ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

প্রতিদিনের মত যানজটের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধ করতে করতে অফিস থেকে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেছে। মধ্যরাত ছুঁই ছুঁই বলা যায়। সেটা নিশ্চিত হতে ঘড়িও দেখে নিলাম। বাস থেকে নেমে দেখি কোনো রিকশা নেই। অপেক্ষা করতেেই চুল-দাঁড়ি পাকা বয়সের ভারে ন্যূজ এক বৃদ্ধের আগমন। চালক বৃদ্ধ বলে রিকশায় চড়তে আমার অবচেতন মন নিষেধাজ্ঞা বসিয়ে রেখেছে।

বৃদ্ধ নিশ্চিত ছিলেন যেহেতু আর কোনো রিকসা নেই, তাহলে এটাতেই যেতে হবে আমাকে।

মামা যাবেন? মামা শব্দটা আমরা রিকশা চালককে বলি। এই মামা সম্বোধন এখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। মামা না হয়ে চাচা, দাদা, ভাই হতে পারত বয়সের রকমভেদে, কিন্তু চালু হয়ে গেল মামা ডাকটাই।

– কত ভাড়া?

– আপনি যা ভাড়া তাই দিবেন।

এই ধাঁধায় পড়তে চাই না। রিকশা চালকরা অনেক সময় গন্তব্যস্থলে গিয়ে মাকড়সার জালের মতো আটকে বেশি ভাড়া দাবি করে থাকে। তর্কাতর্কির অভ্যাস না থাকলে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে অবশেষে মানিব্যাগ দুর্বল করতে হয়।

– কত নিবেন মামা তাই বলেন।

আমি ঠিকঠাক করেই উঠতে চাই। ভাড়া ঠিকঠাক হলো। রিকশা চলতে থাকে।

হেমন্তের আগমনে শীতও হাতছানিও দিচ্ছে। সারাদিনের গম গম করা রাজধানী মধ্যরাতে সুনসান নীরবতায় মোড়ানো। চারিদিকে গাছের সারি, ল্যাম্পপোস্টের বাতিতে একদম অন্যরকম লাগছে রাস্তাটা। যেন একটা বড় অ্যাভিনিউয়ে জীবনের পথে আমি শুধু একা। পায়ের উপর পা তুলে বসে আছি। মাঝে মাঝে দুটি হেডলাইট জ্বালিয়ে সাঁ সাঁ শব্দে  ছুটছে গাড়ি।

সারাদিনে কাজ শেষে নানা আঁকিবুঁকি আঁকি। মানবদেহটা রিকশার উপর থাকলেও মনটা সেখানে নেই। অবাধ্য এ মন এখানে-ওখানে নিজের মত ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আনমনা অনুভূতির মাঝে প্রশ্নটা কানে এসে ধাক্কা খায়; মামা, দেশে কি নির্বাচন হবে?

আমার একবারে হুমড়ি খেয়ে পড়ার অবস্থা। এই মধ্যরাতে আমি আর রিকশা চালক ছাড়া কেউই নেই। এমন একটা প্রশ্ন যে আমার দিকেই ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে তা নিশ্চিত হলাম।

আমি নির্বাচন কমিশনার নই, রাজনৈতিক নেতা বা বুদ্ধিজীবীও নই। তাহলে এ প্রশ্ন আমার কাছে কেন? আমি ইনিয়ে-বিনিয়ে, জোড়াতালি দিয়ে একটা উত্তর দিলাম।

একেবারে শুদ্ধ বাংলায় নানা প্রশ্ন করে চলেন তিনি। আমি বুঝলাম, সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক নানা বিষয়ে গভীর জ্ঞান সঞ্চয় আছে তার মধ্যে। তবে তার কৌতূহলী মনে জমে থাকা সব প্রশ্নের উত্তর ফেল করা ছাত্রের মত দিয়ে গেলাম আমি।

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে এখন সাধারণ মানুষ অসাধারণ হয়ে উঠেছে। তাদেরকে ভুল বুঝিয়ে কিছুক্ষণ রাখা গেলেও দীর্ঘ সময় রাখা যায় না। সেটা কিছুদিন আগে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে ছাত্র-ছাত্রীরা মগজে ঢুকিয়ে ছেড়েছে। ইতোমধ্যে তার সঙ্গে আমার ভাব জমতে আর বাকি রইলো না। নামটাও জেনে নেওয়া হলো। নামটা হলো আহসান।

