ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, রাজনীতি

চমক এবং ইতিহাস সৃষ্টির মধ্য দিয়ে শেষ হলো বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতের ষোড়শ লোকসভা নির্বাচন। ভারতের মত ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফলে কোন না কোন কারণে চমক থাকতেই পারে কিন্তু এবারের চমকটা পুরো মাত্রায় ঐতিহাসিক। চমকটা এতটাই তীব্র হয়েছে যে, পুরো বিশ্বটাই যেন এখন ভারতবর্ষ! ১৬ মে’র পরে বিশ্বের যে অঞ্চলেই দৃষ্টি দেওয়া হোক না কেন সব স্থানেই আলোচনার বিষয়বস্তু একটিই– ভারতের লোকসভা নির্বাচন ও সদ্যজাত ভারত-নায়ক নরেন্দ্র মোদী’র উত্থান।

ভারতের জনগণের মনোভাব ও রাজনীতিক বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস থেকে নির্বাচনের অনেক আগেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, ভারতের ঐতিহ্যবাহী অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল জাতীয় কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের শাসনাবসান হতে যাচ্ছে। সেই সাথে বদলী শাসক হিসেবে উত্থান ঘটতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি নামক কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দলের। কিন্তু বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক দল কংগ্রেসের পরাজয়টা যে এতটা করুণ হবে তা হয়তো কেউই অনুমান করতে পারেনি। ফলে ১৬ মে যখন লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হলো তখন সে বিজয় শুধু বিজেপি’র রইলো না, রূপ নিল নরেন্দ্রনাথ দমোদার মোদী নামক এমন এক ব্যক্তির বিজয়ে যিনি চরম সাম্প্রদায়িক এবং মুসলিম বিদ্বেষী হিসেবে সাড়া বিশ্বে নিন্দিত এবং ক্ষেত্র বিশেষে ধিকৃত। কারণ ২০০২ সালে নরেন্দ্র মোদী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকা অবস্থায় সৃষ্ট দাঙ্গায় দুই সহস্রাধিক মুসলামানকে নৃসংশভাবে খুন হতে হয়েছিল কিন্তু তিনি এই মানবতা বিরোধী ঘটনার জন্য কখনই অনুতপ্ত হননি। ফলে ভারতসহ পুরো বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে, ঐ দাঙ্গার পেছনে তার ইন্ধন ছিল। শুধু তাই নয়, ১৬তম লোকসভা নির্বাচনের আগে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, তার গাড়ির নিচে একটি কুকুর পড়লে তিনি যতটুকু ব্যথিত হবেন একজন মুসলমান পড়লে ততটুকু ব্যথিত হবেন না। অথচ এই ব্যক্তিই এখন বিপুল ভোটে বিজয়ী ভারতের প্রধানমন্ত্রী। বিশ্ব মিডিয়া এ বিজয়কে আখ্যায়িত করেছে ‘মোদী ঝড়’ হিসেবে।

মোদী’র এ বিজয় সত্যিই একটি ঝড়। এ ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে অনেক কিছু। বিশেষ করে, ভারতীয় জনগণের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতি বিশ্ববাসীর গভীর আস্থা। ভারতবাসীর প্রতি বিশ্ববাসীর এ আস্থা একদিনে নয়, গড়ে উঠেছিল দীর্ঘদিন ধরে। মূলত এ কারণেই নরেন্দ্র মোদীর মত চরম সাম্প্রদায়িক ও মুসলিম বিদ্বেষী একজন ব্যক্তি এত বিপুল জনসমর্থন নিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারেন ১৬ মে’র আগে তা সত্যিকার অর্থেই কারো ভাবনায় ছিল না। কিন্তু তারপরও এ বিজয়কে বিশ্ববাসী মেনে নিয়েছে। কারণ এ বিজয় একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতেই হয়েছে এবং এ বিজয় কোটি কোটি ভারতীয় নাগরিকের সচেতন সমর্থনেই সম্পন্ন হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মোদীর এই চমকপ্রদ বিজয়কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যুক্তি দিয়েছেন, এটা মোদী’র বিজয় নয়, এটা দুর্নীতি ও দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ কংগ্রেসের পরাজয়। অর্থাৎ ভারতের জনগণ মোদীকে ভোট দেয়নি, ভোট দিয়েছে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। এই যুক্তি হয়তো মিথ্যা নয়।

