ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

গতকাল চাচাতো ভাইয়ের সাথে কথা হলো অনেকদিন পর। আমি ঢাকা থাকি, ও থাকে গ্রামে। আমরা একসাথে লেখাপড়া করেছি। আমি এস.এস .সি-র পর ঢাকাতে চলে আসি,আর চাচাতো ভাই গ্রামেই থাকে। মাঝখানে ও ঢাকা আসে, সম্মান শেষ করে আবার গ্রামেই ফিরে গেছে। আমরা ছোটকাল হতেই সমাজ সংস্কারমূলক কাজে কিছু ভুমিকা রাখার চেষ্টা করতাম। আমাদের আশেপাশের কেউ কোনো সমস্যায় থাকলে এবং তা আমাদের সাধ্যের মধ্যে হলে চেষ্টা করতাম তা সমাধান করার। এ বেপারে চাচাতো ভাইটি ছিল খুবই তত্পর। আমি ঢাকা আসার পর এলাকার কোনো খবর আমাকে ওর আগে কেউ দিতে পারে নাই, এমন কি আমার পরিবারের লোকজনও না। ওর নাম রুবেল।

আমাদের গোষ্ঠীটা বেশ বড়। আমার নাম থেকেই জেনেছেন নিশ্চয় যে, আমি খান বংশের সন্তান। বাপ-দাদাদের ঐতিহ্যের কিছু কথা না বললে গল্পটা পূর্ণতা পাবেনা, তাই উল্লেখ করছি। নিজেকে ফলাতে নয়, এজন্য ক্ষমা চেয়ে নিলাম প্রথমেই।

ছোট বেলা হতেই দেখেছি আমাদের গ্রামের অনেকেই আমাদের গোষ্ঠীতে কাজ করতেন আর তারা নিজ পরিবারের মতই দেখতেন আমাদেরকে,কোনো কষ্ট কিংবা হিংসা কারো মনে দেখি নাই। আমাকে কোলে করে রাখতেন সাহেব আলী দাদা, যেন নিজেরই দাদা ভাই,আমার মাকে বলতেন মা। যেন কাজের লোকটি না। একসাথে বসে একই খাবার খেতাম। হয়তো টাকা পয়সা কিংবা অবস্থার দিক দিয়ে কিছুটা কম বেশি ছিল সমাজে অনেকেই, কিন্তু মনের দিক দিয়ে যে সবাই ছিল অনেক বড়, আজ সে কথা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। হায়রে, হারানো দিন!

যাহোক, যে কথা বলছিলাম। মাত্র কিছু বছরের মধ্যেই এসেছে সমাজে অনেক পরিবর্তন। অনেককেই আর অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হয় না, আবার অনেকেই ভাগ্যের পরিহাসে করছে অন্যের বাড়িতে কাজ, যার বাড়িতে কিনা এক সময় অন্যেরা কাজ করতো। জীবনটা সিনেমা নয়, তবে জীবন থেকেই যে সিনেমা হয় একথা আজ কেউ না বললেও আমি নিজেই উপলব্ধি করেছি সমাজের পরিবর্তন দেখে। সিনেমারই গল্পের মত সমাজে দেখি কিছু কুচক্রী, যাদের কাজ কিনা কিভাবে অন্যকে ঝামেলাতে ফেলা যায়! এদের যে জন্মের সমস্যা তা না বলে দিলেও চলে, ওদের কাজ কর্মই বলে দেয় সে কথা।

একটু বড় পরিসরে গেলে অবশ্য দেশ কিংবা গোটা বিশ্ব বুকেও এদের দেখা পাবেন। শয়তানকে তো আর দেখা যায়না, ওরা ঐ বড় শয়তানের অনুসারী কিংবা তার দৃশ্যমান বংশধর! আশ্চর্য হচ্ছেন? মিলিয়ে দেখেন ওদের কর্মকান্ড, দেখেন ওদের নজর কিংবা চাহিদা। সমাজে অশান্তি সৃষ্টির জন্য ওরাই যথেষ্ট। তবে সাবধান, ওদের অনুসরণ না করা চাই। এক একটার সাময়িক আনন্দ দেখেছি, যা দেখে মানুষ ভাবে ওরা সুখী! কিন্তু ওদের শেষ পরিণতির দিকে তাকাতে দেয়না শয়তান! বলে যে, যে যাবার সে চলে গেছে। তবে কেন তাদের স্বচ্ছলতা দেখে আফসোস করেছিলে? আফসোস তো এখন করা দরকার ওদের শেষ ভয়াবহ পরিণতি দেখে। এক একটার কি করুণ মৃত্যু!

