনী ও অসাংবিধানিক পন্থায় তাকে (কর্নেল তাহেরকে) হত্যা করা হয়েছে।”

এই রিট আবেদনের বিষয়ে মতামত দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য ড. কামাল ও আমিরুল ছাড়াও ড. এম জহির, ইফসুফ হোসেন হুমায়ুন, আক্তার ইমাম, এএফএম মেজবাউদ্দিন, আব্দুল মতিন খসরু, জেড আই খান পান্না ও জেড আই ফারুকীকে অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দিয়েছে আদালত।

১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান চলে। এরই এক পর্যায়ে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা নেওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এম এ তাহেরসহ ১৭ জনকে সামরিক আদালতে গোপন বিচারের মুখোমুখি করা হয়। ১৯৭৬ সালের ১৭ জুলাই রায়ের পর ২১ জুলাই ভোরে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

ওই বিচারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে কর্নেল তাহেরের ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. আনোয়ার হোসেন, তাহেরের স্ত্রী লুৎফা তাহের এবং সামরিক আদালতের বিচারে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ফ্লাইট সার্জেন্ট আবু ইউসুফ খানের স্ত্রী ফাতেমা ইউসুফ গত ২৩ অগাস্ট হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।

তাদের আবেদনের পর হাইকোর্ট সেই গোপন বিচারের নথি তলব করে। একইসঙ্গে তাহেরের বিচারের জন্য সামরিক আইনের মাধ্যমে জারি করা আদেশ এবং এর আওতায় গোপন বিচার ও ফাঁসি কার্যকর করাকে কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না- তা জানাতে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

পরে এই ঘটনায় দণ্ডপ্রাপ্ত আরো ছয়জন তাদের দণ্ড ও বিচারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে তিনটি রিট করেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এসএন/জেকে/১৮৪২ ঘ.