মোদী’র বিজয়ের পরপরই বিশ্ব রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। যেসব পশ্চিমা রাষ্ট্র এতদিন মোদী-বিরোধী ছিল সেগুলোও ভারতের নির্বাচিত নেতা হিসেবে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়া ও পরিবর্তন স্বাভাবিক। কারণ মোদী নন, অভিনন্দিত হয়েছেন বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচিত সরকার প্রধান। কিন্তু নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ভারতের হবু প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাতে গিয়ে আমাদের দেশের দুই শীর্ষ নেত্রী যা করেছেন তা একদিকে হাস্যকর এবং অপরদিকে অশোভন।

বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ১৭ মে দিনের শুরুতেই বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে মোদীকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয় ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তাদের হাতে। বেগম খালেদা জিয়ার পরপরই নরেন্দ্র মোদীকে টেলিফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে একটি চিঠিও পাঠানো হয়েছে তার পক্ষ থেকে। টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে চাননি বেগম খালেদা জিয়াও। তিনিও  ফোনে কথা বলেছেন নরেন্দ্র মোদীর সাথে। চিঠি আর ফোনালাপ প্রতিযোগিতার পর জানা গেল, আগামী মাসেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে মোদীর সাথে সাক্ষাতের জন্য দুটি টিম যাচ্ছে ভারতে, যার একটির নেতৃত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী।

কোন দেশের নবনির্বাচিত রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানকে অন্যদেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান অভিনন্দন জানাবেন এটাই আন্তর্জাতিক রীতি ও সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির মধ্যে বিরোধী দলের নেতাও পড়েন। (তবে বিশেষ কারণে এর ব্যত্যয় হতে পারে। যেমন, গত ৫ জানুয়ারির বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের পর ভারত, রাশিয়া ও একটু বিলম্বে চীন ছাড়া আর কোন রাষ্ট্র শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিনন্দন জানায়নি।) কিন্তু বেগম খালেদা যেহেতু এখন কোন রাষ্ট্রীয় পদেই নেই, তাই নরেন্দ্র মোদীকে তার এই চটজলদি অভিনন্দন জানানোর ঘটনা কারোরই দৃষ্টি এড়ায়নি। ফলে এ নিয়ে দেশের বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে বেশ রসালোভাবেই, লেখালেখিও হচ্ছে বিস্তর। অনেকেই বলতে চাচ্ছেন, বিজেপি ও বিএনপি দুটোই সাম্প্রদায়িক শক্তি। তাই ভারতে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিজয়ে উৎফুল্ল হয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া ও তার বিএনপি। মোদীর বিজয়ে বিএনপি উৎফুল্ল এটা স্পষ্ট তবে এর কারণ সাম্প্রদায়িকতা কিনা তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। অপরদিকে, শেখ হাসিনার প্রতিযোগিতাপ্রবণ তৎপরতাও সমালোচকদের দৃষ্টি এড়ায়নি। অর্থাৎ বিষয়টা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, কে আগে নরেনন্দ্র মোদীকে খুশি করে তার আস্থা অর্জন করবেন এ যেন তারই প্রতিযোগিতা। কিন্তু এ প্রতিযোগিতা কেন?

এ প্রতিযোগিতা যে কেন তা এদেশের চা স্টলের সভ্যগণ ও রাজনীতি বিশ্লেষকরা আগেই অনুমান করতে পেরেছিলেন। ভারতের নির্বাচন চলাকালীন এদেশের জনতার মুখ থেকে প্রায়ই একটি প্রশ্ন শুনা যেত– মোদীর বিজয়ে বিএনপি কি লাভবান হবে? এর জবাবটাও মিলতো তাদের কাছ থেকেই। অনেকেই বলতো, বিএনপির লাভ হবে কিনা তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে, তবে আওয়ামী লীগের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। জনতার এই ধারণার প্রতিফলন দেখা গেছে নির্বাচনের পর দেশের শীর্ষ একটি দৈনিকের দুটি শিরোণামে। ১৭ মে প্রত্রিকাটির অনলাইন সংস্করণে দুটি শিরোণাম ছিল: ‘কংগ্রেসের ভরাডুবিতে আওয়ামী লীগে অস্বস্তি’ এবং ‘বিজেপির বিজয়ে বিএনপিতে উচ্ছ্বাস’। কেন এই অস্বস্তি ও কেন এই উচ্ছ্বাস!

