ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

পারভীনের ছেলেটা মাত্র দেড় হাজার টাকার জন্য মারা গেল। তিন-তিনটা সরকারি মেডিকেল হাসপাতাল পারভীনের নবাগত সন্তানের দায়িত্ব নিতে পারল না। সত্যি সেলুকাস। স্বাস্থ্য খাতে এত উন্নয়নের গল্প, এত ডামাডোল পেটানোর শব্দ, কোথায় যায় সেসব শব্দ। হয়তো শব্দের উচ্চকিত দূষণে সেই উন্নয়নের গল্পও হারিয়ে যায়।

পাঁচ বছর ধরে চলমান শুদ্ধ সংগীত উত্সবের প্রাণের মেলা বেঙ্গল উচ্চাঙ্গ সংগীত উত্সবে স্থান পাওয়া নিয়ে বেশ বড়সড় একটা ঘটনাই ঘটে গেল। প্রথমে নিরাপত্তাসংক্রান্ত কারণ দেখিয়ে তাদের স্থান বরাদ্দ পাওয়া নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। এখন তা সমাধাও হয়েছে।

আমি ভাবছি অন্য কিছু। বিভিন্ন দেশের এসব গুণী সংগীতজ্ঞ কী ভেবেছেন আমাদের দেশ সম্পর্কে? বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক থেকে শুরু করে দেশের অগণিত সংগীতপ্রেমী মানুষ কী ভেবেছিল এ সংবাদ শুনে? এ সংবাদ সারা বিশ্বে প্রচার হওয়ার পরে বিশ্বের অন্য দেশগুলো ভেবেছে বর্তমানে বাংলাদেশের পরিস্থিতি হয়তো খুবই খারাপ। এখন সাময়িকভাবে আমাদের পরিস্থিত হয়তো শিথিল হয়েছে কিন্তু আমাদের দেশ নিশ্চয় নিরাপদ নয়। আমরা নিশ্চয় বড় ধরনের হুমকির মুখে আছি। আমাদের দেশকে নিশ্চয় সিরিয়া, ইসরায়েল বা ফিলিস্তিনির মতো ভেবেছে বিভিন্ন দেশের মানুষ, যেসব দেশে প্রতিনিয়ত যুদ্ধবিগ্রহ লেগে থাকে। এতে কি আমাদের ভাবমূর্তি খুব উজ্জ্বল হয়েছে? যে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য দেশের সরকারপ্রধান দিনরাত এক করে ছুটে বেড়াচ্ছেন, সেই ভাবমূর্তি নিমেষেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। দেখবে কে সেই ভাবমূর্তি?

আচ্ছা, পণ্ডিত বারীণ মজুমদার এ দেশের শাস্ত্রীয় সংগীতে কী অবদান রেখেছিলেন, তা কি কেউ জানে? ওস্তাদ মুনশি রইস উদ্দিন, ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম, ওস্তাদ আলি আকবর খান এদের সম্পর্কে কতজন ভালোভাবে জানে? আমার ধারণা, হাতে গোনা অল্প কয়েকজন ছাড়া বাকি কেউই এদের সম্পর্কে ভালো জানে না। তার কারণ অবশ্য বিশদ। গুণীরা কদর না পেতে পেতে আড়ালেই চলে গেছেন আর নতুন করে গুণীদের জন্মও সেভাবে হচ্ছে না। গুণীদের কদর দেয়ার ব্যাপারে আমাদের পাশের দেশ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যদি আমরা তাদের কাছ থেকে কিছু শিখতে পারি, তবে আমাদেরই মঙ্গল।

বনানীর দুই ছাত্রী ধর্ষণের মামলার মূল আসামি আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদের আদৌ বিচার হবে কিনা, কেউই জানে না। এ দেশে ধর্ষণের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয়েছে— এমনটা পাওয়া খুবই বিরল। ধর্ষণের বিচার না হতে হতে এ দেশের গণমাধ্যমও ধর্ষণের খবর ছাপাতে বিরক্ত। সবাই জানে, এসব ধর্ষণকারীর বিচার হবে না। কয়েক বছর এ নিয়ে মাতামাতি হবে। এরপর সবাই তা ভুলে যাবে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের জরিপ বলছে, ২০১৬ সালে বিভিন্ন বয়সের ১ হাজার ৫০ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ঠাণ্ডা মাথায় একটু ভাবেন— সংখ্যাটা কত বড়? ১ হাজার ৫০। এ ১ হাজার ৫০ জনকে এক জায়গায় জড়ো করে দেখেন, তাহলে বোঝা যাবে সংখ্যাটা আসলেই কত বিশাল। এত নারীকে গত এক বছরে ধর্ষণ করা হয়েছে! অথচ আমাদের নারী অগ্রগতি নাকি দেখার মতো। এ দেশের নারী উন্নয়ন নাকি বলে বেড়ানোর মতো।

