ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

আব্বার হুকুম মতো যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা তার মামাতো ভাইয়ের মেয়ে এবং তার বান্ধবীদের যথাসাধ্য সাহায্য করার। এই যেমন ভর্তি পরীক্ষার কয়েকদিন তাদের হলে রাখা, কেন্দ্রে আনা-নেয়া ও আপ্যায়নের কাজ আমাকেই করতে হয়েছে।

আমাদের সময় আমার ক্যাম্পাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবজেক্ট ভিত্তিক পরীক্ষা হতো (এখন ফ্যাকাল্টি ভিত্তিক হয়) বিধায় প্রায় দশদিন ধরে চলতো এই ভর্তিযুদ্ধ! একটা যেন মৌসুম চলতো ভর্তি পরীক্ষার! আহা, প্রতি বছর আল্লাহর রহমতে পুরা ভর্তি পরীক্ষার সময়টা আমার রুমটা পূর্ণ থাকতো। ভর্তি পরীক্ষার সময় এমনটা প্রায় সবারই হয়। সবারই বেশকিছু ‘পরিচিতজন’ আসতো পরীক্ষা দিতে, এখনো হয়তো আসে।

তো আমি চাচাতো বোনকে সমাজবিজ্ঞান অনুষদ ভবনে রেখে পরের শিফ্টের জন্য নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলের দিকে রওনা দিলাম আরেকজনকে আনতে! হাঁটা শুরু করছি এমন সময় পেছন থেকে একজন মাঝবয়সী লোক ডাক দিলেন, এই যে! তাকালাম, দেখলাম চিনিনা। বললাম, আমাকে বলছেন? বললেন, হ্যাঁ।

(আমি চাচাতো বোনের সাথে যখন কথা বলতেছিলাম তখন ভদ্রলোক আমাকে খেয়াল করছিলেন, আর কথাবার্তা শুনে বুঝে গেছেন যে, আমি ওখানকার ছাত্র।)

বললাম, বলেন। বললেন, তুমি তো এখানকার ছাত্র? বললাম, জি। বললেন, কোথায় যাচ্ছো? বললাম, আরো এপ্লিকেন্ট আছে, ওকে পরের পরীক্ষার জন্য আনতে। বললেন, আমার ভাগ্নিকে নিয়ে আসছি। ওকে পরীক্ষার হলে ঢুকিয়ে দিয়ে আসলাম, তোমার কথাও খেয়াল করতেছিলাম। তোমাদের ক্যাম্পাস অনেক সুন্দর! তোমার আপত্তি না থাকলে আমি তোমার সাথে আসি? বললাম, না না, আপত্তি থাকবে কেন? আপনি চলেন। রিক্সা নেই? বললেন, না। হেঁটে হেঁটে যাই আর দেখি। বললাম, চলেন।

হাঁটতে হাঁটতে পরিচিতি পর্ব, একথা-সেকথা হচ্ছিলো। ফয়জুন্নেসা হলের প্রায় কাছাকাছি চলে আসছি। দেখলাম, আমার হলের আমার পরের ব্যাচের এক ছোটভাই রিক্সায় প্রান্তিক গেট (জয়বাংলা গেট) থেকে তার বান্ধবীসহ ঐ হলের দিকেই আসতেছে।

ভদ্রলোক হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘কি আশ্চর্য!’

আমি একটু থমকে গেলাম। কি দেখে আশ্চর্য বললেন! ভালো না খারাপ কিছু। বললাম, কি? বললেন, ঐ ছেলেটা আমার এলাকার (মেহেরপুর জেলার), আর ঐ মেয়েটা আমাদের এলাকার এমপির মেয়ে।

আমি তো মনে মনে ভাবতেছি, ইকবাল, তুই আজ শেষ! ততক্ষণে ওরা রিক্সা থেকে নামতেছে। নেমেই মেয়েটা হলে ঢুকে গেলো, আর ইকবাল আমাকে চোখের ইশারা দিলো একটু আলাদা হতে। আমি উনাকে বললাম, আঙ্কেল, আপনি একটু সামনে আগান। চলেন, আপনাকে একটু সামনেও ঘুরিয়ে নিয়ে আসি।

উনি সামনে হাঁটতে থাকলেন। ইকবাল দৌড়ায়ে এসে আমার হাত ধরে বলে, আলীম ভাই, উনি তোমার কি হয়? (কাছের ছোট ভাইগুলো তুমি বলতো, আর আমি তুই-তুকারি করতাম)। বললাম, কিছুই না। বললো, তোমার সাথে যে? বললাম, ভাগ্নি নিয়ে এসেছেন ভর্তি পরীক্ষা দেয়াতে। আমাকে বললেন যে, আমার সাথে একটু ঘুরবেন। নিয়ে আসলাম।

ইকবাল বললো, আচ্ছা শোনো, উনি আমার এলাকার। আমারে হয়তো চেনে, তুমি উনার কাছে কিছুই বলোনা ওর (বান্ধবীর) কথা। বললাম, আচ্ছা, ঠিক আছে। বেচারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।

আমি বললাম, ‘কিন্তু!’ অমনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ইকবাল বলে যে, কিন্তু কি? বললাম, আমাকে তো কিছু বলার সুযোগই দেন নাই। উনি অলরেডি আমাকে তোদের দুইজনের সম্বন্ধে বলে ফেলেছেন। বললো, কখন? বললাম, বেচারার চোখ খুব তীক্ষ্ণ রে, আমি দেখার আগেই দূর থেকেই তোদের রিক্সায় দেখেই আমাকে সংক্ষেপে বলে ফেললেন। বলে, কি বলছে তোমারে?

বললাম, তোর শ্বশুর এম.পি, আর তুই উনার এলাকার। শোনার পর ইকবালের সেই এক্সপ্রেশন মনে পড়লে আজও হাসি পায়, আর একটু দেরিতে হলেও তাই আজ লিখতে হলো। ইকবাল বললো, মারছে! আচ্ছা, তুমি আর কিছু বলোনা। বলেই সে দ্রুত বেগে আল-বেরুনী (আমাদের হল) হলের দিকে হাঁটা দিলো।

পরে অবশ্য আর খোঁজ নেয়া হয়নি যে, ইকবালের বান্ধবীর বাবা পরেরবার ইলেকশনে কিংবা ইকবাল বান্ধবীর পরীক্ষায় পাশ করেছিল কিনা!