ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

ছবিটি গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শাহবাগ মোড় থেকে তোলা

 

শাহবাগ শুধু একটি নাম নয়। শাহবাগ নামক শব্দটি আন্দোলন সংগ্রামের সমার্থক শব্দ। যে কোনো প্রগতিশীল আন্দোলন, মুক্তির প্রশ্নে, অধিকার আদায়, বাকরুদ্ধ মানুষের বাক উদ্ধারের ভূমি। শাহবাগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এদেশের মুখপত্র বললে বেশি বলা হবে না। শাহবাগ হলো সাংস্কৃতিক রাজধানী। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষদের শ্বাস নেয়া দেয়ার মুক্তস্থান, বুক ভরে কথা বলা, আলোচনার প্রধানতম ভালো লাগার জায়গা।

কবি, সাহিত্যিক, প্রগতিশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পদচারণায় মুখরিত থাকে শাহবাগ। একজন রিকশাওয়ালা, একজন চা বিক্রেতা একটু জিরিয়ে নেয় এখানে।

কিন্তু শাহবাগ আর আমার প্রিয়তমার মতো নয়, এখন তা পুরোপুরি রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে। শাহবাগ এখন সাম্রাজ্যবাদীদের উর্বর ভূমি। প্রতিবাদী মানুষের শেষ আশ্রয় অথবা পান্থশালা আজ পুঁজিবাদীদের দখলে। শাহবাগ মোড়ের বিজ্ঞাপনবোর্ডের দিকে তাকালে প্রিয় কবি শঙ্খ ঘোষের ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’ কবিতাটি মনে পড়ে যায়।

প্রিয় শহরে এখন বিজ্ঞাপন আর বিজ্ঞাপন। সমস্ত পথজুড়ে বিজ্ঞাপন। শিক্ষার্থীদের হাঁটার জায়গায় বিজ্ঞাপন। চোখ ঝলসে যায়, আমার চোখের আলো নষ্ট হয়ে যায় অত্যধিক আলোর ঝলকানিতে। আমি আর তাকাতে পারি না।

একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসে এই দেশ কোন পথে এগুচ্ছে? এদেশের মানুষের বর্তমান অবস্থান কোথায়? কারা এই রাষ্ট্র সম্পদের ভোক্তা? এদেশে বৈষম্য ক্রমাগত উর্ধ্বগতির দিকে। ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে, গরীবরা আরও গরীব হচ্ছে তথা হতদরিদ্র হচ্ছে। শাহবাগ মোড়ের বিশাল বিজ্ঞাপনবোর্ডের দিকে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। ড. আকবর আলী খানের পরার্থপরতার অর্থনীতি বইয়ের ‘শুয়োরের বাচ্চাদের অর্থনীতি’ অধ্যায়ের সাথে এদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মিলে যায়। এদেশ কি শুধুই উচ্চবিত্তদের? যদি তাই হয় তবে এই দেশ জনগণের তা কি জোর দিয়ে বলা যায়?

দেশে টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা ৪১টি (ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত তথ্য), প্রিন্ট মিডিয়ার সংখ্যা অগুনিত, অনলাইন পোর্টালের সংখ্যা ব্যাঙের ছাতার মতো। একটি দরিদ্র দেশে এতগুলো টিভি চ্যানেল, অগুনিত সংবাদ মাধ্যম থাকা সত্ত্বেও গণমানুষের হাঁটার জায়গায় বিলবোর্ড কেন?

বিশ্বায়নের যুগে, অবাধ তথ্য প্রযুক্তির যুগে, সোশাল মিডিয়ার যুগে এসব বিজ্ঞাপনী সাইনবোর্ডের কি কোনো দরকার আছে? এসব বিজ্ঞাপনের অত্যাচারে জর্জরিত নগরের খেটে খাওয়া দিন মজুর। এ দেশের মানুষের নূন্যতম অধিকার আছে বলে তো মনে হয় না।

এখন ফুটপাতে ঘুমন্ত মানুষগুলোর মুখে বিজ্ঞাপনের দানবগুলো হাঁটে।  যদি এইসব সাইনবোর্ডগুলো মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হতো, মানুষ উপকৃত হতো তাহলে কোন সমস্যা থাকার কথা নয়, কিন্তু তা হচ্ছে কি? নিশ্চয়ই না। তাহলে একটি দরিদ্র দেশে এত অর্থের অপচয় কোন যুক্তিতে? কেন এত বিদ্যুতের অপচয়?

রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তিদের উচিৎ ছিল শহরের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে সাইনবোর্ডগুলোর বদলে সৌন্দর্যবর্ধক বৃক্ষরোপন করা। ফুলের বাগান করা।

এখন বিজ্ঞাপনের আলোয় শহরকে দেখায় ম্রিয়মান ও মৃত। এটি সৌন্দর্যবর্ধনের নামে বুর্জোয়াদের ফাঁদপ্রকল্প ছাড়া আর কিছুই নয়।

শুধু একটাই প্রত্যাশা, প্রিয়তমার মতো শাহবাগ বুর্জোয়াদের ফাঁদ প্রকল্প থেকে মুক্তি পাক। শাহবাগ ফিরে পাক তার যৌবন, শাহবাগ ফিরে যাক আন্দোলন সংগ্রাম, গণমানুষের কাছে। শাহাবাগ ভরে ওঠুক সুশোভিত পত্রপল্লবে, ফুলে ফুলে।