এই দেশটা আহসান মামাদেরই। আহসান মামারা বিন্দু বিন্দু কর দিয়ে গড়ে তোলে দেশের অর্থনীতি। তাদের জীবনের চাকা হলো এই দেশের চাকা। গণতান্ত্রিক দেশে তাদেরও রয়েছে অসীম শক্তি, যেটা পাঁচ বছর পর পর আসে। সেটা হলো ভোটাধিকার। এই ভোটাধিকার প্রয়োগ করে যখন-তখন গণেশ উল্টে দিতে পারে তারা।

রিকশা চলে গল্পও চলে। আহসান মামা দীর্ঘদিন রিকসার প্রতিটি প্যাডেলে তার জীবনের গল্প নির্মাণ করে চলছে। দীর্ঘ রাজনীতির আলোচনার পর তার প্রতি আমার পাহাড় সমান কৌতূহল তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়ে ঢুকে পড়তে চলেছি।

তার নাম আসল নাম আহসান চৌধুরী। বাড়ি বগুড়া। চৌধুরী অংশটুকু সে নিজে ছেঁটে ফেলেছে। একবার অন্য রিকশা চালকরা চৌধুরী নামটা শুনে তিরস্কার করতে ছাড়েনি তাকে। তারপর থেকে  ‘চৌধুরী’ বাদ দিয়েছেন।

সোনার চামচ মুখে দিয়ে খুব আভিজাত্য ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মেছিলেন তিনি। যেখানে চর্চা হতো বিজ্ঞান, দর্শন ও রাজনীতি নিয়ে। বলা যায় পারিবারিক শিক্ষায় শিক্ষিত তিনি। পড়াশোনার খুব গভীর আগ্রহ থাকলেও ছোট থাকতে বাবা মারা যাওয়ার কারণে তার পড়াশোনা করা হয়নি।

পড়াশোনার পাঠ চুকিয়েছেন পঞ্চম শ্রেণিতে। দারিদ্র আর জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম করতে করতে এক ছেলে ও মেয়েকে ঠিকমতো পড়াশোনা করাতে পারেননি। দীর্ঘ তিরিশ বছর রিকশার প্যাডেলের উপর ভর করে জীবনকে টেনে নিয়ে এসেছেন। বাড়িতে মাসে মাসে বৃদ্ধ স্ত্রীর জন্য টাকা পাঠিয়ে এখনও দায়িত্ব পালন করে চলছেন। একমাত্র ছেলেও অভাবের সঙ্গে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। তবুও বন্ধন আছে তাদের মধ্যে। এক কষ্টের নিশ্বাস ছেড়ে বিরতিহীনভাবে বলেন আহসান চৌধুরী মামা।

তিনি রাজধানীতে থাকেন অন্য রিকশা চালকদের সঙ্গে। পাশের এক সেলুনে খুব ভাব জমিয়েছেন প্রতিদিনের পত্রিকাটা পড়ার জন্য। দীর্ঘ জীবনে প্রতিদিনের পত্রিকা পড়ার অভ্যাস সকালের নাস্তার মতো তার। রুমে অনেক কষ্ট করে টিভিও নিয়েছেন।

কোনো একদিন আমার এক শিক্ষক বলেছিলেন, অর্থবিত্ত যখন-তখন চলে যেতে পারে, তবে পারিবারিক রুচিবোধ ও আভিজাত্য থেকে যায়। রুচিবোধ মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত থেকে যায়। কারণ রুচিবোধ চর্চার বিষয়। আহসান চৌধুরী যেন তাই প্রমাণ করে যাচ্ছেন।

চলতে চলতে বাসার কাছে চলে এসেছি। রাস্তাটি যদি রাবারের মতো টেনে বর্ধিত করা যেত সেটা আমি নিশ্চিত করতাম। এবার পাওনা বুঝিয়ে দেয়ার পালা। ভাড়া দিতে গেলে তিনি বললেন, মামা, আপনার ভাড়া দেওয়া লাগবে না।

আমি  বললাম, মামা, আপনি ভাড়া না নিলে আমি অখুশি হবো। আমাকে অখুশি করে আপনি কি খুশি হতে চান?

নিশ্চয়ই কাউকে অখুশি করার অভ্যাস তার নেই বলেই হাতটা বাড়িয়ে দিলেন।

তারপর আমি দাঁড়িয়ে থেকে ল্যাম্পপোস্টের মৃদু আলো আর আবছা অন্ধকারে আহসান চৌধুরীকে মিলিয়ে যেতে দেখি ।