খাবার, ধন সম্পদ সবই আছে, কিন্তু না খেয়ে বিছানায় পঁচে পঁচে মরতে হলো! এদেরই কর্মকান্ড গুলো সমাজের শান্তিতে ঢেলে দিছে অশান্তির আগুন, যে আগুনে আজ জ্বলে পুরে ছাড়খার সমাজের সম্প্রীতি। আর লাগিয়েছে ভাইয়ে ভাইয়ে, ভাই বোনে, বাপ বেটাতে, চাচা ভাতিজায়, এমনকি মা ছেলেতে দ্বন্দ্ব। আর মাঝখানে নিজেরা ঢুকে ওই সংসারে আগুন লাগিয়ে সংসারটাকে পুড়িয়ে নামিয়েছে পথে! জমিগুলো কেনার ধান্দা ছিল, কিনে নিয়েছে। তো আজ ওই পরিবার অন্যের বাড়িতে কাজ না করলে খাবে কি? এই হলো গ্রাম্য রাজনীতি! এই রাজনীতিরই শিকার আজ আমাদের বংশে অনেকের মত গোটা পৃথিবীর অনেকেই। কারণ ওখানেও যে ছিল/আছে ঐ শয়তানের অনুসারীরা। ওদের একটি কাজ হলো মানুষকে এমন এমন কাজে লাগিয়ে দেয়া যাতে সে এমন নেশায় পড়বে, কেউ আর ফিরাতে পারবেনা। তেমনি একটি হলো টাকা দিয়ে তাস খেলাতে উদ্বুদ্ধ করা। তো ব্যস, হয়ে গেল! খেলা চলছে তো চলছেই, কে পারে ওদের থামাতে! ওরা কি কারো খায় না পড়ে? ওরা তো নিজের টাকায় খেলতেছে। কার বাপের কি? আর পিছনেতো আছেই ঐ যে কুচক্রীর দল! লাগলে টাকা ধার দেয়, আর এভাবেই একদিন ধারের টাকা শোধাতে জমি দিয়ে দেয়। তো ওদের পরিকল্পনাতো সফল, আর প্রায় নিঃস্ব ফাঁদে পা দেয়া লোকগুলি আজ। এভাবেই প্রায় সর্বশান্ত আজ বেশ ক’টি পরিবার। এদের আজ অন্যের বাড়িতে কাজ করে খাওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। কিন্তু কিছু রয়েই গেছে ওই খেলার তালে। কারণ, ওদের বাপ যা রেখে গিয়েছিল সেই সম্পত্তির কিছুটা এখনো বাকি আছে! ওটুকুও তো খোয়াতে হবে, তাইনা? মানে পুরাপুরি অভাব এখনো আসে নাই। তাই চলছে খেলা।

চাচাতো ভাইকে বললাম গোষ্ঠির খবর বল। ও বলল আগের তুলনায় অনেক ভালো। নামাজি সংখ্যা বাড়ছে। খেলোয়ার কমে গেছে। অনেকেই এখন কাজে মনোযোগী। কথাও শোনে। অন্তর হতে শুকরিয়া আদায় করলাম। কিন্তু একটা সমস্যা নাকি আছেই! সেটা কি? গোষ্ঠির দুইজন লোক মোটেই কথা শুনছে না। তারা খেলেই যাচ্ছে। একজন সম্পর্কে চাচা, আর একজন চাচাতো ভাই। কি বলে ওরা? আর বাকিরা শুনলে ওরা শুনছে না কেন? বলল, বাকিরা অভাবে আছে। প্রয়োজনে আসে। টাকা ধার চাইলে দেই, কিন্তু শর্ত দেই যে, আর খেলা যাবে না। ওরা তওবা করে যে, আর কখনই খেলবেনা। টাকা দেই, কাজও দেই। ওরাও খুশি, খুশি আমরাও। তাহলে ঐ দুইজন? না, ওদের অত অভাব আসে নাই। মানা করলে উল্টা হুমকি দেয়। তখন বললাম, তাহলে তো অভাবই ভালো রে রুবেল! মন্দ স্বভাবগুলো বদলে ওরা ভালো হচ্ছে। রুবেল সরাসরি না মানলেও এর বিরোধিতা করলো না।

