ক্যাটেগরিঃ bdnews24

ঢাকা, ডিসেম্বর ৩১ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- মুসা ইব্রাহীমের হাত ধরে ২০১০ সালেই হিমালয়চূড়ায় লাল-সবুজ পতাকা উড়লো। সোনালি আঁশ পাটের জন্মরহস্য উন্মোচনও হলো বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর হাত ধরে। প্রণীত হয়েছে শিক্ষানীতি। এ সব ইতিবাচক খবর। বছরের শেষ ভাগে এসে নেতিবাচক খবর শুনিয়েছে পুঁজিবাজার। একই সময়ে তহবিল সরানো নিয়ে সমালোচনায় পড়লেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

এ বছরে বিভিন্ন অঙ্গনে বাংলাদেশের আলোচিত ঘটনাগুলোর ওপর চোখ বোলানো যাক।

হিমালয়চূড়ায় মূসা
গত ২৩ মে- বছরের মাঝামাঝির এই দিনটি অনেক বাংলাদেশির কাছেই এখন বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। কেননা এ দিনের হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্টে লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়েছেন মুসা ইব্রাহীম। এ স্বপ্ন সফল করার পথে অনেক প্রতিকূলতা ছিলো। কিন্তু সে সব বাধা পেরিয়ে হিমালয়চূড়ায় উঠলেন মুসা, বাংলাদেশকেও নিয়ে গেলেন অন্য এক উচ্চতায়। নর্থ আলপাইন ক্লাবের সভাপতি মুসা পড়াশোনা করেছেন ঢাকা ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাড়ি লালমনিরহাটে।

পাটের জন্মরহস্য উন্মোচন
গত ১৬ জুন আকস্মিকভাবেই সংসদে গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য জানালেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বললেন, সোনালী আঁশ পাটের জন্মরহস্য আবিষ্কার করেছে বাংলাদেশ। এতে পাটের সোনালী দিন ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন নতুন মাত্রা পায়। বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল তরুণ গবেষক পাটের জন্ম রহস্য বা জেনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কার হয়। মাকসুদুল যুক্তরাষ্ট্রে পেঁপের এবং মালয়েশিয়ায় রাবার গাছের জন্ম রহস্য আবিষ্কার করেন।

এ আবিষ্কারের বিষয়টি এতদিন গোপন রাখার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইট যেন বাংলাদেশের থাকে- সে জন্য তড়িৎ ব্যবস্থা নিতে হবে। পাটের জন্মরহস্য আবিষ্কারের ফলে বাংলাদেশ বিশ্বের গুটিকয়েক দেশের সঙ্গে যুক্ত হলো জানিয়ে তিনি বলেন, উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে মালয়েশিয়ার পর বাংলাদেশই দ্বিতীয় দেশ যারা জেনোম সিকোয়েন্সিং করতে সক্ষম হয়েছে।

বিতর্কে ইউনূস
ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম নিয়ে অনেকের সমালোচনা থাকলেও এ বছরই বড় ধরনের বিতর্কে পড়লেন গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, যা তহবিল স্থানান্তর নিয়ে। গত ৩০ নভেম্বর নরওয়ে টেলিভিশনে প্রচারিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে ইউনূসের বিরুদ্ধে গ্রামীণ ব্যাংককে দেওয়া কোটি কোটি বিদেশি ডলার অন্য একটি তহবিলে সরানোর অভিযোগ তোলা হয়। যার ভিত্তিতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।

বিষয়টি প্রকাশ্য হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ক্ষমতাসীন দলের বেশ কয়েকজন নেতা ইউনূসকে নিয়ে বক্রোক্তি করেন। ইউনূসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তের কথাও বলা হয়। এরপর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানান, অভিযোগ তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে এ বিষয়ে গ্রামীণ ব্যাংক ও ইউনূসের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিদেশি কোনো অর্থ আত্মসাৎ কিংবা অপব্যবহার করা হয়নি। আর তহবিল সরানোর বিষয়টি ১৯৯৮ সালেই সুরাহা হয়ে গেছে।

