ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

১।
নারীর সম্ভ্রম! নারীর সম্ভ্রম! বলে আমরা চিৎকার করে গলা দিয়ে রক্ত ঝরিয়ে ফেলছি, সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে গণমাধ্যমের পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনে গণহারে সবাই লেখালেখি করছি, রিপোর্ট তৈরি করছি, রাতে থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত টক শো মুখর করে রাখছি। আদতে আমরা কি নারীর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করছি? আসলেই আমরা কি একজন নারীর ধর্ষণ ঠেকাতে অসামান্য কোনো ভূমিকা রেখেছি? প্রশ্নটা নিজের কাছে করলে এর সঠিক উত্তর পাওয়া যাবে। প্রথমেই ভাবী আমরা নিজেরা কতখানি নারীদের সম্মান দেখাচ্ছি তাহলেই এই উত্তর বের হয়ে যাবে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা সবাই কম বেশি অনেক কিছু দেখছি, অনেক কিছু করছি, অনেক কিছু সহ্য করছি। এই দেখা, করা বা সহ্য করার মধ্যে যদি একটু পরিবর্তন আনা যায় তবেই বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন সম্ভব। সকালে যে রিকশা করে আমরা ছুটে যাচ্ছি একই রিকশার জন্য আরেকজন নারী দাঁড়িয়ে আছেন তার কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য। যদি আমরা সেই নারীকে রিকশাটা আগে ছেড়ে দেই অথবা তার সাথে কথা বলে তাকে সহ বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যায়, তাহলে কেমন হয়?

women-empowerment-222

যে বাসে করে আমরা প্রতিদিন যাতায়াত করি সেই বাসের সংরক্ষিত নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী আসনগুলোতে কখনো আমরা নিজেরা বসে থাকি অথবা বাস কন্ডাক্টর বা হেলপাররা সেইসব সিটে ইচ্ছে করেই পুরুষ যাত্রী বসিয়ে দেয় যাতে করে সে একস্ট্রা কিছু টাকা আয় করতে পারে। পর্যাপ্ত নারী যাত্রী সবসময় উঠছে না দেখে বাস কন্ডাক্টর বা হেলপাররা তার সেই একস্ট্রা টাকা আয় করতে পারছে না। এইখানে সবচে বড় প্রতিরোধ ঘটানো দরকার ছিল এতদিনে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, প্রতিটি বাসে সংরক্ষিত নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী আসন আসলেই নারী, শিশু, প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ নয়। তা হল বাসের ছাড়পত্র পাওয়ার জন্যে দেখানো সাইনবোর্ড যে, এই বাসে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধীদের জন্য আসন বরাদ্দ আছে। যদিও সম্প্রতি বাসে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত আসনে কেউ বসলে বা তাদের বসতে দিলে এক মাসের কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানাসহ আরও কিছু বিধান যুক্ত করে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৭-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এই খসড়ার নীতি আইন হয়ে আসতে কতদিন লাগে তাই দেখার বিষয়।

তাছাড়া রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় মহিলা বাস সার্ভিস চালু থাকলেও তা এতোটাই অপ্রতুল যে, বলার অপেক্ষা রাখে না। বাসের সংরক্ষিত নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী আসনগুলো নিয়ে আমি অসংখ্যবার বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সাথে ঝগড়া পর্যন্ত করেছি কিন্তু আমার একার চিৎকারে ওইদিনের বাসের যাত্রী সহ বাস ড্রাইভার, কন্ডাক্টর বা হেলপাররা হয়তো সচেতন হয়েছে। এই সচেতনটা বার বার ধাক্কা দেয়ার মতো। পরের দিনই তারা তা ভুলে যায়। একইভাবে নারী যাত্রী তার কর্মক্ষেত্র থেকে বাসায় ফিরে আসার পথে তাকে ঠিকমতো বাসে উঠতে দেয়া, তার সংরক্ষিত আসনে তাকে বসতে দেয়াটা খুব জরুরী।

অনেকের মনে হতে পারে এই বিষয় নিয়ে এতো কথার কী আছে? বিষয়টা আসলে একজন নারীকে সম্মান দেখানোর। বাসে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধীদের জন্য আসন সংরক্ষিত মানে আমরা তাদের সম্মান দেখিয়ে ওই আসনে বসবো না। প্রয়োজনে কেউ অসম্মান দেখালে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবো। এই সম্মান দেখানোর প্রক্রিয়াটি শুরু করতে হবে পরিবার থেকে। যদি আপনার শিশু বাসায় দেখে, আপনি আপনার আশেপাশে থাকা নারীদের সম্মান দিচ্ছেন না তবে আপনার শিশু কখনোই অন্য নারীকে সম্মান দিবে না এবং সে নারীদের সাথে কটু আচরণ করবে এইটাই গবেষণার তথ্য।

