ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

স্বপ্ন বলতে খুবই সাধারণ ভাবে আমরা বুঝি, ঘুমন্ত অবস্থায় যে সাদা কালো মুভি দেখি ওটায় স্বপ্ন। আর এই মুভিটার বেশির ভাগই হয় নিজ নিজ জীবনের কাজ কর্ম কল্পনা প্রসূত। আর এই জন্যই একেক জনের স্বপ্ন একেক রকম। স্বপ্ন কে তাই বলা যায় নিজ জীবনের প্রজেকশন। অনেক ক্ষেত্রে নিজের সাথে সম্পর্কিত মানুষ বা সমাজের প্রজেকশন।

” কিছু স্বপ্নবিজ্ঞানীর মতে নিদ্রার যে পর্যায়ে কেবল আক্ষিগোলক দ্রুত নড়াচড়া করে কিন্তু বাকি শরীর শিথিল হয়ে যায় সেই আর.ই.এম (র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট স্লীপ) দশায় স্বপ্ন হয়। কিন্তু এই বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে।” [১] গড়ে একজন মানুষ জীবনের ২০ বছর ঘুমিয়ে কাটায় তার মধ্যে প্রায় ৩ লক্ষ স্বপ্ন দেখে [২]।

ছোটবেলায় আমরা মাঝে মাঝে স্বপ্নে দেখতাম , কোন জন্তু জানোয়ার আমাদের দিকে তেড়ে আসতেছে। এটা খুবই সাধারণ। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, শিশুরা প্রায়ই জীব-জন্তু দ্বারা আক্রমনের বা তেড়ে আসার স্বপ্ন দেখে। যেমন: কুকুর, বিড়াল, কুমির, গোরিলা, সাপ এবং মাকড়শা [২] । তাই ছোট বাচ্চারা এই রকম স্বপ্ন দেখে কান্না কাটি করে বাবা-মা কে বললে, শিশু কে ভয় দূর করে সাহসী ও আত্নবিশ্বাসী হিসাবে গড়ে তোলা মা-বাবার কর্তব্য।

”চরক-সংহিতা সাত প্রকার স্বপ্নের কথা বলেছে। বৌদ্ধ দর্শনে বর্ণিত হয়েছে ছয় প্রকারের স্বপ্ন। জীবন চলার পথে মানুষ ভয়, দুঃস্বপ্ন, অতীত স্মৃতি, ইচ্ছাপূরণ, ভবিষ্যতের বার্তা, আধ্যাত্মিক নির্দেশনা, মুর্শিদের উপদেশ,জ্ঞান লাভ ইত্যাদি নানারকম স্বপ্ন দেখে।” [৩]

”স্বপ্নের কারণ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্কের অন্ত নেই। অনেকে স্বপ্নকে নেহাত স্বপ্নই বলতে চেয়েছেন। কিন্তু ইতিহাস থেকে আমরা দেখতে পাই,স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন নয়। স্বপ্নের ঐতিহাসিক বাস্তবতার কিছু ঘটনা দেখতে পাবেন এই লিংক এ” [৪] । পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্নপত্র স্বপ্নে দেখা ও পরের দিন সকালে প্রশ্নপত্র সামনে পেয়ে তা মিলে গিয়ে হতবাক হয়ে যাওয়ার মত অনেক ঘটনা আমাদের সবার জীবনেই কম বেশি আছে। তাই বোঝা যায় জীবনের প্রজেকশনে স্বপ্ন অনেক গুরত্বপূর্ণ।

স্বপ্ন যে কত গুরত্বপূর্ণ তা আমরা পবিত্র কোর্আন এ সূরা ইউসুফ [৫] এ ও দেখতে পাই।

স্বপ্নের কারণ ব্যাখা করা আমার এই পোস্টটির উদ্দেশ্য নয়। স্বপ্ন কেন হয় ? এই সবের নানান বৈজ্ঞানিক ব্যাখা আমার মত সাধারণ মানুষ জেনে কি করবে! সাধারণ মানুষের চাওয়া পাওয়া স্বপ্ন কে কিভাবে নিজ জীবনের উন্নতিতে কাজে লাগানো যায়।

স্বপ্নের ক্ষেত্রে প্রথম সমস্যা দাড়ায় আমরা স্বপ্ন মনে রাখতে পারি না। আমার অভিজ্ঞতায় বলে, খুবই ছোট একটা কৌশল করলে স্বপ্ন মনে রাখা যেতে পারে। সেটা হচ্ছে স্বপ্ন দেখার পর পরই চোখ না খুলে , কিছুক্ষণ চোখ বন্দ করে স্বপ্নটি মনে করার চেষ্টা করা। দেখা যাবে স্বপ্নটি মনে থাকছে। এরপর আপনি ডায়রীতে লিখে রাখতে পারেন অথবা ‘পকেট ড্রিম বুকলেটে’ তারিখ দিয়ে মার্ক করে রাখতে পারেন।

