ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

ফার্মগেট হতে কালশি যাব জন্য বাসে উঠলাম | মিরপুর ১০-১১-১২ তে যায় এমন একটা বাস |কালশিতে এক শ্রদ্ধ্য়ে বড় ভাই থাকেন, আমি যখন ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট ইয়ারে তখন তিনি পিএইচডি করতেছিলেন | আমি উনার পাশের রুমেই উঠি এবং একজন অসাধারণ অভিভাবক পাই | নীতি নিষ্ঠাবান একজন ধার্মিক লোক |তাই এখনো সুযোগ পেলে উনার সাথে কিছু সময় কাটাই|  তো সেদিনও যাচ্ছিলাম বড় ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য | এখনো কোনো পরামর্শের জন্য হোক কিংবা দেখা করার জন্য হোক, সোহরাব ভাইয়ের সাথে মাঝে মধ্যেই দেখা করি | বড় ভালো মনের একজন লোক |

তখন বেলা ১১.৩০ টার মত হবে |তাই লোকাল বাস হলেও তেমন ভিড় ছিল না |সবাই বসাই ছিলাম আর রাস্তাও ছিল ফাঁকা|আমার পাশে ছিল ১৭/১৮ বছরের একটা ছেলে | আমি ভাবুক লোক | কথা না বলে কি যেন একমনে ভাবছিলাম | গাড়ি খুব দ্রুতই চলছিল |হঠাতই শেওড়াপাড়ার একটু আগে বাসটা থেমে গেল | সবাই তো বলে উঠলো কি হলো ?কিছুনা,ঠিক মাঝ রাস্তায় একটা প্রাইভেট কার দাঁড় করানো |কি হইছে কে জানে !আমাদের বাসের ড্রাইভার সাহেব জানালা দিয়ে মুখটা বের করে বললেন যে,কি হইছে ভাই ?গাড়ি রাখার আর জায়গা পাইলেননা ?মাঝ রাস্তায় কেউ গাড়ি রাখে? সাইড করেন |
না, আমাদের গাড়ির ড্রাইভার সাহেব এর চেয়ে বেশি কিছুই বলেন নাই| কারণ,আমার স্পষ্ট মনে আছে এই জন্য যে,আমাদের নজর তখন ড্রাইভার-এর দিকেই ছিল | আমরা ভাবছিলাম হয়ত এক্সিডেন্ট হইছে আর ড্রাইভার কি বলছে তা শুনতেছিলাম এই জন্যই | ড্রাইভার এর কথায় না কোনো গালি গালাজ ছিল,আর না হলো উচ্ছৃংখল ভাব ছিল |কিন্তু হঠাতই দেখলাম একজন লোক দৌড়ায়ে বাসের মধ্যে উঠে এল এবং সরাসরি ড্রাইভার এর কাছে গিয়ে তাকে বেধড়ক চড় শুরু করলো !!আমরা কিছু বুঝে উঠার আগেই বেশ ক’টা চড় পরে গেল ড্রাইভার ভাইয়ের গালে,মুখে,ঘাড়ে |বাসের সবাই তো চেঁচিয়ে উঠলো,আর ড্রাইভার ভাই শুধু বলতেছিলেন আরে আমারে মারতেছেন কেন্ ?বাস কিন্তু চলছে আর ঐ রাবিশটা বাসের মধ্যে |হেলপার ছেলেটা বলতেছিল,খবরদার ওস্তাদের গায়ে হাত তুলিস না কিন্তু |কন্ডাকটর পিছনে ছিল,ভাড়া কাটতেছিল |সে দৌড়ায়ে এসে বলদটাকে ধরে টানতে টানতে পিছনে নিয়ে গেল,আর হেল্পার ছেলেটা দিল বাসের দরজা বন্ধ করে |ছাগলটা শুধু চিত্কার করতেছে যে,ছেড়ে দে,ভালো হবে না কইলাম |সব কয়টা রে দেখে ছাড়বো,আমারে চিনিস ?কন্ডাকটর ছেলেটা এক দারুন উত্তর দিল |চিনিতো,তুই একটা বেয়াবদ | তুই যা পারিস করিস | আগে বল, উস্তাদের গায়ে হাত তুললি কেন ?আমার পাশের ছেলেটা বলতেছিল,ভাই চলেন সাইজ করি | আমি বললাম,তুমি ধরো,আমি ফিনিশিং দিচ্ছি|আমার গায়ে সুন্নাতি পোশাক তো,আমি আগে ধরলে সবাই হুজুরদেরকে গালি দিবে |জানি বাকিরা সবাই মৌন সম্মতি দিচ্ছিলো,কিন্তু কেউ আর মারতে আসতেছিলনা |আমারও ভিতরটা জ্বলে যাচ্ছিল রাম ছাগলটাকে মারার জন্য |অন্যায় ভাবে কেন ড্রাইভারকে মারবে ?আমাদের আর মারতে হলো না,একটা মোটা বেত বের করে বাড়ি শুরু করলো কন্ডাকটর ছেলেটা |আমরা বেজায় খুশি | কেউ ঠেকাচ্ছিনা |অনেকেই বলতেছিল,মার,ভালো করে মার |ইতোমধ্যে,হেল্পার ছেলেটা দেখলাম ফোন করতেছে যে,তোরা তাড়াতাড়ি ১০ নম্বর আয় | এক হারামজাদা উস্তাদ রে মারছে |

