ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাসায় ফিরে এক ছোট ভাইয়ের ফেইসবুক ওয়াল পোস্ট থেকে জানতে পারলাম বিউটি পারলার পারসোনার বনানী শাখা থেকে একটি ‘গোপন’ ক্যামেরা উদ্ধার করা হয়েছে। সামহোয়্যার ইন ব্লগে ব্লগার লাবু এবং অগ্নিলার পোস্ট থেকে ঘটনার বিস্তারিত জেনে আঁতকে উঠলাম। ঘটনাটি এরকমঃ শুক্রবার বিকালে পারসোনার বনানীর ১১ নম্বর রোডের শাখায় ‘স্পা’ করাতে যান একজন নারী চিকিৎসক। সেখানে একটি কক্ষে তিনি পোশাক পরিবর্তনের পরে কক্ষে সিসিটিভি দেখতে পান। ভিডিও করার জন্য তিনি পারসোনা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে পুলিশ ও সংবাদ মাধ্যমে মৌখিক অভিযোগ আনেন। তিনি তার স্বামীকে খবর দেন। স্বামী এলে সেখানে ব্যাপক হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। (সূত্রঃ bdnews24.com)

প্রথমেই প্রশ্ন আসে, পোশাক পরিবর্তন কক্ষে বা স্পা কক্ষে ক্যামেরার প্রয়োজনীয়তা কী? প্রতিষ্ঠানটির সহকারী ব্যবস্থাপক ফারহানা জানান, ‘কিছুদিন আগে পারসোনার এই শাখাটি থেকে চুরি হয়। এরপর থেকেই নিরাপত্তার খাতিরে এসব কক্ষে ক্যামেরা স্থাপন করা হয়।’ পারসোনার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কানিজ আলমাস খান এ ব্যাপারে জানান, ‘সিসি ক্যামেরাটিতে শুধুমাত্র রুমের দরজাটি কাভার করার হয়েছে। সেখানে আপত্তিকর কিছু ভিডিও করার সুযোগ নেই। কী উদ্দেশ্যে আমরা আপত্তিকর ভিডিও করব? শুধুমাত্র নিরাপত্তা ও কর্মীদের পর্যবেক্ষণের কথা চিন্তা করেই ক্যামেরাগুলো বসানো হয়েছে। আর এগুলো তো গোপন ক্যামেরা নয়। (সূত্রঃ bdnews24.com)

নিরাপত্তার জন্য পোশাক পরিবর্তন কক্ষে ক্যামেরা রাখতে হবে এমন অদ্ভুত কথা আমি জীবনেও শুনিনি। চেঞ্জ রুমে মূলত কারা যায়?পারসোনার কর্মীরা নিশ্চয়ই চেঞ্জ রুম বা স্পা কক্ষে গিয়ে সবসময় বসে থাকে না যে তাদের পর্যবেক্ষণের জন্য সেখানে ক্যামেরা লাগাতে হবে। আর সেখানে থাকেই বা কী যে তার নিরাপত্তা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল? তারা এতই ডিজিটালাইজড হয়ে গেছে যে গ্রাহকদের মূল্যবান জিনিস রক্ষার জন্য লকার সিস্টেম না করে জায়গায় জায়গায় ক্যামেরা লাগিয়ে দিল! ঠিক আছে তাও না হয় বুঝলাম তারা অনেক ডিজিটালাইজড(!!!!) তার পরেও আমার প্রশ্ন, ক্যামেরাটি যদি শুধু রুমের দরজাটাই কাভার করে তাহলে চোর কি এতই বোকা যে সে রুমের বাকি জায়গা বাদ দিয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে চুরি করবে আর পারসোনার নিরাপত্তাকর্মীরা তা দেখে চোর সনাক্ত করবে? যদিও গুলশান থানার উপ-পরিদর্শক মেহেদী মাসুদ স্পষ্টই বলেছেন, ‘রুমটির যেখানে ক্যামেরা রয়েছে, সেখান থেকে পুরো রুমটিই কাভার করা সম্ভব।’ সর্বোপরি খারাপ কোন উদ্দেশ্য না থাকলে পারসোনা কর্তৃপক্ষ পুলিশ যাওয়ার আগে ক্যামেরাটি সরিয়ে ফেলল কেন?