”ক্যালভিন হলের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, যৌবনে ১০ শতাংশের বেশী যৌন স্বপ্ন দৃষ্ট হয় না এবং যৌবনের মধ্যভাগে এ ধারা আরো অতি সাধারণ একটি বিষয়। আরেকটি গবেষণায় দেখা যায় যে, ৮% নর-নারী যৌন স্বপ্ন দেখে থাকেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে যৌন স্বপ্নের ফলে অতি উত্তেজনার পরিবেশ ডেকে আনে বা বীর্যপাতন ঘটায়। সচরাচর তা ভেজা স্বপ্ন বা স্বপ্নদোষ নামে পরিচিতি বহন করে।” [১] কাজেই এই ধরনের স্বপ্ন বা উত্তেজনায় দেখা স্বপ্ন কে আমরা সাধারণ ভাবে ব্যাখা বের করার জন্য ইগনোর করব। তবে স্বপ্নদোষ হলে খাওয়া দাওয়া ভালো করা ও শারীরিক ব্যায়াম করা উচিত; বেশি হলে ডাক্তার দেখানো উচিত বলে আমি মনে করি।

এছাড়া স্বপ্ন খুবই ক্ষুদ্র বা বড়, দিনে বা রাতে যখনই দেখি না কেন নোট্ করে রাখা বা মনে রাখতে পারি। জীবনের প্রজেকশন হিসাবে ক্ষণিক মূহুর্ত পরে থেকে জীবনের শেষ বেলা পর্যন্ত এর বাস্তবতা দেখার সম্ভবনা থাকে। কোথায়,কখন,কার ঘটবে?; বা স্থান, কাল, পাত্র; ও স্বপ্নের মধ্যে লুকায়িত থাকতে পারে।

এর পর প্রশ্ন আসে স্বপ্নের ব্যাখা নিয়ে। আমার মতে, স্বপ্নের ব্যাখার জন্য প্রথমে, যা দেখা হয়েছে তার অন্তনিহির্ত অর্থ অনুমান করতে পারলে ৫০% ব্যাখা পরিষ্কার। অন্তনিহির্ত অর্থ নিজ নিজ জীবন অভিজ্ঞতা থেকে অনুমান করা যেতে পারে। সিম্বল গুলোর অর্থ পরিষ্কার বুঝলে আরো ২০% পরিস্কার। এরপর নিজের পুরা স্বপ্ন কে খাপে খাপে মিলিয়া বাস্তব আকার দিতে পারলে ২০% পরিষ্কার। বাকি ১০% এর মাঝে লুকিয়ে থাকে সম্ভবনার খেলা।

সিম্বল গুলোর ইসলামিক ব্যাখা বোঝার জন্য দেখতে পারেন আল্লামা মুহম্মদ ইবনে সীরীন (রহ:) এর লেখা বই ‘স্বপ্নের ব্যাখা’ এর বাংলা অনুবাদ [৬]। অথবা তথ্যসূত্র [২] টাইপের বই কিনে ফেলতে পারেন। কিছুই না থাকলে গুগল মামা কে সিম্বল ধরে জিগাইয়া দেখতে পারেন।

নিজ স্বপ্ন নিজে নিজেই ব্যাখা করাটা ভাল। কারণ নিজের সমস্যা নিজেই ভালো বুঝা যায়। যেমন ধরেন, আপনি কোনো গবেষণায় কোনো সমস্যা নিয়ে ব্যাস্ত। স্বপ্ন যদি ঐ গবেষণা সম্পর্কিত হয়, ওটা তো আপনি ছাড়া আর কেউই বুঝবে না। অন্যর কাছে বললেও জ্ঞানী ও যাকে বিশ্বাস করতে পারেন এই রকম মানুষের কাছে বলতে পারেন।

স্বপ্নের ব্যাখা পরিষ্কার হওয়ার পর নিরব থেকে জীবনে কাজে লাগালে দেখা যাবে সময়ের সাথে অনেক কাজ যেন মিরাকলের মত হয়ে যাচ্ছে।

আপনাদের স্বপ্ন সমন্ধে ধারণা ও বাস্তবতা জানতে পারলে খুশি হব।

– বোতল বাবা

তথ্যসূত্র:(০২ .১২ .২০১২)
[১] স্বপ্ন-উইকিপিডিয়া
[২] Understanding dreams, Collins gem, Harper Collins Publishers UK,(2005), p. 9, 17।
[৩] স্বপ্নের প্রকারভেদ
[৪] স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন নয়
[৫] সূরা ইউসুফ -‘other Languages’ অপশনে ‘Bangla’ ক্লিক করলে বাংলায় পাবেন।
[৬] মূল: আল্লামা মুহম্মদ ইবনে সীরীন (রহ:), অনুবাদ: মাওলানা মুহম্মদ আবূ আশরাফ, ”স্বপ্নের ব্যাখা”, এমদাদিয়া পুস্তকালয় ঢাকা। (ডাউনলোড)