ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 
4

লিখছি, কেন লিখবো? লিখে কি হবে? আর লিখবো না। আর বলবো না কোন কথা। মুখবুজে থাকবো। কিন্তু পারি না। আমরা লিখছি, বিবেকের তাড়নায়, প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। আমার মত আরো কিছু মানুষ নিরন্তর লিখেই চলেছে। মাঝে মাঝে ভাবি লিখবো না, মনের বিরুদ্ধে জোর করে হাত গুটিয়ে বসে থাকি, কিন্তু বেশীক্ষন থাকতে পারি না। কখন যেন হাতে কলম উঠে আসে, বসে যাই লিখতে, প্রতিবাদ জানাতে, মানুষকে জাগাতে, মানুষের বিবেক কে নাড়া দিতে। কিন্তু আসলে কি যে উদ্দেশ্যে লিখছি তা কী সফল হচ্ছে? হচ্ছে না তো। আমাদের লেখা হয়তো অনেকে পড়ে, কিন্তু যাদের উদ্দেশ্যে লেখা তারা কি পড়ে? মনে হয় না। কিংবা পড়লেও, কেন লিখেছি সেটা তারা বোঝে? না বোঝার চেষ্টা করে? নাকি বুঝতে চায় না? ঘুমন্ত মানুষকে জাগানো যায়। জেগে ঘুমিয়ে থাকলে তাকে জাগানো যায় না। আমরা আজ জেগে ঘুমিয়ে আছি।

1

বর্তমানে দেশে যে সংকট চলছে,তাতে সবাই গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য এগিয়ে আসছেন। গণতন্ত্র-গণতন্ত্র বুলি আওড়িয়ে দিন যাচ্ছে তাদের। শাসক দল বলছে গণতন্ত্রের জন্য নাকি তাদের লড়াই অপরদিকে অন্যদল বিএনপি বলছে তারা ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করছে । তাহলে কী এক দেশে দুই গণতন্ত্র ?আসলে গণতন্ত্র কী? বা কেন গণতন্ত্র ।

গণতন্ত্র বা ডেমোক্রেসি শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ  (ডেমোক্রেসিয়া) থেকে, যার অর্থ “জনগণের শাসন  শব্দটির উৎপত্তি  (ডেমোস) “জনগণ” ও   (ক্রাটোস) “ক্ষমতা” থেকে। খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতকে এথেন্স ও অন্যান্য নগর রাষ্ট্রে বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বোঝাতে শব্দটির প্রথম ব্যবহার হয়।

গণতন্ত্র শব্দটির অর্থ “জনগণের শাসন”, কোন রাষ্ট্রের অথবা কোন সংগঠনের এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের নীতিনির্ধারণ বা প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সমান ভোট বা অধিকার আছে। যদিও গণতন্ত্র শব্দটি সাধারণভাবে একটি রাজনৈতিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয় তবে অন্যান্য সংস্থা বা সংগঠনের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য, যেমন বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রমিক ইউনিয়ন, রাষ্ট্রমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি।

বিখ্যাত গ্রীক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ভাষায়, সাধারণভাবে আমরা বলতে পারি, যে ব্যবস্থায় প্রত্যেকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়নি তা কুলীনতন্ত্র এবং যেখানে প্রত্যেকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে তা গণতন্ত্র। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম রাষ্ট্রপতি এবং রিপাবলিকান পার্টির প্রথম রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিঙ্কন তার দুমিনিটকাল স্থায়ী ১৮৬৩ সালের ১৯ নভেম্বরে প্রদত্ত গেটিসবার্গ বক্তৃতায় বলেন, জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা পরিচালিত সরকার এবং জনগণের স্বার্থে পরিচালিত সরকার পৃথিবী থেকে মুছে যাবে না।