একটা কথা বলা হয়নাই, হেল্পার আর কন্ডাকটর দুজনেরই বয়স ২০/২২ আর ড্রাইভার এর বয়স প্রায় ৪২/৪৫ হবে | ড্রাইভার তার সিট্ হতে বারবার বলতেছিল যে, এ মারিস না,রাখ, মারিস না| কিন্তু বেতের বেধরক বাড়ি চলছে আর ছেলেটা বলছে যে, তোর্ কত সাহস তুই উস্তাদের গায়ে হাত দিলি?
সেনপাড়া পর্বতার কাছে যেতেই দেখালাম যে,হেল্পার ছেলেটা গেট খুলে দিল আর ৪/৫ জন যুবক ছেলে উঠে এল বাসে | বাস কিন্তু চলছে আস্তে আস্তে |সামনে হালকা জ্যাম | এবার ড্রাইভার খুব জোরে করে বললেন,মারিস না কইলাম |এ তুই স্টিয়ারিং ধর |হেল্পার ছেলেটা গিয়ে বসলো ড্রাইভার এর সিটে |বাসের মাঝখানে,ঠিক আমার ডান পাশে চলছিল ঘটনা | লোকটা মাঝে আর ছেলেরা ওর সামনে আর পিছনে |ড্রাইভার ভাই দৌড়ায়ে এসে লোকটাকে টেনে সামনে নিয়ে গেলেন |আর ছেলেগুলোকে ঠেলতে ঠেলতে পিছনে দিলেন |

আমরা পুরা বাসের লোকগুলো যেন নাটক বা সিনেমার শুটিং দেখতেছিলাম |কেউ কোনো কিছুই বলতেছিলাম না |কেনই বা বলবো?সিনেমার শেষে ভিলেনের মার খাওয়াতে কে না খুশি হয়?কেউ তো একবারও ভুল করে একথা বলেনা যে,থাক,আর মারবেন না |এ যেন চোখের সামনে তেমনি এক বিরল ঘটনা !তবে সিনেমার আর একটা অবিকল দৃশ্য এখানেও ঘটতেছিল |যে লোক এত পারে,যার এত ক্ষমতা,যার দুইটা নায্য কথাও গায়ে সয়না,সেই লোক বারবার মাফ চাচ্ছিল আর বলতেছিল যে,আমার ভুল হইছে,আর কোনো দিন এমন করবোনা |আমাকে ছেড়ে দেন |বাহ!তুইতোকারি এবার ভদ্রতায় রূপ নিলো |কি চমত্কার !!ঠেলার নাম বাবাজি !আর কন্ডাকটর বলতেছিল,তুই না এত পারিস ?কি চমত্কার এক পরিণতি !ভাষার ব্যবহার হচ্ছে ঠিকই|কিন্তু পক্ষ পাল্টে গেছে |আর সমস্ত যাত্রীই যেন খুব খুশি |কেউ কোনো প্রতিবাদ তো দুরের কথা,সম্মতি দিচ্ছিল মৌনতায়,এমনকি সরব ভাবেও ছেলেদের সাথে কন্ঠ মিলিয়ে,এখন মাফ চাস কেন,তুই না এত পারিস?
ঘটনাটা এমন হতে পারতো যে, লোকটাকে ভাব মত পাওনাটা দিয়ে ১০ নম্বরে নামিয়ে দিল |কিন্তু তা হয় নাই |আর তা হলে আমি আজ এই লিখাটা অবশ্যই লিখতাম না |ভালো মানুষ যে আজও দুনিয়ার বুকে আছে, ধৈর্য্য যে মহান এক গুণ,মানুষ অন্তরে প্রবেশ করার জন্য যে তার ভালো ব্যবহারটুকুই আসল,মানুষ আজও যে অন্যায় কে মেনে নিতে পারে না,প্রতিবাদ না করলেও যখন প্রতিরোধ গড়ে ওঠে তখন তাকেই সমর্থন দেয় আর ভাবে যে এই ক্ষণের বা দিনের অপেক্ষাই ছিলাম, এমন অসংখ্য শিক্ষা এই এক ঘটনা থেকেই উপলব্ধি করলাম |