ঘটনার আজ তিন দিন হতে চলল অথচ তথাকথিত ‘মূলধারার’ কোন সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেল এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোন কিছুই প্রকাশ বা প্রচার করল না। যে প্রথম আলো নারীদেরকে নিয়ে এত সোচ্চার, নারীদের স্বাধীনতার গীত গাইতে গাইতে অস্থির, ইভ টিজিং, এসিড সন্ত্রাসের বিরূদ্ধে নিজেদেরকে যোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দেয়,’নারীবাদী’ লেখা দিয়ে পত্রিকার পাতা ভরিয়ে ফেলে কোথায় গেল তারা? নেদারল্যান্ডসে কোন এক নারী তার প্রাক্তন ‘প্রেমিককে’ এক বছরে কত হাজার বার ফোন দিয়েছে, বিশ্বকাপের সময় পুনম পান্ডে বিবস্ত্র অবস্থায় ভারতীয় ক্রিকেট দলের সামনে হাজির হবে কিনা, এসব তুচ্ছ এবং সারবস্তুহীন খবর তারা ছাপতে পারে, কিন্তু পারসোনার এই ঘৃণ্য ব্যাপারটি নিয়ে কোন রিপোর্ট তারা করতে পারে না। এটাতো সেই চ্যানেল আই যারা নারীদেরকে নিয়ে কত অনুষ্ঠান করে, মেয়েদেরকে এগিয়ে (!!!!) নেওয়ার জন্য লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টারের আয়োজন করে যেন মেয়েরা আগের চেয়ে অনেক বেশী কনফিডেন্ট এবং রূপ সচেতন হয় তাই না? সমস্ত মিডিয়া জুড়ে (পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেল) নারীদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য, নারীদেরকে আরও সচেতন করে তোলার জন্য কী অপরিসীম প্রতিযোগিতা! তো কোথায় গেল আজ তারা সবাই? আমি ভাই নারীবাদ, পুরুষবাদ বুঝি না, আমি শুধু বুঝি মানবতাবাদ। প্রথম আলোর নকশায় ছাপা ছবির মত মেয়েদের কাধে হাত রেখে না হোক, মেয়েদের পাশে থেকে আমরা একসাথে দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই যে দেশে সবার পরিচয় হবে মানবতাবাদী ‘মানুষ’। নারীবাদী তত্ত্বের অন্তরালে মেয়েদেরকে আমরা পণ্যে রূপান্তরিত করতে চাই না।

আপনি, আমি সৌন্দর্য সচেতন হব, আমাদের ডিসেন্ট একটি লুক থাকবে, এটা সবারই কাম্য। কিন্তু মিডিয়ার কল্যাণে (!!!!) আমরা পার্লারের প্রতি দিনে দিনে কী ভয়ঙ্করভাবে আসক্ত হয়ে পড়ছি তা কি ভেবে দেখছি? বুয়েট, মেডিকেল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কত কত তরুণ ছেলেমেয়ে আজ দেশ এবং দেশের বাইরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এঁদের কেউ কেউ আমার পরিচিত, কেউ কেউ খুব কাছের বন্ধু। অপরিসীম মেধার অধিকারী এই ছেলেমেয়েগুলোকে দেখেছি বাস্তব জীবনে চলনে বলনে কতই না সাধারণ। অথচ একই সাথে তরুণ প্রজন্মেরই একটি অংশ তাদের বাহ্যিক সৌন্দর্যের ব্যপারে এতটাই সচেতন যে নিয়মিত তাদের পার্লারে না গেলেই নয়, এমনকি শরীরের অতীব গোপন স্থানের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যও তাদেরকে পার্লারে যেতে হয়। কেউ কেউ আবার মানসিক প্রশান্তির জন্য স্পা করাতে যান। আমি তাদেরকে বলব স্পা করানোর টাকাটা দিয়ে অন্তত দুইটা গরীব পথশিশুকে পেট পুরে খাওয়ান, খাওয়ানোর সময় তাদের পাশে একটু বসে দেখুন, দেখবেন যে মানসিক প্রশান্তি আপনি পাচ্ছেন, হাজারবার স্পা করলেও আপনি সেই প্রশান্তি পাবেন কিনা আমার সন্দেহ আছে। আমি পার্লার বা সৌন্দর্য বিরোধী না। কিন্তু যে সৌন্দর্য আমাকে আপনাকে আরও বেশী আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে, যে সৌন্দর্য আমার মনের ভেতরের সৌন্দর্যকে ভুলিয়ে দেয় আমি তার বিরোধী।