কোমলমতি শিশু-কিশোরদের পাঠ্যবইয়ে প্রগতিশীল ও হিন্দু ধর্মাবলম্বী লেখকদের লেখা তুলে ফেলা হয়েছে হেফাজত নামের একটি সংগঠনের দাবিতে। কোমলমতি শিশু-কিশোররা কোন লেখা পড়বে আর কোনটা পড়বে না, তা কি আসলেই হেফাজত নামের সংগঠনটি বলে দেবে? আর জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড তা মুখ বুজে মেনে নেবে? বিষয়টি আমার ভাবতে যথেষ্ট সময় লেগেছে। এখনকার শিশু-কিশোররা অত্যন্ত মেধাবী, তাদের এড়িয়ে চলার কোনো সুযোগ নেই। তাদের শিশুমনে এক ধরনের বাজে ছাপ পড়বে। তারা ভাববে যারা প্রগতিশীলতার কথা বলে তারা নিশ্চয়ই খারাপ। হিন্দু ধর্মাবলম্বী লেখকরা নিশ্চয় খারাপ, না-হয় তাদের লেখা পাঠ্যবই থেকে মুছে ফেলবে কেন? এটা যে কত বড় একটি অপরাধ, এতে যে আমরা কত বছর পিছিয়ে গেলাম, তা প্রশাসন বুঝতে পারছে না। যখন বুঝতে পারবে তখন আর এর প্রতিষেধক থাকবে না।

নেত্রকোনার কেন্দুয়া পৌর শহরের শান্তিনগর এলাকায় প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় এক কলেজছাত্রীকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করেছে ইমন। ইমন নিশ্চয় স্থানীয় প্রভাবশালীর ছেলে। হয়তো তার কোনো বিচার হবে না এবং সে মুক্তিও পেয়ে যাবে। আরো শত শত ইমন এভাবে মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্কুল-কলেজপড়ুয়া মেয়েদের বখাটে ছেলেদের উত্পাতের খবর শোনা যায়। তাদের গায়ে পর্যন্ত হাত তুলতে দেখা যায়। যদি সেই ছেলেদের বিচার হতো তাহলে উত্ত্যক্ত করার ঘটনা অনেকাংশে কমে যেত। এখন আশা, যদি বিচার হয়।

নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী তারিক সালমান একটি কোমলমতি শিশুকে দিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি আঁকানোয় তাকে ভয়ানক হেনস্তার শিকার হতে হয়েছিল। এ বিষয়ে আর না-ই বলি। একটি দলে একনিষ্ঠ নেতাকর্মী থাকবে— এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু দল বিবেকহীন চাটুকারে ভরে যাবে— এটা কি কাম্য? দেশের জনগণ সেই জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে কী আশা করবে?

মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে জকিগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদ কলাছড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন অসুস্থ স্কুলশিক্ষিকার ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিয়ে তাকে হেনস্তা করেন। ধরে নিলাম সেই স্কুলশিক্ষিকা গুরুতর অপরাধ করেছেন। তাকে স্কুল কমিটির মিটিংয়ে ডেকে শুধরে নেয়ার কথা বলা যেত। অথবা স্কুল কমিটিকে জানিয়ে দিলে তারা স্কুলশিক্ষিকার বিরুদ্ধে কোনো না কোনো ব্যবস্থা নিত। কিন্তু তা হয়নি। এমন কিছু হয়েছে, যাতে শিক্ষিকা ছাত্রছাত্রীদের কাছে অপমানিত হলেন, পুরো জাতির কাছে অপমানিত হলেন। শ্যামল কান্তি ভক্তের কথা আর না-ই বললাম।

একজন শিক্ষক-শিক্ষিকা একটি জাতির ভবিষ্যত্ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সেই শিক্ষক-শিক্ষিকাকে যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি দিয়ে অপমানিত করা হয়, তখন তার কেমন লাগে? সেই স্কুলশিক্ষক-শিক্ষিকাদের আদর্শে নিশ্চয় কিছু ছাত্রছাত্রী অনুপ্রাণিত হয়েছে, তাদেরইবা কেমন লাগে?

পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যখন সমালোচনার ঝড় ওঠে, তখন উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদ বলেন, ‘আমি তো তার বেডরুমে গিয়ে এই ছবি তুলি নাই।’ যে উপজেলার চেয়ারম্যান এ ধরনের কথা বলেন, তার কাছ থেকে কী আশা করা যায়? একজন নারী শিক্ষিকার বেডরুমে ঢুকে ছবি তোলা— এ কথাটা যে কতটা কদর্যপূর্ণ, কতটা অভব্য, তা বোঝার ক্ষমতা উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদের নেই এবং হবেও না।

আচ্ছা, চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদকে কি কোনো শিক্ষক-শিক্ষিকা পড়াননি? নাকি তিনি এমনিতেই এ অবস্থায় চলে এসেছেন? যদি কোনো একজন শিক্ষক-শিক্ষিকার মানসম্মানের কথাও চিন্তা করতেন, তবে উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদ এ ধরনের কাজ কখনই করতে পারতেন না।

এ রকম আরো কত শত ঘটনা যে প্রতিদিন ঘটছে, তা আমাদের সবারই অজানা।

২. সত্যজিত্ রায়ের পূর্বপুরুষদের ভিটেবাড়ি ছিল বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া গ্রামে। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের আদিনিবাস ছিল বাংলাদেশের মানিকগঞ্জে। ব্রিটিশ কোরিওগ্রাফার আকরাম হুসেইন খানের বাবার আদিনিবাস ছিল বাংলাদেশে। সুচিত্রা সেনের পৈতৃক নিবাস ছিল সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার অন্তর্গত ভাঙ্গাবাড়ী গ্রামে। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ কিক বক্সার রুকসানা বেগমের পৈতৃক নিবাস ছিল বাংলাদেশে। জ্যোতি বসুর পৈতৃক নিবাস ছিল বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার বারদী গ্রামে। ব্রিটিশ লেবার পার্টির রাজনীতিবিদ রুশনারা আলীর পৈতৃক নিবাস এ বাংলাদেশে। এ রকম তালিকা করলে অসংখ্য নামিদামি গুণীজন পাওয়া যাবে, যাদের পৈতৃক নিবাস ছিল এ দেশে এবং আমরা তাদের রাখতে পারিনি।

এ বছরই ‘লিংকন ইন দ্য বারদো’ উপন্যাসের জন্য ম্যান বুকার পুরস্কার পেলেন মার্কিন লেখক জর্জ স্যানডারস। এ বছর সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন জাপানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক কাজুও ইশিগুরো। ‘দ্য রিমেইন্স অব দি ডে’ উপন্যাসটির জন্য তিনি ম্যান বুকার পুরস্কার পেয়েছিলেন। আচ্ছা, আমাদের দেশের সাহিত্যিকরা কখনো এ ধরনের সম্মান কি পাবেন না?

আমি আশা করি পাবেন। যদি শিল্পী, সাহিত্যিকদের যথাযথ সম্মান দেয়া হয় এবং তাদের সৃষ্টিশীল কাজের জন্য সর্বোপরি সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়।

৩. ঢাকার দেয়ালে সম্প্রতি সুবোধকে নিয়ে দেয়ালিকা বা গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পর্যন্ত সরব রয়েছে। কিছু প্রচার মাধ্যমের তথ্য বলছে, সেই সুবোধ বা গ্রাফিকস শিল্পীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ নিয়ে খুব আলোচনা- সমালোচনাও হয়েছে। কে এই সুবোধ? সুবোধের কী ধর্ম? কেন এ ধরনের দেয়ালিকা বা গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে? এ কৌতূহল সবার মধ্যেই তীব্র আকারে কাজ করছে।

সুবোধ আসলে কোনো নাম নয়, কোনো চরিত্রও নয়। মানুষের ভেতরকার সু-বোধ বা সুন্দর বোধের জাগরণ হলো সুবোধ। যান্ত্রিক শহরে, অসঙ্গতিপূর্ণ এ দেশে সুন্দর বোধ বিনাশ হয়ে যাওয়ার ভয়কে জাগরিত করার বোধ হলো সুবোধ। সুবোধ একটা প্রতীক। সুবোধ একটা ধারণা, সুবোধ একটা সুন্দর চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। সুবোধের কোনো ধর্ম নেই। সুবোধ এ শহরে, এ দেশে থাকতে চায়। তাকে গুটিকয়েক লোকই থাকতে দিচ্ছে না। আমার বিশ্বাস, সুবোধ পালিয়ে যাবে না। এটা সুবোধদেরই দেশ, সুবোধ এ শহরে, এ দেশে থাকবেই।

 

 

পূর্ব প্রকাশিত: দৈনিক বণিক বার্তা, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৭