ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

images2

পূর্ব ধারণা অনুযায়ী নতুন বছরের পহেলা সপ্তাহ থেকেই চলছে সংসদের বাইরের বিরোধীদল বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের টানা অবরোধ। বিএনপি বাংলাদেশের একটি স্বীকৃত ও কয়েক দফায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল। সে অর্থে এ দলের গৃহীত কর্মসূচীর মধ্যে রাজনৈতিক চরিত্র অটুট থাকবে, সাধারণভাবে এই বোধটাই গণমানুষের মনে কাজ করে। সেই বোধের জায়গা থেকেই বিএনপি ঘোষিত অবরোধের চিত্র কেমন হতে পারে তা আগে থেকেই সাধারণ মানুষের মনে অঙ্কিত ছিল। ২০১৩-১৪ সালের তিক্ত অভিজ্ঞতা সত্বেও মানুষ অনুমান করেছিল এবারের অবরোধে যানবাহন চলাচল বিঘিœত হবে, অর্থনীতির চাকা থেমে থেমে চলবে, দ্রব্যমূল্য আরেক দফা বৃদ্ধি পাবে এবং সর্বোপরি স্বাভাবিক জনজীবনে এক প্রকার স্থবিরতা দেখা দেবে। কিন্তু আগুন, দহন ও আর্তনাদ মানুষের সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেছে। ফলে অবরোধ নামক একটি রাজনৈতিক কর্মসূচীর আড়ালে সারা দেশে নির্মমতার যে মহড়া চলছে তাতে মানুষের মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে, এই অবরোধ আদোতে কোন রাজনৈতিক কর্মসূচী কিনা! পেট্রল বোমার আগুনে দগ্ধ নারী-পুরুষ ও শিশুদের বুকফাটা চিৎকার এই ‘রাজনৈতিক’ অবরোধকে সত্যিকার অর্থেই অবর্ণনীয় করে তুলেছে। অবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মানুষ এখন আর স্বাভাবিক জীবনের ছন্দপতন কিংবা অর্থনৈতিক স্থবিরতা নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়, তারা উদ্বিগ্ন তাদের অমূল্য জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী চলমান অবরোধ শুরু হবার পর থেকে এ পর্যন্ত সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ৩০ জন। দুঃখজনক হলেও সত্য, এদের মধ্যে অন্তত ২৫ জনেরই কোন রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না। অর্থাৎ অবরোধ নামক কথিত রাজনৈতিক কর্মসূচীর কারণে প্রাণ দিতে হচ্ছে অরাজনৈতিক নাগরিকদের! অবরোধের এই চরিত্র যদি অব্যাহত থাকে তবে আমাদের আশংঙ্কা, এই নির্মমতা ও প্রাণহানীর ঘটনা আরো বৃদ্ধি পাবে। দেশের শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষের কাছে তেমন কোন পরিস্থিতি কোন যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্যতা পাবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস। চলমান সহিংসতায় প্রাণহানীর ঘটনার পাশাপাশি এ পর্যন্ত আগুন দেয়া হয়েছে প্রায় ২৮০টি যানবাহনে, ভাঙ্গচুর হয়েছে শতাধিক। অথচ পুড়ে যাওয়া গাড়িগুলো অবরোধকারীদের জন্য ভাল জ্বালানি হলেও এগুলোই ছিল অসংখ্য পরিবারের রুটি-রুজির অবলম্বন! ঢাকা চেম্বারের তথ্য অনুযায়ী, একদিনের হরতাল বা অবরোধে আর্থিক ক্ষতি হয় দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই হিসেব অনুযায়ী এ পর্যন্ত দেশের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা! এই অংক বহু কাক্সক্ষীত পদ্মাসেতু নির্মান ব্যয়ের চেয়েও অনেক বেশি। অবরোধ আর কতদিন চলবে তা বোধকরি কারোরি জানা নেই, কিন্তু দেশের অর্থনীতি যে পঙ্গুত্ব বরণ করতে যাচ্ছে তাতেও কোন সন্দেহ নেই।

