ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

শ্রদ্ধেয় আবুল বশার স্যার ছিলেন কারিগরি শিক্ষা বোর্ড-এর মহা পরিচালক। আমার একবার সুযোগ হলো স্যার-এর একটা ক্লাস করার। আমাদের শিক্ষকদের এক ট্রেনিং প্রোগ্রামে একটা ক্লাস তিনি নিয়েছিলেন। বেশ কিছু শিক্ষণীয় গল্প স্যার বলেছিলেন। তার একটা ছিল এমন-

স্যার মহাপরিচালক থাকা অবস্থায় একবার তিনি রাষ্ট্রীয় কাজে গিয়েছিলেন গাইবান্ধা জেলাতে। আমাদের দেশের ঐ অঞ্চলের লোকজন একটু বেশিই দারিদ্রপীড়িত। কৃষির উপর বলতে গেলে পুরাটাই নির্ভরশীল। কিন্তু প্রয়োজনীয় সেচের অভাবে ওদের ফসল তেমন ভালো হয়না। তাই ওদের অভাব লেগেই থাকে। তবুও ওরা কৃষিনির্ভর। জমির ফসলের উপরই ওরা চেয়ে থাকে। ফসল উঠলে তা বিক্রি করে কিছু দিন ভালই চলে। ফসল নিয়ে আসে বাজারে। বির্ক্রী করে কিনে প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র। তখন ছিল ভুট্টার সময়। স্বভাবতই কৃষকেরা বাজারে ভুট্টা নিয়ে এসেছিলেন।

স্যার বলতেছিলেন যে, আমার ভুট্টার মোটেই দরকার ছিল না।  কিন্তু সহজ সরল কৃষকদের আত্মমর্যাদা ঐ মনীষীর যে ভালই জানা ছিল তা ভালো ভাবেই বুঝলাম।বললেন, একটু উপকার করার জন্যই ভাবলাম কিছু ভুট্টা নিয়ে যাই। যাতে কিছুটা উপকৃত হয়, এই জন্য বললাম কত? ঐ কৃষক যা দাম চাইল তাই দিতে রাজি হলাম এবং বললাম মেপে দিয়ে দাও। আমার ড্রাইভারকে বললাম নিয়ে নাও।

দেখলাম এক আশ্চর্য কান্ড! পাল্লাতে ভুট্টা দিয়ে কৃষকটা তার মাথা ঝাকাচ্ছে আর বলছে যে, নাহ! কম হয়ে গেল, কম হয়ে গেল। আমি তো অবাক। দাম তো যা চাইছে তাই দিতে রাজি হইছি। কম হলো কিভাবে? ভাবলাম হয়তো একটু বেশি চাইলে বেশিই পেতো, তাই একটু অনুতাপ করছে।

না! এরা হতে পারে কৃষক, হতে পারে নিরক্ষর,হতে পারে সুন্দর ভাষা জানেনা, সুন্দর পোশাকও গায়ে নাই, এমনকি ভালো খাবারও হয়তো ঠিক মত জোটেনা! তাতে কি, এরা তো মাটির মানুষ, এদের আচরণ তো মাটির মতই। এরাই তো মানুষ, এরাই তো আমাদের শিক্ষক। আমাদের শিকড় তো এদের মাঝেই, আর এরাই আমাদেরকে বড় হতে সব রকমের রসদ জোগায়। কিন্তু এমন সহজ সরল লোকটা কি সামান্য লোভ সামাল দিতে না পেরে এমন কথা বলছে? তা কি করে হয়?

স্যার বললেন, একটু পরই আমার ভুল ভাঙ্গলো। নাহ! দামে কম নয়, ওজনে কম হইছে। ৫ কেজি হতে কিছু কম। তাই সে মাথা নাড়ছিল, কম হয়ে গেল কম হয়ে গেল বলে। দৌড়ায়ে পাশের লোকটার নিকট হতে ভুট্টা আনে, পুরা ৫ কেজি করে তার পর দিলেন। স্যার বলতেছিলেন, এতক্ষণ যে পেরেশানির ছাপ তার চেহারাতে ছিল তা নিমেষেই দূর হয়ে গেল আর এক পরিতৃপ্তির হাসি দেখলাম তার হাসিতে। এরাই মানুষ। এরা হতে পারে নিরক্ষর, কিন্তু মূর্খ নয়। এরা নিরক্ষর শিক্ষিত আর আমরা হলাম শিক্ষিত মুর্খ!

হাঁ, স্যার-এর কথা শুনে সেদিন চোখে পানি চলে এসেছিল। হায়রে, শিক্ষিত সমাজ! এত এত শিক্ষা, আর তার কি অপপ্রয়োগ! অথচ নিরক্ষর একজন কৃষক আমাদের হতে নৈতিক শিক্ষায় কত শিক্ষিত! হায়রে পুঁথিগত বিদ্যা, পুথিতেই রয়ে গেল! আর দেশ ও জাতি পাচ্ছে শোষক আর প্রতারকের দল, যারা শোষণ আর নিপীড়নকে বানিয়েছে বড় হবার হাতিয়ার। ইজ্জত সম্মানের মাপকাঠি বানিয়েছে বড় বড় ডিগ্রী আর অঢেল অর্থ সম্পদ। বললেই হলো? কে সম্মান করে ঐ মুর্খের দলকে। নিপীড়ন হতে বাঁচার জন্য, চাকরি হারানোর ভয়ে কিংবা অন্যায় ভাবে সাজা যাতে ভোগ করতে না হয় সেই জন্য সামনাসামনি ভয় পায়, আড়ালে করে তোদের মুখ ভরে ঘৃণার বমি। লাথি মারি তোদের ঐ ধরনের মানসিকতার, যা মানুষ কে শুধু ঠকানোর জন্যই পুষ্ট। পারলে ঐ কৃষকের কাছ হতে শিখে নে কিভাবে অন্যকে জেতানোর দ্বারা সুখ আসে মনে, কিভাবে অন্যকে জেতানোর দ্বারা নিজে জেতা যায়।

শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়, জীবন হতে শিক্ষার আছে অনেক কিছু। কিন্তু জীবন থেকে তো দেখে দেখে আর উপলব্ধি করে শিখতে হয়। দেখার ঐ চোখ আজ কোথায়? হারাম খেতে খেতে তো ঐ চোখের অপমৃতু ঘটছে। যে চোখ আছে তা তো ধোঁকার চোখ, এই চোখে তো আর ঐ সব মহাশিক্ষা দেখা যায় না।