ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগের ঘটনা। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকেন্ড বা থার্ড ইয়ারে পড়ি। পড়াশোনার পাশাপাশি একটা কোচিং এ পড়াই। একদিন রিক্সায় করে বাসায় ফিরছি। আনমনে কী ভাবছিলাম মনে নেই কিন্তু হঠাত চমকে উঠলাম। রিক্সাওয়ালা অবিকল কিশোর কুমারের গলায় গান গাইছে। ঠিক সেই ভরাট গলা। আমি অনেক সময় অনেক অ্যামেচারের গান শুনেছি কিন্তু কেউ যে এতটা অবিকলভাবে গাইতে পারে তা আমার কল্পনাতেও ছিল না। আমি খুব অবাক হলাম। এরপর বাকি পথ তার গান শুনে আর কথা বলতে বলতে আসলাম। ছোটবেলা থেকে গান শুনে শুনে সে গান গাইতে শিখেছে। খুব ইচ্ছা, আরও ভাল করে শেখার। কিন্তু পেটে যেখানে ভাতই ঠিকমত পড়েনা, সেখানে কি এইসব বিলাসিতা মানায়? যাই হোক, রিক্সা থামার পর ভাড়ার সাথে আরও বেশ কিছু টাকা তাকে দিতে চাইলাম। কিন্তু কোনভাবেই সে বাড়তি টাকা নিবে না। আমি বললাম,

‘ভাই, আপনার গান আমার অসম্ভব ভাল লেগেছে, আমার যদি সামর্থ্য থাকত, আমি আপনার জন্য কিছু করতাম, কিন্তু আমি নিজেই একজন ছাত্র। আপনার জন্য কতটুকুই বা করতে পারব বলেন? আপনি যদি এই টাকাটা নেন আমি খুশি হব।’

এর উত্তরে যা শুনলাম, সেটাকে আমার জীবনের অন্যতম বড় চমক বললে একটুও ভুল হবে না। রিক্সাচালক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন ছাত্র। বাবা মা খুবই গরীব, বাবা মার কাছ থেকে সে টাকা নিবে কি উল্টো বাবা মাকেই মাসে মাসে টাকা পাঠাতে হয়। একজন ছাত্র হয়ে সে কিভাবে উপার্জন করবে? টিউশনি করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু যে কোন কারনেই হোক টিউশনি সে পায়নি। ঢাকায় নিজের চলার জন্য, খাওয়ার জন্য ন্যূনতম কিছু টাকাও তো লাগবে। তাই আর কোন উপায় না দেখে বাধ্য হয়ে একবেলা (যখন ক্লাস থাকে না) সে রিক্সা চালায়। রিক্সা চালাতে গিয়ে তার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সে বলেছিল,

‘ভাই, আর যাই হোক চুরি তো করতেছিনা, কোন খারাপ কাজ তো করতেছিনা। কিন্তু খুব খারাপ লাগে যখন প্যাসেঞ্জাররা তুই তোকারি করে, সামান্য কারনে খারাপ ব্যবহার করে’।

সেদিন বাসায় এসে আমি কোনভাবেই স্থির হতে পারছিলাম না। লোকটার কথা ঠিক বিশ্বাসও করতে পারছিলাম না আবার মনে হচ্ছিল মিথ্যা কথা বললেও এই ধরনের মিথ্যা কথাই বা কেন বলবে? যাই হোক, আসার সময় তার মোবাইল নাম্বার নিয়ে এসেছিলাম। আমার ভুল ভাঙ্গে তার সাথে পরবর্তী সাক্ষাতে তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ড দেখে। সত্যি বলতে কি,তখন কিছুটা লজ্জাও পেয়েছিলাম আমি। মনের ভেতর তীব্র একটা ইচ্ছা জাগল এই মানুষটার জন্য কিছু একটা করতেই হবে। কিন্তু সমস্যা তো ওই একটাই, আমার নিজের খরচ চালানোর জন্য যেখানে আমাকে টিউশনি করতে হয় তখন এই মানুষটার জন্য আমি কীই বা করতে পারি? জীবনে প্রথমবারের মত মনে হল, আমার সাধ্যের মধ্যে যা আছে তাই দিয়ে চেষ্টা করি না কেন? হতে পারি আমি ছাত্র, কিন্তু আমি তো তাকে অন্তত একটা টিউশনি খুঁজে দেবার চেষ্টা করতে পারি। সকালে ক্লাস করে দুপুরে রিক্সা চালিয়ে রাতে পড়ালেখা করার মত ইচ্ছা বা শক্তি নিশ্চয়ই তার থাকে না। ব্যাপারটা নিয়ে আমি আমাদের স্কুলের একজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলি। একমাসের মধ্যে তার জন্য আমরা একটা টিউশনির ব্যবস্থা করি। যেদিন তাকে এই খবরটা দিলাম, সেদিন আমার বা হাসান (ছদ্মনাম) ভাইয়ের কারোরই যেন খুশি আর ধরে না। হোক না খুব ছোট একটা খবর, তাতে কি?

হাসান ভাইয়ের সাথে আমার বেশ অনেকদিন যোগাযোগ ছিল। উনি খুব ভালভাবেই টিউশনি চালিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই সাথে নিজের পড়ালেখাটাও ভালভাবেই করতে পারছিলেন। একটা টিউশনি করার কারনে আরও কিছু টিউশনির সুযোগও তার সামনে চলে এল। হঠাত করেই যেন তার জীবনটা কিছুটা হলেও পাল্টে গেল। জীবনের গতিপথ কিছুটা হলেও যেন ঘুরে গেল। হাসান ভাই, প্রায়ই আমাকে ফোন করে ধন্যবাদ দিতেন, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। আমি বলতাম,

‘ভাই, আপনি এমন একজন মানুষ যে স্বপ্ন দেখতে জানে, যে স্বপ্ন দেখাতে জানে, হাজার প্রতিকূলতার মাঝেও যে জীবনের মূল্যবোধকে বিসর্জন দেয়নি। আমার পরম সৌভাগ্য যে আপনার মত একজন মানুষের স্বপ্নসারথী হতে পেরেছি।’

আমি যতদূর জানি হাসান ভাই শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেশ কৃতিত্বের সঙ্গেই গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছেন। পরবর্তীতে আমার মোবাইল সেটটি হারিয়ে যায়, সেই সিমটিও আর তোলা হয়নি। একজন স্বপ্নচারী হাসানের সাথে সেখানেই আমার যোগাযোগ শেষ হয়ে যায়।

আপনার, আমার চারপাশে এরকম কত অসংখ্য অব্যক্ত কাহিনী লুকিয়ে আছে। তার কয়টা আমরা জানি? কখনও কি আমরা ভেবে দেখেছি, আমাদের পাশের অতি সাধারণ মানুষটি, যাকে আমরা তুচ্ছ ভাবছি, যাকে নিতান্তই অবহেলা করছি, সেই মানুষটিরওঅসাধারণ কোন জীবনকাহিনী থাকতে পারে? কখনও কি ভেবে দেখেছি, আমাদের সামান্য কিছু সাহায্য, হয়ত সেটা খুবই সামান্য, একটা মানুষের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে, তার জীবনের গতিপথটাকেই পাল্টে দিতে পারে? আমাদের কাছে যেটা সামান্য, একজন অসহায় মানুষের কাছে সেটাই হয়ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আসুন, আমাদের চারপাশের স্বপ্নচারী এই মানুষগুলোকে খুঁজি, তাদের পাশে দাঁড়াই। পরস্পরের প্রতি আমাদের দুহাত প্রসারিত করি পরম মমতায়…………………