ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

খিলগাঁও তলাতলা কবরস্থানের প্রবেশমুখেই ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বরাতে কিছু সতর্কতামূলক  নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে  যাতে লেখা আছে  ‘কবরস্থানে গরু-ছাগল প্রবেশ নিষেধ’, ‘মহিলাদের প্রবেশ নিষেধ’, এবং ‘খেলাধূলা সম্পূর্ণ নিষেধ’।

তবে কবরস্থানের ভেতরে  দেখা গেল উল্টো চিত্র। শিশুরা সেখানে খেলাধূলা, ছুটোছুটি করছে। কবরস্থানের খোলা জায়গায় গরু-ছাগল ঘুরে ঘুরে ঘাস, লতাপাতা খাচ্ছে।

স্থানীয় একজন বয়োজ্যেষ্ঠ বলেন,  “অনেক আগে বিশাল আকারের ঝিল ছিল এই কবরস্থানটি। অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন থাকাকালিন সময় এখানে মাটি ভরাটের মাধ্যমে এটি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে মোট ৫ দশমিক ৩৭ একর জমির উপর মাটি ভরাটের মাধ্যমে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে কবরস্থানটির উদ্বোধন করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আনিসুল হক এবং ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম রহমতুল্লাহ।”

প্রায় ২ হাজার ৭০০ কবর দেওয়ার ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন এই কবরস্থানে মুক্তিযোদ্ধা, বৃদ্ধ, মহিলা এবং শিশুদের জন্য আলাদা করে স্থান বরাদ্দ দেওয়া আছে। কবরস্থানটিতে ওয়াকওয়ে রাখা হয়েছে ১ হাজার ৮৯৮ মিটার।

অনেকের ভাষ্যে, কবরস্থানের ভেতরে উন্নয়ন কাজ ২০১৬ সালে শুরু হয়। প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৭ সালে।

তিন বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি।

কবরস্থানটি ঘুরে এর চারপাশে তাকালে অব্যবস্থাপনার চিত্রই ফুটে ওঠে। বৈদ্যুতিক পোলের বাতিগুলোর অধিকাংশই অকেজো।  কবরস্থানের ভেতরে নির্মাণ কাজের জন্য ইট, পাথর, বালুসহ স্তুপ করে রাখা আরো অন্যান্য জিনিস নষ্ট হলেও সেখানে কোনো কাজ হচ্ছে না।

কবরস্থানটির দেখভালের দায়িত্বে আছেন গোরখোদক মো. ইউসুফ।

তিনি বলেন,  “কিছুদিন আগে নষ্ট হয়ে যাওয়া কয়েক টন রড ও কয়েক হাজার ইট নিয়ে গেছেন ঠিকাদার। প্রায় তিনশ বস্তা সিমেন্ট পড়ে নষ্ট হচ্ছে। স্তুপ করে রাখা বালু পানিতে ধুয়ে গেছে।”

আরেক গোরখোদক জবান আলী বলেন,  “বৃষ্টি শুরু হওয়ায় আগের মতো মানুষ এখন কবর দিতে আসছেন না। বৃষ্টি হলে কবস্থানের অবস্থা কি হয় সেটা অনেকেই জেনে গেছেন। কবরস্থানে মাটি ফেলে উঁচু করার কথা শুনেছি, কিন্তু কোনো কাজ দেখছি না।”

একটি কবর খোঁড়া বাবদ তারা দেড় হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা নিয়ে থাকেন বলে জানান তিনি।

এই টাকা তারা পাঁচজন মানুষ ভাগ করে নেন। এটাই তাদের আয়ের উৎস। প্রতি শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর অনেকেই আসেন কবর জিয়ারতের জন্য।  তখন তারা কবরের যত্নআত্তি করার জন্য কিছু টাকা দেন। এভাবেও তারা কিছু টাকা রোজগার করে থাকেন।

বৃষ্টির কারণে কয়েকদিন ধরে কেউ কবর দিতে আসছেন না, তাই একেবারে বেকার বসে আছেন গোরখোদকরা।