যদি সরকার থেকে কঠোর আইন জারি করা হয় এবং সবসময় তা মনিটরিং করা হয় তবেই সবাই নারীদের সম্মান দেখাবে বিষয়টা কিন্তু তাও নয়। বিষয়টা হল সচেতনতার, মানবিক মূল্যবোধের, বাধ্য করার নয়। তবে আমার বিবেচনা বলে, এতো বছরেও যখন আমরা এই বিষয়ে সচেতনতা বা মূল্যবোধ গড়ে তুলতে পারিনি এখন বাধ্য করার উচিত।

২।

একজন নারীর অধিকার আছে স্বাধীনভাবে চলাচল করার। যেকোনো পরিবেশে, যেকোনো পোশাকে ঘোরাফেরা করার। এইটা একজন পুরুষের যেমন অধিকার তেমনি একজন নারীরও। একজন নারী তার প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে রাতবিরাতে বাসায় ফিরতেই পারে। এ জন্যে কোনো পুরুষকে কেউ অধিকার দেয়নি, নারীর এতোরাতে ফেরা নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করার। কেউ নয়। কিন্তু প্রায়শই দেখা যায় বাসে বসে বিভিন্ন বয়সের পুরুষেরা নারীর এতোরাতে বাসায় ফেরা নিয়ে মন্তব্য করেই যাচ্ছে। এইটা কেন? একইবাসে নারীর সাথে অন্য অনেক পুরুষও বাসায় ফিরছে, কই নারীকে বলতে দেখা যায় না, এতোরাতে পুরুষরা কেন বাসায় ফিরছে? সমাজটা পুরুষশাসিত দেখে? তা নয়, বিষয়টা আসলে দৃষ্টিভঙ্গির।

প্রতিদিন, প্রতিসপ্তাহে, প্রতিমাসে, প্রতি বছরে নারী অথবা শিশুর ধর্ষণের, সম্ভ্রম হারানোর খবর কোথাও না কোথাও পাওয়া যাবেই, তা পত্র-পত্রিকা হোক বা টেলিভিশন। আমাদের এই সুন্দর দেশটাকে স্বাধীন করতে ত্রিশ লাখ মা, বোনের সম্ভ্রম বিসর্জন দিতে হয়েছে। সেই সময় পাকিস্তানি সেনা বা এদেশীয় রাজাকাররা নারীর সম্ভ্রম ছিনিয়ে নিয়েছে। আর এখন?

দেশ স্বাধীনের এতো বছর হয়ে যাওয়ার পরও কেন পত্রিকার পাতা বা টেলিভিশন খুললে নারী বা শিশু ধর্ষণের খবর চোখে পড়বে? কেন আমরা একজন নারীকে তার সম্ভ্রমের নিরাপত্তা দিতে পারছি না? কেন পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার ফাতিমা আক্তার ইতি, ফরিদপুরের জাকিয়া আক্তার চম্পা, দিনাজপুরের ইয়াসমিন বা সোহাগী জাহান তনুদের ধর্ষণের কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি হয় না? কেন ধর্ষিতার বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদে মরে? কেন?

৩।

সাল ২০১২। তারিখ ১৬ ডিসেম্বর, রাত। স্থান দিল্লি। ওই রাতে সিনেমা দেখে বন্ধুর সঙ্গে ফেরার সময় চলন্ত বাসে ধর্ষণের শিকার হন ২৩ বছর বয়সী ফিজিওথেরাপির এক ছাত্রী। ছয় পাষণ্ড ধর্ষণের আগে ওই ছাত্রীর বন্ধুকে পিটিয়ে হাত-পা বেঁধে বাস থেকে ফেলে দেয়। এর দুই সপ্তাহ পর মারাত্মক আহত ওই ছাত্রী সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। ওই ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক ক্ষোভ, ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ছাত্র-জনতা আন্দোলন শুরু করে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম মেয়েরটি নাম দেয় ‘নির্ভয়া’। দীর্ঘ সময় পর অবশেষে সুপ্রিম কোর্ট ছয় জনের মধ্যে চার আসামির সাজা মৃত্যুদণ্ড দেয়। এই একটি ঘটনা যেমন ভারতকে নারী বা শিশু ধর্ষণের ব্যাপারে সর্তক করে তোলে, তেমনি গোটা বিশ্বের কাছে তা আদর্শ হয়ে দাঁড়ায়।

