ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

কী দিয়ে শুরু করব লেখাটা কিছুই ঠাউরে উঠতে পারছি না। বেলা তিনটায় খবরটা শোনার পর থেকেই স্তম্ভিত বনে গেছি, হৃদয়টা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে, চোখের কোণে অশ্রুকণা জমেই রয়েছে, মাথাটা কাজ করছে না। এমনও ঘটনা ঘটতে পারে বিশ্বাসই হচ্ছে না। সৃষ্টিকর্তা বলে যদি কেউ থেকে থাকেন, তবে ধ্বংসকর্তা বলেও কেউ একজন আছেন নিশ্চয়ই। নইলে এমনটা অন্য কেউ ঘটাতে পারে না। এই মুহূর্তে যদি ঔ ধ্বংসকর্তাকে সামনে পেতাম তবে সদলবলে তার ওর চড়াও হতাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অনুপম রায় ফোনে খবরটা জানলে মনে হচ্ছিল কাছে পেলে তখন ওর উপরই ঝালটা মেটাতাম।  এমনই আরো কত কি এলোমেলো চিন্তায় পেয়ে বসেছে কয়েক ঘণ্টা যাবত। কারণ, আমাদের অত্যন্ত প্রিয় ও একান্ত আপনজন, অজাতশত্রু, সরলপ্রাণ রনজিত চন্দ্র সরকার আজ বেলা ১১টা নাগাদ ময়মনসিংহে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।

জৈবিক নিয়মে জন্মের পর প্রতিটি মানুষেরই একদিন মৃত্যু হবে তা অবধারিত। তবে কিছু মৃত্যু ঘটে থাকে অনবধারিতভাবে- যা ঘটেছে রনজিত চন্দ্র সরকারের বেলায়। তাই সঙ্গত কারণেই  অপঘাতে এই অকাল মৃত্যু তার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সহপাঠী, সহকর্মী প্রমুখ সকলকেই বিমূঢ় এবং মুহ্যমান করে তুলেছে। কেউই মানতে রাজি নন তাদের প্রিয় এই মানুষটি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। কারণ মাত্র ৫৮ বছর বয়সে সুস্থ, সবল, কর্মক্ষম, উদ্যম-সমাজকর্মী, স্বউদ্যোগে পরোকারী এই মানুষটি হুট করে চিরবিদায় নিবেন তাতো একেবারেই কল্পনাতীত।  দক্ষ উচ্চ পদস্থ সরকারি এই কর্মকর্তাকে যারা চেনেন বা জানেন এবং তার সাথে কাজ করা বা চলাফেরার সুযোগ হয়েছে তারা সবাই এক বাক্যে তার মানবিক গুণাবলীর কথা স্বীকার করবেন।

১৯৫৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার মোহনগঞ্জ থানার (বর্তমানে নেত্রকোণা জেলার অন্তর্ভূক্ত) বাখরপুর গ্রামে রনজিত চন্দ্র সরকার জন্মগ্রহণ করেন। পিতা নরেন্দ্র চন্দ্র সরকার, মা শৈলবালা সরকার। কয়েক বছর আগে বাবা মারা গেলেও তার মাতা জীবিত রয়েছেন। বৃদ্ধ মা’কে দেখাশোনার জন্য ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলেন তিনি। উল্লেখ্য, সময়-সুযোগ পেলেই নাড়ির টানে পরম স্নেহময়ী জননীর সেবায় রনজিত ছুটে যেতেন প্রিয় জন্মভিটায়। এদিকে কর্মস্থলে ফেরার তাগিদও ছিল তার একাধিক কারণে। ২১/০৯/২০১৫ তারিখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে সরকারের যুগ্ম-সচিব রনজিত চন্দ্র সরকারকে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে বদলি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয়। ফলে ঢাকায় ফিরে একদিকে উক্ত মন্ত্রণালয়ে অধীনস্থ নতুন কর্মস্থল প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক হিসেবে মঙ্গলবার সেখানে প্রথম কর্মদিবস শুরু করার তাগিদ, অন্যদিকে ঢাকায় প্রিয়তম স্ত্রী এবং পরম আদরের সন্তানদের কাছে ফিরে আসার তাড়া ছিল। সেসব কারণে সোমবার সকালে ঢাকায় আসার উদ্দেশে হাওড় এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠেন। বেলা ১১টায় ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনটি যাত্রা বিরতি করে। এ সময় প্রাকৃতিক কাজে স্টেশন মাস্টারের কার্যালয়ের প্রক্ষালন কক্ষে যান তিনি। ওই কক্ষ থেকে বের হয়ে দেখেন ট্রেনটি ছেড়ে দিয়েছে। তাই ট্রেন ধরার জন্য দৌঁড়ে তার হ্যান্ডেল ধরতে গিয়ে তিনি ট্রেনের নিচে ছিটকে পড়েন। এতে তার বাম পায়ের হাটু পর্যন্ত দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, ডান পায়ের সব ক’টা আঙ্গুল কাটা পড়ে এবং মাথায় প্রচণ্ড আঘাতপ্রাপ্ত হন তিনি । সেখান থেকে উদ্ধার করে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির পর দুপুর ১২টায় তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। এভাবেই এই মহান কর্মবীরের জীবনাবসান ঘটে।

সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও সমাজের অন্যান্য কর্মক্ষেত্রেও রনজিত চন্দ্র সরকারের দৃপ্ত পদচারণা বিদ্যমান ছিল। আর সকল কর্মকাণ্ডেই তিনি ছিলেন আসাধারণ দায়িত্ববোধসম্পন্ন এবং সহকর্মীদের অত্যন্ত সহযোগী ও প্রিয় । দু’একটি উদাহরণ দেয়া প্রয়োজন।

নুরুল আলম রিপন মানে রনজিতের এক জুনিয়র সহকর্মী ফেসবুকে লিখেছেন- “আমি যখন এসি ল্যান্ড, উনি আমার আরডিসি, একসাথে প্রায় দেড় বছর চাকুরী করেছি। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে উনার মতো সরলপ্রাণ মানুষ আমার ক্যাডারে খুব বেশি পাইনি। আজ নিজ চোখে উনার লাশ দেখলাম। বিশ্বাস করাও কঠিন কী কষ্টে মৃত্যু হয়েছে এমন ভাল একজন মানুষের! এটাই কি বিধির লিখন? আমার শোক জানানোর ভাষা জানা নেই। স্রষ্টা উনার আত্মাকে শান্তিতে রাখুন। স্যারের সন্তানদের জন্য দোয়া রইল”।  প্রশান্ত কুমার সরকার নামের অন্য একজন লিখেছেন- “He was really a great man. We have some very good memories with Ranjit Dada. He was such a man who used to help people whenever he got any scope. One day my wife was requesting a banker for the transfer of my sister-in-law. Ranjit Da overheard it. Even we were not at all acquainted with him at that time. Dada took the paper and next day he went to the Ministry and arranged the transfer of my sister-in-law. Dada was such a man who never helped people for getting any return. Last night, my wife started crying in her dream. I woke her up and she said that in her dream she saw her father lying dead. The whole day we passed in a remorse mood. Suddenly, we heard the news of Dada’s death. My wife started crying as if her own brother had died. I shed tears too. We hurriedly went to the colony building number 71. Boudi had already left. As a follower of Hinduism, I believe in Geeta. We pray with tearful eyes for Ranjit Dada’s immortal soul. May he appear on earth times again or may God grant him eternal peace in Heaven. May God give Boudi the strength to bear this irrevocable loss. Our prayer for Ranjit dada. Om Shanti!”

সরকারের অতিরিক্ত সচিব ড. জ্ঞানেন্দ্র নাথ বিশ্বাস দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন- “কর্মক্ষেত্রে রনজিত আমার জুনিয়র হলেও, আমাদের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মত। পারিবারিকভাবে আমাদের মেলামেশা ও একে-অপরের বাসায় যাতায়াত ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। চাকুরির ক্যাডারে আমি সিনিয়র হলেও ওর কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার ছিল”। অন্যদিকে, ব্যাংকার সুরজিত সাহা এবং পরিমল বন্ধু বসাক বিশ্ববিদ্যিালয় জীবনে জগন্নাথ হলে রনজিতের রুমমেট, সহপাঠী এবং সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের মধ্যে অন্যতম দু’জন। প্রাণের বন্ধুকে হারিয়ে ওরা পাগলপ্রায়। আমি সন্ধ্যায় ফোন করলে ওরা কেউই আমার সাথে ঠিকভাবে কথা বলতে পারেনি, ফোনের ওপাশ থেকে ফোঁপানির শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এবং হলের সাবেক ভিপি অনুপম রায়ের কাছেই আমি প্রথম অপঘাতে রনজিতের মৃত্যুর খবর জানতে পারি। আমি অনুপমকে অনেকটা ধমকের সুরে বলি- “তোমার উচিত ছিল আগে নিশ্চিত হয়ে খবরটা আমাকে জানানো, ভালো করে খবর নিয়ে আমাকে ফোন করো”। অনুপম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন- “দাদা, আমি নিশ্চিত হয়েই এই চরম দুঃসবাদটা আপনাকে জানাচ্ছি”।  তারপরও আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। ফেসবুক থেকে রনজিতের ছবি বের করে অনুপমকে ইনবক্স করি। অন্যদিকে, অনুপম আমাদের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য বইয়ের তালিকায় ৪৮৭ নম্বর সদস্যের নাম ও ছবি দেখতে বললে আমার কাছে থাকা উক্ত বই খুলে তবেই কেবল বিশ্বাস করি ময়মনসিংহে ট্রেনে কেটে পড়ে যিনি মৃত্যুবরণ করেছেন তিনিই আমাদের প্রিয় রনজিত চন্দ্র সরকার।