একটু ভেবে দেখুন তো আজ পারসোনার মত একটি ঘটনা যদি আমার বা আপনার প্রতিষ্ঠানে ঘটত যেখানে হয়ত আমি আপনি নির্দোষ, হয়ত বা আপনার আমার অগোচরে প্রতিষ্ঠানের কোন একজনের অসততার কারণে এটা হয়েছে। কিন্তু তাতে কি আপনি বা আমি রেহাই পেতাম? পেতাম না। এই মিডিয়াগুলোই দেখতেন তখন আমাদের নামে প্রথম পাতায় কত বড় করে ফিচার ছাপত। তথাকথিত নারীবাদীরা আমাদের গোষ্ঠী উদ্ধার করে ছাড়ত। কে জানে হয়ত রিমান্ডেও নেওয়া হত। কিন্তু পারসোনার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কানিজ আলমাস খান কি বলেছেন আপনি জানেন? তিনি বলেছেন, ‘নিরাপত্তার স্বার্থেই ক্যামেরাগুলো সেখানে রাখা দরকার।’ ক্যামেরা সরানো হবে না বলেও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ক্যামেরার কারণে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হচ্ছে বলেও মনে করেন না কানিজ। ( সূত্রঃ বিডি নিউজ ২৪, কম)
অথচ তিনি নিজেই এক বক্তব্যে স্বীকার করেছেন তার প্রতিষ্ঠানের ছেলে কর্মচারীরাই ক্যামেরা সংক্রান্ত নিরাপত্তা মনিটর করে। শুধু তাই না, ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর পুলিশকে হার্ড ডিস্ক দেওয়ার আগে দুই জন কর্মচারী ভিডিওগুলো পেনড্রাইভে সরানোর চেষ্টা করে। এত কিছুর পরও কানিজ আলমাস কিভাবে এত ঔদ্ধত্য দেখান? সামান্য ক্ষমা চাইতেও তার অহং এ বাধে? এত বড় ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস তিনি কোথায় পান?

আমরা জানি কানিজের হাত অনেক লম্বা। আপনি বা আমি একা তার বিরূদ্ধে কিছুই করতে পারবনা। কিন্তু আপনার, আমার, আমাদের সবার সম্মিলিত হাতের চেয়েও কি কানিজের হাত লম্বা? তথাকথিত মিডিয়া আমাদের সাথে নাই বা থাকল। কিন্তু তাই বলে কি আপনি, আমি চুপ করে বসে থাকব? তারা যা বলে তাই শুনে যাব? কোন প্রতিবাদ করব না? আপনার বা আমার কি কোন দায়িত্বই নেই? কে জানে নীরবে আপনার বা আমার পরিবারের নীরব কোন ক্ষতি পারসোনা ইতিমধ্যেই করে ফেলেছে কিনা? এত বড় ঘটনার পরও যারা আমাদের সাথে এত বড় ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ করতে পারে এবং সব কিছুর পরও যদি এভাবে পার পেয়ে যায়, ভবিষ্যতে তাহলে তারা কী না করতে পারে? দয়া করে জেগে উঠুন, আপনার জায়গায় থেকে অন্তত আপনি প্রতিবাদ করুন, আপনার ধিক্কারটুকু জানান। আপনার আমার জন্য মিডিয়া না থাকতে পারে কিন্তু এখন তো আমাদের ফেইসবুক আছে, ব্লগ আছে, একটি বিকল্প মিডিয়া তো অন্তত আছে। আর কিছু না পারি আসুন আমরা অন্তত মিডিয়ার এই সব ‘বিগ ফিশ’দের চেহারা টা উন্মোচন করে দেই।

অন্য চ্যানেল গুলো থেকে ব্যতিক্রমী থেকে ‘মাছরাঙ্গা’ নামের একটি চ্যানেল ঘটনার দিন একটি রিপোর্ট করেছে। এছাড়া bdnews24.com এর একটি লিঙ্কও নিচে দেওয়া হল।


****
(লেখাটি গত ৩ অক্টোবর ফেইসবুকে প্রথম নোট আকারে লেখা হয়)