ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

বাউল সম্রাট শাহ্‌ আব্দুল করিম

বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলাধীন উজান ধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন [১]। অন্যদিকে ভালোবাসা দিবস বা সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স ডে একটি বার্ষিক উৎসবের দিন যা ১৪ই ফেব্রুয়ারি প্রেম এবং অনুরাগের মধ্যে উদযাপিত করা হয়। সেন্ট ভ্যালেইটাইন’স বন্দী অবস্থায় তিনি জনৈক কারারক্ষীর দৃষ্টহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। এতে সেন্ট ভ্যালেইটাইনের জনপ্রিয়তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সেই দিন ১৪ই ফেব্রুয়ারি ছিল [২]। ভালোবাসাকে মৃতু দেওয়া যায়, ধ্বংস করা যায় না। তাই যেন প্রেমের রজনী শেষ হতে না হতেই যেন আরো একজন প্রেমিকের জন্ম হল।

ভালোবাসাকে যেন সবাই কম বেশি বোঝেন। কিন্তু ভালোবাসাকে ভাষায় রূপ দেওয়া অনেক অনেক কঠিন। পৃথিবীতে যারা এই কঠিন কাজটি করতে পেরেছেন ও করেই যাচ্ছেন, বাউল সম্রাটকে আমি তাদের মধ্যে একজন মনে করি।

শাহ্ আবদুল করিম তাঁর স্ত্রীকে মনে করতেন মুর্শিদ। ‘মুর্শিদ’ শব্দটার অর্থ-নেতা (আধ্যাত্মিক অর্থে অবশ্য)। শাহ আবদুল করিমের স্ত্রীর নাম ছিল আবতাবুন্নেছা। করিম আদর করে ডাকতেন: ‘সরলা’। স্ত্রীকে ‘মুর্শিদ’ মনে করাটা সহজ নয়। অনেক শিক্ষিত আধুনিক পুরুষও এক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। [৩]

খুবই সূক্ষ সূক্ষ সৃজনশীল চিন্তা ভাবনা আমি খুঁজে পাই এই পাগল বাউলদের মাঝে। পাগল বাউলরা কিছু চান নি আমাদের মত অকৃতজ্ঞ মানুষদের কাছে থেকে, শুধু যেন দিয়েই গেছেন ভালবাসা শুধু ভালবাসা। পৃথিবী দুর্দম গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, আমরাও স্টাডি করেই যাচ্ছি কিন্তু ঘুরে ফিরেই যেন পাগলদের কথার মধ্যে সত্যতা খুঁজে পাই।

দারিদ্রের মধ্যেই কঠোর পরিশ্রমের মধ্যদিয়ে বেড়ে উঠেন শাহ্ আব্দুল করিম। শৈশব থেকেই একতারা ছিল তার নিত্যসঙ্গি। সঙ্গীতের প্রতি তিনি এতটাই অনুরাগী ছিলেন যে তা ছেড়ে চাকরিতে জড়াননি তিনি। ফলে কাটেনি তার দরিদ্র্য এবং বাধ্য হয়ে নিয়জিত ছিলেন কৃষিশ্রমে। জীবন কেটেছে সাদাসিদে ভাবে। তবে কোন কিছুই তার সঙ্গীতপ্রেম ঠেকাতে পারেনি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাউল ও আধ্যাত্নিক গানের তালিম নিতে থাকেন কমর উদ্দিন, সাধক রসিদ উদ্দিন, শাহ্ ইব্রাহিম মোস্তান বকস এর কাছ থেকে। দীর্ঘ এ সঙ্গীত জীবনে বাউল ও আধ্যাত্নিক গানের পাশাপাশি ভাটিয়ালি গানের ও বিচরণ ছিল তার। লিখেছেন ও সুর দিয়েছেন ১৬ শ’র বেশি গান। যেগুলো ছয়টি বইয়ে গ্রন্থিত আছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে আরও রয়েছে গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান……. আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’,’ বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে’, ‘বসন্ত বাতাসে সইগো’, ‘আমি কুলহারা কলঙ্কিনী’ ইত্যাদি। বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে তার ১০ টি গান ইংরেজীতে অনূদিত হয়েছে। লালন শাহ্, পাঞ্জু শাহ্ ও দুদ্দু শাহ্ এর দর্শনে অনুপ্রাণিত ছিলেন আব্দুল করিম। [৪]


