ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, রাজনীতি

১.
এই লেখাটি যখন লিখছি তখন তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশ পৌঁছেছেন ভারতের নয়া সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রীসভায় ঠাঁই পাবার পর এটাই তার প্রথম একক বিদেশ সফর। আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে প্রথম একক বিদেশ সফরের জন্য সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছেন, এটা তার জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি বাংলাদেশের জন্য তো বটেই। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা গেছে, তিস্তা ও ফেনি নদীর পানি বন্টন এবং স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সুষমা স্বরাজ আলোচনা করবেন বাংলাদেশের সরকারের সাথে।

সুষমা স্বরাজের বাংলাদেশ সফর শুরু হবার আগে থেকেই শুনা যাচ্ছিল বাংলাদেশের প্রদানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিশেষ বার্তা পৌঁছে দেবার জন্যই মূলত তার এই বাংলাদেশ সফর। ফলে গণমাধ্যম ও রাজনীতি পর্যবেক্ষকদের কাছে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরটি বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করেছে। কী সে বার্তা! এটা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশে পৌঁছেই বলেছেন, ‘বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে এসেছি’। এমন মন্তব্য সত্যিই স্বস্তিদায়ক ও প্রত্যাশিত। তবে লজ্জার কথা, ভারতের মত প্রতিবেশি ও ‘বন্ধ’ু রাষ্ট্রকে বারবারই বন্ধুত্বের প্রতিশ্র“তি দিতে হয়! স্মরণ করিয়ে দিতে হয়- ভারত বাংলাদেশের বন্ধু। অর্থাৎ বাংলাদেশীদের প্রত্যাশা ও সুষমা’র মন্তব্যের প্রেক্ষিতে বলা যায়, ভারত-বাংলাদেশের ‘বন্ধুত্বের’ সম্পর্ক সন্দেহাতীত নয়।

তবুও খুশির কথা নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য দিলেও তার সরকার বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়। শুধু মোদী সরকার কেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ভারতের সব সরকারই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চেয়েছে। তবে আগেই বলেছি, ভারত সরকারের প্রতিটি প্রতিনিধিকেই সবাক হয়ে জানিয়ে দিতে হয়েছে যে তারা আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র। কারণ গত তিতাল্লিশ বছরে বাংলাদেশের জনগণ ভারতের বন্ধুত্ব খুব কমই অনুভব করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি, স্থলসীমান্ত বিরোধ, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ঘাটতি, গঙ্গা-তিস্তা-ফেনি নদীর পানি বন্টন, চোরাচালানসহ কোন সংকট বা সমস্যারই আজ পর্যন্ত সুরহা হয়নি। বাংলাদেশের ন্যায্য প্রাপ্যগুলো বন্ধু রাষ্ট্রে আজ অবধি প্রক্রিয়াধীনই রয়েছে! যদিও এই একই সময়ে ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে প্রাপ্তির দিক থেকে মোটেও বঞ্চিত হয়নি। বিশেষকরে সদ্য বিদায়ী কংগ্রেস সরকারের আমলে স্থল ও নৌ ট্রানজিটসহ চাহিদার ষোল আনাই আদায় করে নিয়েছে দেশটি। আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে কংগ্রেস সরকারের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বাইরেও সুসম্পর্ক থাকা সত্বেও বাংলাদেশের প্রাপ্তি অত্যন্ত নগন্য। গত মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘শতভাগ সফল’ ভারত সফরের পরও বাংলাদেশের প্রাপ্তির এই হিসেবে তেমন কোন পরিবর্তন ঘটেনি।

তবে সুষমা স্বরাজ যতই বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে আসুন না কেন, তিনি যে ভারত সরকারের একটি চাহিদাপত্রও সাথে নিয়ে এসেছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বলতে দ্বিধা নেই, অতীতের মত বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারের এবারের চাহিদাগুলোকেও পূরণ করতে প্রস্তুত রয়েছে। কারণ কংগ্রেস সরকারের পরাজয়ের পর মোদী সরকারের সমর্থন বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রেসটিজ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। দৃশ্যত, মোদী সরকারের সমর্থন পাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্ভাব্য সবকিছু করতেই প্রস্তুত রয়েছেন।