এ বিতর্কের মধ্যেই গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব থেকে ইউনূসের পদত্যাগের গুঞ্জন ওঠে, যদিও ইউনূস বলেন, তিনি পদত্যাগ করেননি। পদত্যাগের খবরটি নাকচ করেন অর্থমন্ত্রীও।

উত্ত্যক্ততা
নারীদের উত্ত্যক্ততার বিষয়টি বছরের শেষ ভাগে এসে গুরুত্ব নিয়ে উঠে আসে সংবাদ মাধ্যমে। গত অক্টোবরে নাটোরে বখাটেরা কলেজ শিক্ষক মিজানুর রহমানের ওপর মটর সাইকেল তুলে দিলে তা নিয়ে দেশব্যাপী নিন্দার ঝড় বয়ে যায়। বাগাতিপাড়ার লোকমানপুর কলেজের শিক্ষক মিজান বেশ কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ২২ অক্টোবর মারা যান। এরপর ফরিদপুরে নিজের দুই মেয়েকে উত্ত্যক্তের ঘটনার প্রতিবাদ করায় বখাটেদের হামলায় মারা যান চাঁপা রানী ভৌমিক। এরপরপরই উত্ত্যক্ততার শিকার হয়ে সিরাজগঞ্জে আত্মহত্যা করে নবম শ্রেণীর এক ছাত্রী।

এসব বিষয় ভাবিয়ে তোলে সরকারকেও। আর সে জন্য উত্ত্যক্ততার বিচার ভ্রাম্যমাণ আদালতে করতে আইন সংশোধন করা হয়। এরপর নারী উত্ত্যক্তের তাৎক্ষণিক বিচার করতে নভেম্বর মাসের শুরুতেই ভাম্যমাণ আদালত কাজ শুরু করে।

জাহাজ ছিনতাই
বছর খানেক ধরে আরব সাগরে সোমালি জলদস্যুদের উৎপাত চললেও এ বছরের শেষ ভাগে এসে তাতে বাংলাদেশেরও নাম জড়ায়। গত ৫ ডিসেম্বর ভারত মহাসাগরে ছিনতাই হয় বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ‘জাহান মনি’। ওই জাহাজে ২৫ জন নাবিকসহ ২৬ জন বাংলাদেশি রয়েছেন। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি সোমালিয়া উপকূলে ভিড়ে আছে। উদ্ধার জলদস্যুদের মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনতে আনতে হবে, এমন কথাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা। অপহৃত নাবিকদের স্বজনরা এজন্য সরকারের পদক্ষেপ চেয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, উদ্যোগ চলছে।

এদিকে জাহান মনির ঘটনার মধ্যেই সোমালি জলদস্যুরা ৫৫ লাখ ডলার মুক্তিপণ পেয়ে জার্মানির একটি গত সপ্তাহে জাহাজ ছেড়ে দিয়েছে। ওই জাহাজটি গত মে মাসে অপহরণ করা হয়।

পুঁজিবাজারে ধস
বছরজুড়ে চাঙ্গাভাব থাকলেও বছরের শেষ দিকে এসে আকস্মিক ধস এলোমেলো করে দেয় পুঁজিবাজার। শুরু থেকেই লেনদেন বৃদ্ধির রেকর্ডের পর রেকর্ড অনেককে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলেছিলো। আর তাদের মধ্যে হতাশা নিয়ে আসে বছরের শেষ মাস ডিসেম্বর। যার প্রকাশ ঘটে বিক্ষোভ আর ভাংচুরে।