শিক্ষাজীবন শেষে রনজিতের সাথে বহু বছর তেমন কোনও যোগাযোগই ছিল না আমার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ হলে রনজিত আমার থেকে ৩-৪ বছরের জুনিয়র ছিলেন। ’৭৫ সালের পর দেশের কঠিন সময়ে আমরা যখন সন্তর্পণে ছাত্র রাজনীতি করেছি, তখন রনজিত কোনও দলীয় পদে না থেকেও ছায়ার মত আমাদের পাশে থেকেছেন, সহায়তা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার প্রায় দেড় যুগ পর ২০০০ সালে জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হওয়ার পর আবার অন্যান্যরাসহ রনজিতের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। সাধারণত, নানাবিধ কারণে সরকারি কর্মকর্তাদেরকে সামাজিক সংগঠনে একটু কম উপস্থিতি ও সবর থাকতে দেখা যায়। তবে এসব ক্ষেত্রে রনজিত ছিলেন অন্যদের তুলনায় একেবারেই ব্যতিক্রম। আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে বিভিন্ন পর্যায়ের সভা-সমাবেশসহ প্রতিটি কর্মকাণ্ডেই ছিল রনজিতের সক্রিয় অংশগ্রহণ। আর তিনি এতোটাই বিনয়ী ছিলেন যে, তার চেয়ে বয়সে সিনিয়র কেউ সভা কক্ষে তার পরে ঢুকলে প্রথমেই যে মানুষটি বড় ভাইয়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে আসন ছেড়ে দিতেন  তিনি আর কেউ নন, আমাদের প্রিয় রনজিত। একদিনের একটু ভিন্ন ধরণের একটা ঘটনার কথা না বলে পারছি না। গত জুন মাসের কোনও একদিনের ঘটনা। আমার এক পরিচিত ভদ্রলোকের হঠাৎ করে সচিবালয়ে জরুরি কাজে প্রবেশের প্রয়োজন। আমাকে একটা গেটপাশ জোগাড় করে দেয়ার অনুরোধ জানালেন তিনি। সচিবালয়ের দু’তিন জনকে ফোন করে সাড়া না পেয়ে রনজিতকে ফোন করি। ফোন ধরে কথা বললে বুঝতে পারছিলাম রনজিত কোনও একটা সভার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তারপরও তিনি পাশের ব্যবস্থা করে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিলেন। শুধু তাই নয়, সভাশেষে সেখান থেকে বের হয়েই আমাকে অনুনয়ের সুরে বললেন- “সরি দাদা অন্য মন্ত্রণালয়ে সভার কাজে ব্যস্ত ছিলাম, তাই ঠিক মত কথা বলতে পারিনি, কিছু মনে করবেন না, আপনার লোক গেটপাশ পেয়েছিলেন তো?” আমি হেসে বললাম- “দাদারে বুঝতে পেরেছিতো, হ্যাঁ, উনি গেটপাশ পেয়েছেন, ওনার অনেক উপকার হয়েছে, উনি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন”।

এই হচ্ছেন রনজিত চন্দ্র সরকার- যিনি আর কোনদিন আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন না। ভসরার একটি বড় স্থল হারিয়ে আমরা অনেকটাই রিক্ত হয়ে গেলাম। তবে সবচেয়ে বেশি বেদনা বিধুর ও অসহায়ত্মবোধ করছেন যারা, তাদেরকে কী বলে আমরা সমবেদনা জানবো সেই ভাষা আমাদের জানা নেই। রনজিতের প্রিয়মত সহধর্মিনী শ্রীমতী রীনা সরকার তার প্রাণপুরুষকে হারিয়ে এবং তাদের তিন সন্তান- সুস্মিতা, বিন্দু ও হৃদয় তাদের আদরের, ভালবাসার ও পরম শ্রদ্ধেয় পিতাকে অকালে হারিয়ে দুঃখের যে-অকূল সাগরে নিপতিত হয়েছেন, কোনও শান্তনাতেই তা ঘুচবার নয়। পরম করুণাময় তাদেরকে শোক বহনের শক্তিদান করুন- এই প্রার্থনা করছি। অকাল প্রয়াত রনজিত চন্দ্র সরকারের প্রতি সশ্রদ্ধ প্রণতি এবং তার বিদেহি আত্মার বৈকুণ্ঠলাভ কামনা করছি।