স্থানীয়রা বলছেন, উত্তর ও দক্ষিণ এই দুই সিটি করপোরেশন সংক্রান্ত জটিলতায় কবরস্থানের সামগ্রিক কাজ বন্ধ রয়েছে। কবরস্থানটিকে ঘিরে ৬৭০ মিটারের সীমানা প্রাচীর তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমানে এর কোনো কাজই হচ্ছে না। এই সুযোগে চারপাশের বাঁশের বেড়া ভেঙে অনেকেই কবরস্থানের জায়গা দখল করে নিচ্ছে।

কবরস্থানের প্রবেশ মুখের ডান পাশে উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে একটি ডাস্টবিন তৈরি করা হয়েছে। তার সামনে রয়েছে একটি ইমারত। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ভূমিকম্পের জন্য এই রেসকিউ সেন্টারটি তৈরি করেছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। কবরস্থানের সঙ্গে একেবারে লাগোয়া একটি পতিত পুকুর রয়েছে। যার অর্ধেক কবরস্থানের জন্য বরাদ্দ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন গোরখোদক বলেন,  “বৃষ্টির কারণে কবরের ভেতর কলাগাছ ভাসিয়ে তার উপর লাশ রেখে অনেক সময় কবর দিতে হয়। নিষ্কাষণ ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষায় বৃষ্টির পানি পাশের ঝিল থেকে উপচে পড়ে কবরস্থানে চলে আসে। তাই কবর খুঁড়তেই মাটি ফুরে পানি বেরুতে থাকে। তখন খড় বিছিয়ে দিতে হয়।”

তাতেও যখন কাজ হয় না, তখন কলাগাছ কেটে টুকরো টুকরো করে কোনোমতে লাশ কবর দেওয়া হয়, এমন অভিজ্ঞতার কথাই জানালেন কবর জিয়ারত করতে আসা পার্শ্ববর্তী খিলগাঁওয়ের আব্দুল কাদের।

তার বাবাকেও কলা গাছের উপর কবর দেওয়া হয়েছে। এমন দৃশ্য সন্তান হিসেবে তাকে খুবই কষ্ট দিয়েছে।

আবেগতাড়িত কন্ঠে তিনি বলেন, বাড়ির কাছাকাছি হওয়ায় এখানেই বাবাকে কবর দেওয়ার জন্য পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু কবর দিতে এসে যা দেখলাম তাতে শুধু আমিই না উপস্থিত সবাই কষ্ট পেয়েছে।

কথা হয় ব্যাংক কর্মকর্তা রানার সঙ্গে।

তিনি বললেন, তার মা ক্যান্সারে মারা গেছেন দু’বছর আগে।

ছিমছাম পরিবেশ ও বিশাল পরিসরের এ কবরস্থানে মাকে কবরস্থ করতে পেরে তিনি মোটামুটি সন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু টানা বৃষ্টির পর জুমার নামাজ শেষে কবর জিয়ারত করতে এসে যারপরনাই বিরক্ত তিনি।

পুরো কবরস্থান জুড়ে পানি। অনেক কবরের মতো তার মায়ের কবরের মাটিও নরম হয়ে প্রায় সমান হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় দেবে গেছে।

বর্ষায় এই কবরস্থানের এমন বেহালদশার চিত্র নিত্যদিনের বলে অভিযোগ অনেকেরই।

তারা বলেন, খিলগাঁও, বাসাবো, তালতলা, গোড়ানসহ আশপাশের এলাকার মানুষ কবর দেওয়ার জন্য পার্শ্ববর্তী শাহজাহানপুর কবরস্থানে ছুটে যান। কিন্তু সেখানে স্থান অপ্রতুলতা এবং আনুষাঙ্গিক খরচ অনেক বেশি হওয়ায় তালতলা কবরস্থানের দিকে ঝুঁকে পড়েন অনেকে।

কিন্তু  উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সীমানা সংক্রান্ত জটিলতায় এই কবরস্থানের কাঙ্খিত উন্নয়ন কাজ থমকে আছে।

উত্তর-দক্ষিণ দ্বন্দ্বের দ্রুত অবসান চান তারা বলে জানালেন, কবর জিয়ারতে আসা অনেকেই।

মন্তব্য ২ পঠিত