গত ৮ অক্টোবর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বড় ধরনের দরপতন হয়। লেনদেন শুরুর প্রথম ঘণ্টায় সাধারণ সূচক প্রায় ৫০০ পয়েন্ট কমে যায়। ১৯৯৬ সালে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে শেয়ারের আকস্মিক উত্থান-পতনের ‘কালো দিবসের’ পর এটাই সর্বোচ্চ দরপতন। একদিনে সর্বোচ্চ দরপতন হয় ১৯ ডিসেম্বর। সেদিন সূচক ৫৫১ পয়েন্ট কমে যায়। বাজার স্থিতিশীল করতে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা অবশ্য ত্বরিত বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়।


শিক্ষানীতি

৩৯ বছর পর পূর্ণাঙ্গ একটি শিক্ষানীতি এ বছরই পেলো বাংলাদেশ। জাতীয় শিক্ষানীতি গত ৩১ মে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। এরপর গত ৭ ডিসেম্বর তা সংসদের সমর্থন পায়। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। তবে নতুন শিক্ষানীতিতে ‘ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ কমানো হয়েছে’ দাবি করে এর বিপক্ষে অবস্থান নেয় কয়েকটি ইসলামী দল। যদিও সরকার বলছে, তাদের দাবি ভিত্তিহীন।

নতুন শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন হলে শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান স্তরগুলোতে পরিবর্তন আসবে। মাধ্যমিক পরীক্ষা থাকবে না। প্রাথমিক শিক্ষার পরিধি হবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত। পাঠ্যবই ও পরীক্ষা পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসছে। মাদ্রাসা শিক্ষারও আধুনিকায়ন হবে।

অ্যানথ্রাক্স
স্বাস্থ্য খাতে ২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লু আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিলেও ২০১০ সালে আতঙ্ক ছড়ায় অ্যানথ্রাক্স বা তড়কা রোগ। রোগটি গবাদি পশুর হলেও বছরের মাঝামাঝিতে তা দেখা দেয় মানুষের মধ্যে। আক্রান্ত হয় ৫০০’রও বেশি মানুষ। এক পর্যায়ে সারাদেশে উচ্চ সতর্কতা জারি করে সরকার। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আসা গবাদি পশুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। তবে অক্টোবরের শুরুতে দেশকে অ্যানথ্রাক্সমুক্ত ঘোষণা করে সরকার।

অ্যানথ্রাক্স আতঙ্কে মানুষ মাংস এড়িয়ে চলায় পশু জবাই কমে যায়। ফলে মাংস ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চামড়া ব্যবসায়ীরাও বিপাকে পড়ে। মাংস ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, মুরগি ব্যবসায়ীরা পরিকল্পিতভাবে অ্যানথ্রাক্স আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। তাদের অভিযোগ সমর্থন করে প্রাণীসম্পদমন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসও বলেন, তা তদন্ত করবে সরকার। তবে বছর গড়ালেও এর কোনো অগ্রগতি আর দেখা যায়নি।

বিমানে ধর্মঘট
গত অক্টোবর মাসের শেষ দিকে বৈমানিক ধর্মঘটে অচল হয়ে পড়ে বিমান। ২৬ অক্টোবর থেকে তারা ধর্মঘট শুরু করে। পরে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তিন দিনের অচলাবস্থার সুরাহা হয়। বিভিন্ন দাবিতে ২০ অক্টোবর বৈমানিকরা বিমানকে আলটিমেটাম দেয়। বিমান দাবি না মানায় কর্মবিরতিতে যায় বৈমানিকদের সংগঠন বাপার সদস্যরা। এরপর কয়েকজন বৈমানিককে ফ্লাইট পরিচালনা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলে পুরোদমে ধর্মঘট শুরু হয়। এতে এক দিনেই অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক গন্তব্যের ১৫টি নির্ধারিত ফ্লাইটের মধ্যে আটটি বাতিল করতে বাধ্য হয় বিমান। এর মধ্যে ছয়টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যের। পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিমান কর্তৃপক্ষ ও বৈমানিকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর ধর্মঘট প্রত্যাহার হয়।