শাহ আবদুল করিমের জনপ্রিয় কিছু গান:

বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম
গাড়ি চলে না
আমি কূলহারা কলঙ্কিনী
কেমনে ভুলিবো আমি বাঁচি না তারে ছাড়া
কোন মেস্তরি নাও বানাইছে
কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু
বসন্ত বাতাসে সইগো
আইলায় না আইলায় নারে বন্ধু
মহাজনে বানাইয়াছে ময়ুরপংখী নাও
আমি তোমার কলের গাড়ি
সখী কুঞ্জ সাজাও গো
জিজ্ঞাস করি তোমার কাছে
মানুষ হয়ে তালাশ করলে
আমি বাংলা মায়ের ছেলে

প্রকাশিত বই:

বাউল শাহ আবদুল করিমের এ পর্যন্ত ৬টি গানের বই প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি সিলেট জেলা মিলনায়তনে তাঁর রচনাসমগ্র (অমনিবাস)-এর মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে। বইগুলি হলো:

আফতাব সংগীত
গণ সংগীত
কালনীর ঢেউ
ভাটির চিঠি
কালনীর কূলে
দোলমেলা

সম্মাননা:

বাউল শাহ আব্দুল করিম ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। বাংলা একাডেমি তার দশটি গানের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করে। এছাড়া দ্বিতীয় সিটিসেল চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে এই বাউল সম্রাটকে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। এছাড়াও ২০০০ সালে কথা সাহিত্যিক আবদুর রউফ চৌধুরি পদক পান। উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে সাউন্ড মেশিন নামের একটি অডিও প্রকাশনা সংস্থা তার সম্মানে ‘জীবন্ত কিংবদন্তীঃ বাউল শাহ আবদুল করিম’ নামে বিভিন্ন শিল্পীর গাওয়া তার জনপ্রিয় ১২ টি গানের একটি অ্যালবাম প্রকাশ করে।

[৩]

ভালোবাসাকে স্মরণ করতে হয় ভালবাসা দিয়ে। কিন্তু আমরা যেন বুনো উদ্যমে মেতে উঠি ভালবাসার দিন গুলোতে।

এই জন্যই কি, ”পাশ্চাত্যের ক্ষেত্রে জন্মদিনের উৎসব, ধর্মোৎসব সবক্ষেত্রেই ভোগের বিষয়টি মুখ্য। তাই গির্জা অভ্যন্তরেও মদ্যপানে তারা কসুর করে না। খৃস্টীয় এই ভ্যালেন্টাইন দিবসের চেতনা বিনষ্ট হওয়ায় ১৭৭৬ সালে ফ্রান্স সরকার কর্তৃক ভ্যালেইটাইন উৎসব নিষিদ্ধ হয়। ইংল্যান্ডে ক্ষমতাসীন পিউরিটানরাও একসময় প্রশাসনিকভাবে এ দিবস উদযাপন করা থেকে বিরত থাকার জন্যে নিষিদ্ধ ঘোষনা করে। এছাড়া অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও জার্মানিতে বিভিন্ন সময়ে এ ভালবাসা দিবস প্রত্যাখ্যাত হয়। ” [২]

আসেন আমরা অত্যন্ত গভীর ভালবাসা দিয়ে শাহ্ আবদুল করিম-এর গান গুলো শুনি ও পড়ি, গান গুলোর অন্তর্নিহির্ত অর্থ গুলো বোঝার চেষ্টা করি এবং নিজ নিজ জীবনে কাজে লাগিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ি।
______________________

তথ্যসূত্র:

[১] শাহ আবদুল করিম- উকিপিডিয়া (লিংক)
[২] ভালোবাসা দিবস – উকিপিডিয়া (লিংক)
[৩] শাহ আবদুল করিম- আর্টিকেল (লিংক)
[৪] শেখ ইমতিয়াজ মেহেদী হাসান, সৃজনশীল অসাম্প্রাদয়িক বাংলা গড়ার পথিকৃৎ শাহ্‌ আব্দুল করিম (লিংক)
[৫] ফিচার ছবি উকিপিডিয়া থেকে সংগৃহিত (লিংক)

হাইপার লিংক গুলো দেখেছি ১০-০২-২০১৩ ইং তারিখে।
_____________

@:- বোতল বাবা, জার্মানি, ১০.০২.২০১৩। § /\/\/\___ …°°°:::___ ∞∞∞ <<–