সাধারণ মানুষ রাজনীতি কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচীর নামে এই নির্মমতা, সহিংসতা ও বিবেকহীনতার অবসান চায়। তারা রাজনীতি অর্থে স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিকেই দেখতে চায়। তবে তার মানে এই নয় যে, বিএনপি কিংবা বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলোর দাবির কোন ন্যায্যতা নেই। পাশাপাশি, ‘দেশে কোন রাজনৈতিক সংকট নেই’ বলে সরকারের মুখপাত্ররা যে কথা বলে বেড়াচ্ছেন তাও গ্রহণযোগ্য নয়। দেশে এই মুহূর্তে পুরো মাত্রায় রাজনৈতিক সংকট বিরাজ করছে। আর এই সংকটের সমাধানটাও রয়ে গেছে রাজনীতির মধ্যে, রাজনীতিবিদদের হাতে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনের আগে থেকেই দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার অধীনে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দাবি করে আসছিল। বিএনপির সেই দাবি এখনও আছে, কারণ দলটি মনে করছে সংবিধান সংশোধন করে দলীয় সরকার অর্থাৎ আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনের যে সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে তাতে বিরোধী পক্ষের জয় লাভের সম্ভাবনা অনেকাংশেই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। গণতন্ত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার চেয়ে নিয়মিত-সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়াটাই সমীচীন। কিন্তু দেশের বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দলের কোনটিই নির্বাচন ইস্যুতে নিরপেক্ষতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। তাছাড়া তাদের আচার-আচরণও ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে না। অর্থাৎ বিএনপি ও তার মিত্রদলগুলোর এই ধারণা পারস্পারিক বিশ্বাসহীনতা ও অতীত অভিজ্ঞতার ফসল, যা চলমান পরিস্থিতিতে কোন মতেই দূর হবে বলে মনে হয় না। শুধু বিএনপি ও তার মিত্ররাই নয়, দেশের নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশও মনে করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার মত আস্থার পরিবেশ এখনও দেশে সৃষ্টি হয়নি।

নির্বাচনে বিরোধী পক্ষকেই জিততে হবে– সে কথা বলছি না। তবে ক্ষমতার বাইরে থাকা কোন দল বা জোট যদি বিশ্বাস করে যে দলীয় সরকারের পক্ষপাতদুষ্টতার কারণে বিজয়ের সুযোগ নেই তবে নির্বাচন বর্জন বা আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া তাদের আর তেমন কিছুই করার থাকে না। গত বছরের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত বিএনপির জন্য সঠিক ছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে, তবে মূলত উপর্যুক্ত কারণেই দলটির পক্ষ থেকে নির্বাচন বর্জনের ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচন বর্জনের নজির শুধু বিএনপির ঝুলিতেই নয়, আওয়ামী লীগেরও ঝুলিতেও আছে। দলীয় সরকার অর্থাৎ বিএনপি’র অধীনে নির্বাচন হলে জয়ের সম্ভাবনা নেই জেনেই আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির জন্য নব্বই এর দশকে সহিংস আন্দোলন গড়ে তুলেছিল আর ২০০৭ সালে দলটির আকস্মিক নির্বাচন বর্জনের ফল¯্রুতিতেই মূলত এক-এগারোর সূত্রপাত ঘটে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এই পর্যায়ক্রমিক নির্বাচন বর্জনের অজুহাত মূলত অভিন্ন– বিশ্বাসহীনতা ও জয়ী না হবার শঙ্কা।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরিপক্ক হবার আগেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পঁচন ধরে গেছে। আর এই পঁচনটিই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট এবং সেই সাথে আনুসাঙ্গিক সব রাজনৈতিক সংকটের নিয়ামক। মূলত এই কারণেই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বর্তমান সরকারকে চলমান ঘটনা প্রবাহকে একটি গুরুতর ‘রাজনৈতিক সংকট’ হিসেবেই স্বীকার করে নিতে হবে। সরকার তথা আওয়ামী লীগকে এটাও বুঝতে হবে যে দেশে রাজনীতি করার অধিকার তার যেমন রয়েছে তেমনি বিএনপিরও রয়েছে। বিএনপি কোন অবৈধ রাজনৈতিক দল নয়, সভা-সমাবেশ কিংবা মিছিল করার অধিকার তার আছে। বিরোধী জোটের সমাবেশ করার অধিকার কেড়ে নিয়ে, শীর্ষ নেতানেত্রীদের অবরুদ্ধ কিংবা গ্রেফতার করে সরকারী দলের জন্য সাময়িক রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলেও তা মূলত উদ্ভুত সংকটকে আরো প্রকট করে তুলবে।