এবার আমি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি গণতন্ত্রের আরো কিছু সংজ্ঞার প্রতি। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো গণতন্ত্রকেমূর্খের শাসন বলে চিহ্নিত করেছেন। তার মতে, যে কোনো সমাজে তাদের সংখ্যাই বেশি। আরেক গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতে, গণতন্ত্র নিম্নস্তরের শাসনব্যবস্থা। এমিল ফাগুয়ে গণতন্ত্রকে বলেছেন,অক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। আধুনিককালের ট্যালির্যান্ড গণতন্ত্রকে চিহ্নিত করেছেন মন্দ লোকদের সরকাররূপে।

আমাদের দেশে যারা নিজেদের গণতন্ত্রের চর্চাকারী বলে দাবী করেন, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, কোন ধরণের গণতন্ত্রের তারা চর্চা করেন, যে গণতন্ত্র জনগণের স্বার্থে পরিচালিত সে গণতন্ত্র, নাকি যে গণতন্ত্র মন্দ লোকদের সরকাররূপে পরিচিত, যেখানে অক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয় সে গণতন্ত্রের?

“Of the people ,By the People,For the people…”

কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যা চর্চা হচ্ছে তা কোনো-ভাবেই গণতন্ত্রের সাথে মিলে না।

গণতন্ত্র মানেই ৫বছর পর একবারের জন্য জনগণকে স্মরণ আর ক্ষমতায় আরোহণের পর জনগণের সরকারের পরিবর্তে দলীয় সরকারে পরিণত হওয়া। জনগণ যে গত সরকারের অপশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে সুন্দর স্বপ্নের জাল বুনে সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনার জন্য একটি দলকে ক্ষমতায় বসালো তা সেই দল বেমালুম ভুলে পরবর্তী ৫বছর নিজেরাই সেজে বসে অপশাসক। আর জনগণ তাদের অপশাসনে আশাহত হয়ে পরবর্তী নির্বাচনে আবার নির্বাচিত করে বিরোধীদলকে( বিএনপি )। এমন নয় যে বিরোধী দল বা বৃহৎ দল বিএনপি  চমৎকারভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেছে, গঠনমূলক সমালোচনায় সরকারকে ব্যতিব্যস্ত রেখেছে। কিন্তু তারপরও দিশেহারা জনগণ অনন্যোপায় হয়ে তাদেরই নির্বাচিত করছে।তবে এবার একটু ঘটনার ধরন আলাদা । এবার আর বিরোধী দল ছিল না নির্বাচনে ? আমার মতে সরকার ই বিরোধী দল আর বিরোধী দলই সরকার ।

2

গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতায় থাকার জন্য এখানে গুলি করে মারা হয় জনগণ, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তথাকথিত গণতান্ত্রিক অধিকার “হরতালএর নামে পুড়িয়ে মারা হয় জনগণ। বিরোধীদল (বিএনপি ) যুদ্ধ ঘোষণা সরকারের বিরুদ্ধে কিন্তু জান-মালের ক্ষতি হয় সাধারণ জনগণের। যাদের সংঘর্ষ সরকারের সাথে তারা কেনো সরকারী মন্ত্রণালয় ঘেরাও করছেন না, কেনো সচিবালয় ঘেরাও করছেন না!!! হরতাল আর অবরোধের নামে জিম্মি আজ জনগন । গণতন্ত্রের নামে জীবন্ত মানুষকে বোমা মেরে পুড়িয়ে মারা হয় ।একটি বোমায় নিভে যায় অনেকগুলো জীবন সাথে সাথে ভেঙ্গে যায় অনেকগুলো স্বপ্ন যে স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন হয়েই থেকে যায়। অকালেই চলে যায় কেউ কেউ না ফেরার দেশে আবার কেউ বা নামে মাত্র বেঁচে আছে এই দায় ভাঁড় কে নিবে ? যারা ক্ষমতায় আছে তারা না কী যারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যুদ্ধ ঘোষণা করেছে তারা ?