মার গল্পটা এখানেই শেষ। কিন্তু না বলা কথা বা উপলব্ধিটা বাকি। আর তাহলো, আমি যে অভাবের কথা বলছি তাহলো, যে অভাবের ভয় আমরা সাধারণত পেয়ে থাকি। কিন্তু তা খুবই মামুলি। বলতে পারেন, আমাদের সমাজে কিংবা দেশে না খেয়ে কতজন মারা গেছে? সম্ভবত উত্তরটা হবে, একজনও না। তাহলে কিসের ভয় পাচ্ছি আমরা? কি সেই অভাব? কোন অভাবে স্বভাব নষ্টের কথা বলা হচ্ছে? ক্ষুধার তাড়নায় চুরি? কই? কে করেছে, কবে?

এই অভাব না খেয়ে মরার অভাব না। এটা খায়েশাত। এটা পুরা হবার নয়। সত্যিকারের অভাবে কখনই স্বভাব নষ্ট হয়না, বরং ভালো হয়। অভাবে পড়লে মানুষ ভিতু থাকে, পাপ কাজ কম হয়, ভালোর দিকে ঝুকে, মন্দ হতে তওবা করে। তাহলে তো স্বভাব ভালোই হলো। নষ্ট হলো কোথায়?

আর কৃত্রিম ঐ অভাব, যা মানুষের কল্পনা প্রসূত একটা নোংরা ধারণা মাত্র, তাতে স্বভাব নষ্ট হবেই। একটু সহজ করে বলতে গেলে এভাবে বলা যায় যে, অভাবে স্বভাব নষ্ট নয় বরং স্বভাব নষ্ট হওয়ার কারণেই ঐ ধরনের অভাব এসেছে। নইলে কোটিপতির ছেলের কিসের অভাব, যে সে দুঃখ ভুলতে নেশা করে? বড় সম্পদশালীর কিসের অভাব যে তার সংসার টেকেনা? শিল্পপতির কিসের অভাব যে সে গরিবের নামে বরাদ্ধ টাকা মেরে দেয়? কোটি কোটি টাকার মালিকের বউয়ের কিসের অভাব যে সে ড্রাইভার এর হাত ধরে পালায়? অভাবে মানুষ তালি দেয়া কাপড় পড়ে। কিন্তু কিসের অভাবে এমন কাপড় পড়ে যাতে শরীরের নাজুক স্থানগুলো বেড় হয়ে থাকে? এসবই দিলের অভাব। নোংরা রুচি আর তথাকথিত উচ্চশিক্ষায় এই সব অভাবের জন্ম হয়।

হায়রে শিক্ষিত সমাজ, হায়রে ধনিক শ্রেণী, হায়রে নীতিনির্ধারকের দল! যারা জাতির শান্তির জন্য নিবেদিত, আজ তাদের ঘরে অপূরণীয় অভাব, যা কিনা টাকা কিংবা সম্পদের দ্বারা দূর হয়না! এ অভাবের জন্ম আছে, প্রতিকার নাই। পরিণতি স্বভাব নষ্ট। তাইতো তারা অন্যের হক মেরে খায়, সুন্দরী বউ রেখে অন্যত্র খায়েশ মিটায়, স্বামী রেখে চাকরের হাত ধরে পালায় আর অবশেষে অভিধানে লিখে: ‘অভাবে স্বভাব নষ্ট’ |

কিন্তু তারা এত শিক্ষা নিয়েও আজও জানলোনা যে, অভাবের সংজ্ঞা কি? তাদের দিলে কখনই আসেনা যে, অভাবে স্বভাব ভালো হয়। সত্যিকথাটা হলো তাদের সেই দিলই নাই। হারাম খেতে খেতে দিল মারা গেছে।