কোন সরকারই ক্ষমতাচ্যুত হতে চায় না। আওয়ামী লীগও চাইবে না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন আর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন একই মুদ্রার এপীঠ-ওপীঠ। এই দুই নির্বাচনের কোনটিরই সার্বজনীন বৈধতা নেই এবং এই দুই নির্বাচন গণতন্ত্রের পঙ্গুত্ব বৃদ্ধি করা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেনি। এ বছরের ৩ জানুয়ারি বেগম খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ না করলেও বিএনপি আন্দোলনের কর্মসূচী দিতো। সে আন্দোলনের সীমা হত বড়জোর কয়েকটি সমাবেশ ও হরতাল। কিন্তু আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য বেগম জিয়াকে অবরুদ্ধ করে, সভা-সমাবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সরকার নিজেই বিএনপি’র লাগাতার আন্দোলনকে উস্কে দিয়েছে, অনেকাংশে যৌক্তিক করে তুলেছে। ফলস্বরূপ খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো জাতিকে। রাজধানী ঢাকা কার্যত পুরো দেশ থেকে আজ বিচ্ছিন্ন, জনজীবন বিপর্যস্থ, অর্থনীতির চাঁকা স্থবির, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই, সর্বোপরি সর্বত্রই আতঙ্ক। খেটে খাওয়া মানুষ, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং এমনকি অবুঝ শিশুরা পর্যন্ত পেট্রল বোমার আগুনে ঝলসে যাচ্ছে। বিএনপি বলছে এর দায় তাদের নয়, এসবই সরকারের কাজ। আর সরকার বলছে, ‘সন্ত্রাসী দল’ বিএনপিই মানুষের জীবন নিয়ে তামাসায় লিপ্ত। তবে সাধারণ মানুষের কাছে কোন পক্ষের বক্তব্যেরই কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই। তারা মনে করে, আন্দোলন বিএনপির, তাই দায়দায়িত্বও তার। আর সরকারের দায়িত্ব জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা দেওয়া, দেশকে সংকটমুক্ত রাখা। সরকার সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে।

সরকার সহিংসতা বন্ধের জন্য কঠোর হচ্ছে, পুলিশ-বিজিবি ব্যবহার করছে। এই উদ্যোগ সমর্থনযোগ্য। কিন্তু সহিংসতা দমনের নামে যদি রাজনৈতিক সংকটকে আরো প্রকট করা হয় তবে সসস্ত্র প্রশাসন দিয়ে শেষতক কোন সফলতা মিলবে না। সরকারকে মনে রাখতে হবে, ‘অলআউট মিশনে’ প্রতিপক্ষের ছক্কা মারার সম্ভাবনাও থাকে। তাই সরকারকে একদিকে সহিংসতা দমন করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং একই সাথে রাজনৈতিক সমাধানের পথেও হাটতে হবে। কারণ দেশের মানুষ বিশ্বাস করে, চলমান নির্মম সহিংসতা রাজনৈতিক কারণে ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোরই সৃষ্টি।

সরকারের কাছে আমাদের দাবি, দুর্বৃত্তদের দমন করুণ এবং বিএনপির সাথে আলোচনারও উদ্যোগ নিন। জেদ ও সুপেরিয়রিটি কমপ্লেক্স থেকে মুক্ত হয়ে শান্তির পথে হাঁটলে জনগণ পাশে থাকবে। একথা ভুলে গেলে চলবে না যে বাংলাদেশের রাজনীতির আলোচনার টেবিলে একপাশের চেয়ার যদি আওয়ামী লীগের হয় তবে অপর পাশের চেয়ারটা এখন পর্যন্ত বিএনপিরই। কোন গৃহপালিত, মোসাহেবি দলের জন্য নয়। একই সাথে বিএনপি, বিশেষ করে বেগম জিয়ার প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, নাশকতার দায় সরকারের উপর না চাপিয়ে প্রথমে নিজ দলের কর্মীদের সংযত হবার নির্দেশ দিন। গঠনমূলক ও পরিবর্তনকামী আন্দোলন করুণ। কারণ জনগণ যে আন্দোলনে পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখে না সে আন্দোলনে তাদের সমর্থনও থাকে না। জনগণ চায় না, লক্ষ্যহীন কোন আন্দোলনে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত হয়ে যাক, দিনমজুরেরা কপর্দকহীন বসে থাক। দেশের মানুষ আর কোন দগ্ধ শিশুর আর্তচিৎকার শুনতে চায় না।