এই কেন’র জবাব লজ্জাজনক। ঐতিহাসিকভাবেই আওয়ামী লীগের সাথে ভারতীয় কংগ্রেসের সংম্পর্ক দারুণ এক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে। এই দুই দলের লেনদেন বৈষম্যমূলক হলেও দৃঢ় আস্থার সম্পর্কে তারা আবদ্ধ। যার প্রমাণ পাওয়া গেছে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের প্রতি কংগ্রেস সরকারের অন্ধ ও রীতিবিরুদ্ধ সমর্থন থেকে। অর্থাৎ ভোটারবিহীন একটি নির্বাচন করে ক্ষমতায় এসেও আওয়ামী লীগ যে দোর্দন্ড প্রতাপে দেশ শাসন করছে তার অন্যতম একটি কারণ হলো কংগ্রেস সরকারের প্রত্যক্ষ সমর্থন ও সহযোগিতা। ফলে বিজেপির উত্থানে দলটি হয়তো ভাবছে, মোদী সরকারের কাছ থেকে একই মাত্রার সমর্থন নাও পাওয়া যেতে পারে। অপরদিকে, বিএনপির উচ্ছ্বাসের কারণ এর ঠিক বিপরীত। অর্থাৎ বিএনপি ভাবছে মোদী সরকারের সমর্থন না থাকলে আওয়ামী লীগকে নির্বাচন দিতে বাধ্য করা সহজ হবে এবং এর মধ্য দিয়ে তার ক্ষমতায় আসার পথ আরো মসৃণ হবে। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি যাই ভাবুক না কেন, নরেনন্দ্র মোদী কিংবা বিজেপি কি তাই ভাবছে! বাস্তবতা তা বলে না। মোদী বাবু বাংলাদেশের কাউকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে বা ক্ষমতায় বসিয়ে দিতে কাজ করবেন বলে মনে হয় না। দিল্লির মসনদে যেই থাকুক না কেন, বাংলাদেশের প্রতি তাদের নীতির বড় কোন পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না। বিজেপি সরকারের সাথে বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগের বন্ধুত্ব জোড়ালো হতে পারে, কিন্তু প্রাপ্তির বেলায় বাংলাদেশকে গত ৪৩ বছরের অভিজ্ঞতাই মেনে নিতে হবে। আমরা শুধু ভারতকে দিয়েই যাব কিন্তু নেবার বেলায় মুখ বন্ধ করে ‘বন্ধু’ ও প্রতিবেশি এই রাষ্ট্রের সম্মান রক্ষা করেই চলতে হবে। অর্থাৎ গঙ্গা ও তিস্তার পানির জন্য আমাদের হাহাকার চলতেই থাকবে, কাঁটাতারের এপার-ওপারে নিরিহ বাংলাদেশিদের রক্ত ঝরতেই থাকবে আর আমাদের নেতা-নেত্রীরা এসব ইস্যু বাদ দিয়ে দেন-দরবার করবেন ক্ষমতায় টিকে থাকা কিংবা ক্ষমতায় যাবার প্রার্থনা নিয়ে।

তাই শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে, নিজেদের ক্ষমতার স্বার্থে তারা যেন এদেশের জনগণকে অন্য রাষ্ট্রের প্রজায় পরিণত না করেন। একজন নরেনন্দ্র মোদীকে তুষ্ট করার জন্য তারা ইতোমধ্যে যে উপায় অবলম্বন করেছেন তা এই স্বাধীন জাতিকে চরমভাবে অপমানিত করেছে। ভারতের সাথে আমাদের সুসম্পর্ক প্রয়োজন আছে তবে তা শুধুমাত্র দেশ ও জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে, এর বিনিময়ে নয়।  কারণ পাকিস্তানের শাসকেরা তাদের ক্ষমতার স্বার্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তুষ্ট করে করে এখন যে খেসারত দিচ্ছে আমরা সেই খেসারত দিতে রাজি নই। তাই আপনারা জনগণের উপর আস্থা রাখুন, শেষতক নিজ জনগণই আপনাদের ক্ষমতার উৎস হবে– কংগ্রেস কিংবা বিজেপি নয়।