সামনের আড়াআড়ি মহিলা সিট্ গুলোর উপর ড্রাইভার ভাই বসলেন,আর তার সামনে বসে পা ধরে আছে ঐ সেই পারু খা !!যে কিনা এত পারে ,আর সে এখন পা ধরে বসে আছে সিনেমার শেষ দৃশ্যের জন্য! দেখতে ভালই লাগছিল | হ্যা, এই সেই দৃশ্য যা দেখে ভাবতেছিলাম যে, অত্যাচারীর সময় একদিন ফুরায় |আর তার অহমিকাগুলো তার অপমান হয়ে গলায় ঝুলে |তাই আজকের ক্ষমতার অপব্যবহার,আজকের এই বাহাদুরি,আজকের এই মিথ্যাচার, আজকের এই সেচ্ছাচারিতা কাল গলার কাটা হবেই হবে |তাই সময় থাকতেই সংশোধন ভালো |

ছেলেরা তো মারবেই | বলছে, উস্তাদ ছেড়ে দেন | আপনারে মারলো কেন্? উস্তাদের কথায় প্রমান করলো সে একজন সত্যিকারের উস্তাদ |আমাদের চোখে পানি | বললেন,তোরা মেরে কি করবি? ও যদি ভালো না হয়,তাইলে মেরে কি?বড়জোর হাসপাতালে পাঠাবি ?তার চেয়ে ছেড়ে দে,ও ভালো হয়ে যাক | কি আর এমন ব্যবহার করবেন? খুব তো পারেন !ছেড়ে দেই ওদের হাতে? লোকটা এবার অঝরে কাঁদছে,আমাদেরও অনেকের চোখে পানি |ড্রাইভার ভাইয়ের পা দুটি আরো জোরে জড়িয়ে ধরলেন |বলতে লাগলেন,উস্তাদ আমারে মাফ করে দেন,আমার ভুল হইছে |আমি কোনো দিন আর এমন করবনা |আমি আপনাকে চিনতে পারি নাই |গেট খুলে নামিয়ে দিলেন ১০ নম্বরে জ্যাম কবলিত গাড়ি হতে |লোকটা নিমিষেই হারিয়ে গেলেন আর ড্রাইভার ভাই তাঁর সাগরেদদের বললেন, ছেড়ে দিয়ে ভালো হলো, বুঝলি | মারলে কি হতো? বড় জোর হাসপাতালে পাঠাতে পারতি | কিন্তু তাতে তো ও ভালো হত না |ছেড়ে দিলাম,মানুষের বাচ্চা হলে আর এমন করবেনা,ভালো হয়ে যাবে |ছেলেরা মাথা নাড়লো | আমিও মাথা নাড়লাম,মাথা নাড়লো পুরা বাসের সমস্ত যাত্রী |
শাবাশ ওস্তাদ!এই না হলে উস্তাদ !অসাধারণ তার সাগরেদ গুলো |কি মানার যোগ্যতা,কি বদান্যতা,কি শ্রদ্ধাবোধ,কি অকৃত্রিম ভালবাসা !হবেই বা না কেন ?আপনারাও তো এখন শ্রদ্ধা দেখাচ্ছেন ঐ লোকটির প্রতি | হোক সে একজন ড্রাইভার তাতে কি?তাঁর এই মহানুভবতা কি তাঁর পেশার জন্য ঢেকে যাবে?

না, তা কখনই নয় | আমাদের শিক্ষার আছে অনেক কিছু এই ধরনের সত্যিকারের মানুষ হতে | মানুষ হওয়াই উদ্দেশ্য, আর সেখানে এই প্রকৃত মানুষগুলোই তো আমাদের শিক্ষক |
যে শিখতে চায়,তার জন্য এমন অসংখ্য শিক্ষক আছেন আমাদের মাঝেই | শেখার মন ও মানসিকতা তো থাকতে হবে, তবেই না শেখা যাবে ||