ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

কলেজের বড়ভাই, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও তাকে পেলাম, তাও আবার আমার হলেই। তবে এখানে এসে পেলাম ব্যাচমেট হিসেবে, কিন্তু সাবজেক্ট আলাদা। তবে কলেজের সিনিয়র জন্য আমি তাকে পুরা ক্যাম্পাস লাইফে আপনি বলেই সম্বোধন করতাম, আর সেও যথারীতি তুই-তুকারি করতেন। ভর্তির পরের বছর থেকেই আমার ভর্তি পরীক্ষার্থী রাখার পালা শুরু। প্রথমবার পরীক্ষার্থীর চাপ ছিলো বেশি। এর  কারণ ছিলো, আমার নিজের অনেক বন্ধুই এসেছিলো সেকেন্ড টাইম পরীক্ষার জন্য।

রাতে খাওয়ার জন্য ডাইনিংয়ের দিকে যাওয়ার সময় সেই বড় ভাইয়ের সাথে দেখা। বললেন, “আলীম, আমার পরীক্ষা চলছে। আমার গ্রাম থেকে একটা ছেলে আসতেছে পরীক্ষা দিতে। তোর রুমে পাঠিয়ে দেবোনে, যত্ন করে রাখিস। আমার গ্রামের এক স্যারের ছেলে।” বললাম, “বড়ভাই, আমার রুম ফুলফিল, পাশের রুমেও রাখছি “

পাশের রুমের রেজা ভাই, মামুন ভাই, কাউসার ভাই, পার্থ দা, সোহরাব ভাই, জিয়া ভাইরা ছিলেন হলের মোস্ট সিনিয়র। কিন্তু যে আদর আর ভালোবাসা পাইছি তা মরণ পর্যন্ত ভোলার নয়। মায়ের পেটের আপন ভাইয়ের মতই স্নেহ করতেন।

বড়ভাই বললেন, “শোন। মনের মধ্যে জায়গা হলে রুমে জায়গার অভাব হবেনা। মনে জায়গা কর, পাঠিয়ে দেবোনে।”

 

 

ফার্মেসি ডিপার্টমেন্টের মোস্ট সিনিয়র একভাই (লিটন ভাই) ছিলেন, খুব আদর করতেন। আমার এক মামাতো ভাইয়ের সাথে চেহারায় অনেক মিল থাকার কারণে তাকে আমি আমার মামাতো ভাইয়ের নামেই (কামরুল ভাই) ডাকতাম। বেচারার ছয় ফিটের উপর লম্বা সুঠাম দেহ থাকলেও মাঝে মাঝে জ্বর আসতো তার। একদিন বললাম, “আপনার এত বড় শরীরে এত ঘন ঘন জ্বর কিভাবে আসে?জীবাণু এটাক করার সাহস পায় কি করে?”

বললেন, “তুই একটা বলদ। বডির আকার আয়তন যত বেশি, জীবাণুর আক্রমণ করার সুযোগ ও জায়গা তত বেশি। জ্বর কি আর সাধে আসে!”

এক বড় ভাইয়ের (রাকিব খান) বিসিএস পুলিশে হয়ে গেলো। আমাদের কাছের কয়েক জনকে রুমেই রান্না করে খাওয়াবেন। তো রান্না হলো, খেলাম। আড্ডা হলো দীর্ঘক্ষণ। সেসময় উনি কিছু নসিহত করলেন- “তোমরা মোস্ট জুনিয়র, ইউনিভার্সিটির বার্তা এখনো বুঝে উঠো নাই। যাই করো, পলিটিক্স করোনা। আমি করে দেখছি, এর মধ্যে ভালো কিচ্ছু নাই। পাওয়ার থাকলে মেজাজ কড়া থাকে, আর কারণ ছাড়াই অন্যের উপর হাত উঠে যায়, যা মারাত্মক খারাপ একজন মানুষের আচরণের জন্য!”

সত্যি তাই। পলিটিক্স আগে থেকেই ঘৃণা করতাম, ভাইয়ের কথাগুলো সেই ধারণা আরো মজবুত করছিলো। না, আমরা ঐ পলিটিক্স (পলি ট্রিকস) কখনোই করি নাই।

কিছু ফানি, কিছু বাস্তবতা। তবে, সর্বোপরি বড় ভাইদের এরকম অসংখ্য অমর বাণী ছিল ভালোবাসা মাখা। স্নেহের পরশে মিষ্টি বুলি, যা তাদের সাথে আত্মিক সম্পর্কটা বাড়াতো। আজ সেই দিনগুলো গত হতে চলেছে বর্তমান ছাত্রদের ক্যাম্পাস লাইফ হতে। এটা নাকি গিভ এন্ড টেকের যুগ। হায়রে, কোথায় গেলো স্নেহপরায়ণতা, কোথায় হারালো শ্রদ্ধাবোধ?

আজ সেই বড় ভাইয়ের অভাব, যাদের হৃদয়ও ছিল বড়; অভাব সেই ছোটো ভাইদেরও, যারা বড়দের সম্মানকে নিজের কর্তব্য মনে করে। নোংরা রাজনীতি আর পঁচা স্বার্থের কারণে হারিয়ে না যাক মানবিক দিকগুলো। মানুষ সত্যিকার মানুষ হয়ে উঠুক, শুধু বড় বড় ডিগ্রীতে নয়, মনে এবং আচরণেও বড় মানুষ হয়ে উঠুক।