এমন একটি আদর্শের জায়গায় আমাদের দেশও থাকতে পারতো, একজন ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি দিলে দেশে ভয়ানক আকারে ধর্ষণ তথা নারীর সম্ভ্রমহানির ঘটনা কমে যেত। কিন্তু ওই জায়গায় আমরা পৌঁছাতেই পারিনি।

প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি, নামীদামী তারকা থেকে শুরু করে বাস চালক, হেলপার পর্যন্ত ধর্ষকের তালিকায় নিজেদের নাম উঠিয়েছে, কিন্তু বিচার হয়েছে ক’জনের। ধর্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষিত পরিবার থানায় অভিযোগ করতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছে। বেশিরভাগ সময় আসামি খালাস পেয়ে ধর্ষিত পরিবারের বিরুদ্ধের ভয়ানক ব্যবস্থাও নিয়েছে। এ হচ্ছে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ১০৫০ জন নারী ও কন্যা শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এরমধ্যে ক’টি ধর্ষণের বিচার হয়েছে তা আমাদের সবারই জানা। ৪ বছরের কন্যা শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক বিধবা নারী পর্যন্ত কেউই ধর্ষকদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড আর ধর্ষণের কারণে মৃত্যু ঘটলে তাতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।

আইনের যথোপযুক্ত প্রয়োগ ঘটলে আজকের নারী ধর্ষণের হার কমে আসতো। আজকে বনানীতে দুই শিক্ষার্থীর ধর্ষিত হতে হত না। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে কঠিন শাস্তি দেয়ার বিধান থাকলে ধর্ষকদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হত।

৪।

একশ্রেণির সম্প্রদায় বা গোষ্ঠী সব সময় নারীর উন্নয়ন ঠেকানোর জন্যে বিভিন্ন অপকৌশল হাতে নিয়েছে। কখনো অসাম্প্রদায়িক উৎসব ‘পহেলা বৈশাখে’ নারী সম্ভ্রমহানীর ঘটনা ঘটানো, কখনো ‘হোলি উৎসবে’ নারী শ্লীলতাহানীর ঘটনা ঘটানো, কখনোবা নারীদের বিরুদ্ধে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ফতোয়া দেয়া সহ বিভিন্ন ধরণের অপকর্মে লিপ্ত ছিল এই সম্প্রদায় বা গোষ্ঠী। এরাই নারীকে বাইরে বের হতে দিতে চাই না, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণকে মেনে নিতে পারেনা, পঞ্চম শ্রেণির পর নারীর পড়াশোনার প্রয়োজন নেই বলে সহাস্যে বলে বেড়ায়, রাতবিরাতে কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরে যাওয়া নারীদের এরাই বিচারের মানদণ্ডে ফেলে মুখের কটুক্তি দিয়ে বিচার করে, নারীর পোশাক-আষাকে বাধ্যবাধকতার মানদণ্ড নির্ধারণ করে, নারীর উচিত অনুচিত এরাই নির্ধারণ করে। এদের ছত্রছায়া মাঝখানে কমে গেলেও এখন তা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এরা কখনোই নারীর সামাজিক অবদান, অর্থনৈতিক অবদান, রাজনৈতিক অবদানকে স্বীকার করতে পারছে না। এরা সবসময় হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে। এই শ্রেণি বা গোষ্ঠী বিভিন্ন ফতোয়া জারি করে নারীদের তাদের পদতলে ফেলার চেষ্টা সবসময় করে যাচ্ছে এবং সবচে ভয়ানক হচ্ছে তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে জনমত গড়ে তোলা। তাতে করে তরুণদের মধ্যে ভুল ব্যাখ্যা বা ভুল জিনিস ঠাঁই নিচ্ছে। প্রতিনিয়ত নৈতিক অবক্ষয় বাড়ছে, নারীর সম্ভ্রমহানি ঘটছে তথাপি নারীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে।

এই কালো গহব্বর থেকে আমাদের সবারই বের হয়ে আসতেই হবে। প্রয়োজন প্রতিরোধ গড়ে তোলা, সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা, মানবিক মূল্যবোধের উন্নয়ন, নারীর অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসা তথা নারীর প্রাপ্য সম্মান পাওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করা। তার জন্যে ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নারীদের সম্মান প্রদর্শন ও নিরাপত্তার বিষয়ের বিভিন্ন কর্মসূচী চালু রাখতে হবে, প্রয়োজনে নারী অথবা শিশু ধর্ষণে কঠোর শাস্তি দিতে হবে এবং সবচে বেশি জরুরী পরিবার থেকে নারীর সম্মান প্রদর্শন করার বিষয়টি নিশ্চিত করা, তবেই এই অন্ধকার কেটে যাবে।

 

***

বিনয় দত্ত
লেখক, নাট্যকার ও গণমাধ্যমকর্মী