সমাজ, রাজনীতি, সর্বপোরী দেশ আজ বিপন্ন। পরিস্থিতি দিন দিন নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে। একদল মানুষ কাগজ কলম নিয়ে নিরন্তর লিখছে, একদল মানুষ টেলিভিশন, সেমিনারে বসে চিতকার করছে দেশকে বাচাঁও, রাজনীতিকে বাচাও, সমাজকে বাচাও। অন্য দিকে একদল মানুষ ক্ষমতার দম্ভে যা ইচ্ছা তাই করছে, আরেকদল ক্ষমতায় যাবার জন্য দেশও জনগনকে বলি দিচ্ছে, আর একদল হায়না, নরপশুরূপী মানুষ সেই সুযোগে দেশকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। আর সাধারন জনগন নীরবে বাধ্য হয়ে তা সহ্য করছে।

কিন্তু এভাবে কতদিন, আর কতদিন এভাবে নিরবে সহ্য করতে হবে ওদের অত্যাচার? জাগতে হবে, জাগাতে হবে সবাইকে। বাঁচাতে হবে দেশকে। এগিয়ে আসতে হবে, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে ওদের বিরুদ্ধে। প্রয়োজনে ওদের বিরুদ্ধে আবার নতুন করে স্বাধীকার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে আবার রক্ত দিতে হবে, তবুও দেশকে রক্ষা করতে হবে। দেশের মানুষকে রক্ষা করতে হবে। জাতিস্বত্তাকে সমুন্নত রাখতে হবে। প্রয়োজন একটি বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর, সৎ, প্রকৃত দেশত্ববোধে জাগ্রত বিবেকবান মানুষের। আছে কি কেউ? মুক্তির পথ দেখাবে আমাদের? কথা বলো, জেগে ওঠো, নেতৃত্ব দাও। আজ তোমাকে প্রয়োজন। কোথায় আছো তুমি, সাড়া দাও, মুক্ত করো আমাদের এই দেশদ্রোহী, ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদদের হাত থেকে। আমরা তোমার প্রতিক্ষায় দিন গুনছি।

প্রশ্নটা কাকে করছি? আমি আমার নিজেকে? নাকি আজ যারা নিজেদের স্বার্থের খাতিরে দেশকে নিয়ে জুয়া খেলছে তাদেরকে? নাকি সমস্ত জাতিকে? আসলে প্রশ্নটা বিবেকের কাছে। নিজের স্বত্তার কাছে। হয়তো ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে কেনা জাতিস্বত্তাটাকে ফিরে পেতে আরো কত রক্ত ঝরাতে হবে কে জানে? জ্বলছে মানুষ, জ্বলছে দেশ, পুড়ছে বিবেক, ছাই হয়ে যাচ্ছে জাতিস্বত্তা। অথচ ভ্রুক্ষেপ নেই কারো। মাঝে মাঝে মনে হয় এখনও বসে আছি কেন? নামছি না কেন পথে? লড়ছি না কেন ওদের বিরুদ্ধে, যারা দেশত্ববোধের মেকি চাদর গায়ে দিয়ে মিথ্যা বুলি আউড়ে দেশকে ধ্বংস করছে, ধ্বংস করছে অনেক কষ্টে, অনেক রক্তের বিনিময়ে কেনা জাতি স্বত্তাকে। সত্যি আমিও অপরাধী, আমার অপরাধ, আমি অপারগ। কেননা একদলের হাতে আছে শাসনযন্ত্র আর বৈধ অস্ত্রের সমারহে সরকারী গুন্ডা বাহিনী আর অন্য দলের হাতে আছে কিছু হায়না আর কিছু নরপশু।

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের জনগণ ভয়ের মধ্যে রয়েছে, যাকে কিছু মানুষ গণতন্ত্রের জন্য বাংলাদেশের মানুষের লড়াই হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যারা শুধু অহংবোধ ও ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য একটি যুদ্ধে লড়ছেন তারা কখনও এই কথিত গণতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ে অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জনগণের কাছে জানতে চাননি।

আমারা আশা রাখি গণতন্ত্রের স্বার্থে সব দল সংযত হবে এবং সুস্থ সমাধান বের করবে।