এরই প্রমাণ হিসেবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম বৈঠকেই ভারতকে বিনা চার্জে ১০ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য শস্য ত্রিপুরায় নেবার সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। অর্থাৎ সফরের শুরুতেই ভারতের প্রাপ্তির তালিকা দীর্ঘ হতে শুরু করেছে যদিও বাংলাদেশ কী পেল তা এখনো স্পষ্ট নয়। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সংবাদসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের অব্যবহৃত ইন্টারনেট ব্যান্ডউয়িথ ভারতের সেভেন সিসটার্স রাজ্যগুলোতে রপ্তানি করার প্রস্তাবও সুষমা স্বরাজ এই সফরকালে বাংলাদেশ সরকারকে দেবেন। বিষয়টি ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের আইটি জগতে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। বাংলাদেশকে যখন ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে’ রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং ইন্টারনেট সেবার চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে তখন ভারত সরকারের এমন প্রস্তাবে সাড়া দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশের আইটি বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ সরকার এমন প্রস্তাবে সাড়া দেবে কি দেবে না তা জানার জন্য হয়তো অপেক্ষা করতে হবে তবে যুক্তিসংগত কারণেই ইস্যুটি সংশ্লিষ্টদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ফলে দাবি উঠেছে এই প্রস্তাবে সাড়া না দেবার।

২.
ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এবারের সফরকে বলা হচ্ছে শুভেচ্ছা সফর। এই সফরে ‘বন্ধুত্বের বার্তা’ বয়ে আনার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত সফরের বিশেষ আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করে যত দ্রুত সম্ভব ভারত সফর করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আমরাও আশাকরি তিনি স্বল্প সময়ের মধ্যেই ভারত সফর করবেন। কারণ দুটি প্রতিবেশি রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে এ ধরনের সফরের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে সেটা আরো পরের কথা। কিন্তু সুষমা স্বরাজের এই সফরে জাতির পক্ষ থেকে ভারত সরকারকে কী বার্তা দিয়ে দেবেন প্রধানমন্ত্রী?

তিনি কি বলবেন, বাংলাদেশেও ভারতে বন্ধু-রাষ্ট্র? বলবেন হয়তো, বলাটা সৌজন্যতা। কিন্তু এই একই কথা আমাদের আর কতবার বলতে হবে! প্রধানমন্ত্রী কী সুষমা স্বরাজকে বলতে পারবেন, আর কত চাহিদা পূরণ করলে ভারত বাংলাদেশের ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ হবে! সুষমা স্বরাজ জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়নে পাশে থাকবে ভারত’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি জিজ্ঞেস করতে পারবেন, ভারতকে বাংলাদেশের উন্নয়নের পাশে পেতে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে? ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি, স্থলসীমান্ত চুক্তি, গঙ্গা-তিস্তা-ফেনি নদীর পানি বন্টন চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য তিনি কি পারবেন সময় বেধে দিয়ে ভারতের প্রধান মন্ত্রীর কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে? কিংবা তিনি কি মোদীকে জানিয়ে দিতে পারবেন, বাংলাদেশ আর কোন সীমান্ত হত্যা সহ্য করবে না। নাকি তিনি শুধু বৈধতার সংকটে থাকা তার সরকারের জন্য মোদী সরকারের কাছে বৈধতার সনদপত্র দাবি করেই ক্ষান্ত হবেন। কিংবা তিনি কি শুধু এটুকু ভেবেইে তৃপ্ত হবেন যে ‘সুষমা আসায় বিএনপির মুখে চুনকালি পড়েছে যেমনটা তার খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছেন? আমরা এ সবকিছু দেখার অপেক্ষায় রইলাম।