ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

আমরা প্রত্যেকেই যেন একেকটি টাইম মেশিন। তার মানে আমাদের মনে হলেই আমরা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতে চলে যেতে পারি। গৌতম বুদ্ধকে একবার একজন প্রশ্ন করেছিল সৃষ্টিকর্তা সমন্ধে। বুদ্ধ বলেছিল, তোমার শরীরে যদি একটি তীর বিধে, তুমি কি চিন্তা করবে তীরটি কোথায় থেকে এল ! কোথায় যাবে ! নাকি চিন্তা করবে তীরটি বর্তমানে শরীর থেকে সরিয়ে ফেলে তীব্র ব্যাথা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে ! কাজেই অতীত ও ভবিষ্যতের চেয়ে বর্তমান বেশি গুরত্বপূর্ণ। এই জন্যই বুদ্ধ ধর্মে কোন সৃষ্টিকর্তা নাই।

অতীত-ভবিষ্যত ও গুরত্বপূর্ণ। আমরা টাইম মেশিন তারপর ও কেন সময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না ! কারণটি খুবই সহজ। বেশির ভাগ সাধারণ মানুষ সর্বক্ষণ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে প্যাচ লাগিয়ে ফেলে। বেশিরভাগ দার্শনিকরা এই জন্য মনে করেন বর্তমানকে দিয়ে অতীত ও ভবিষ্যতে যেতে হবে। যে মানুষ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত কে সুনিয়ন্ত্রিত ভাবে চিন্তা করতে পারবে, সেই সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। জার্মান দার্শনিক কান্ট্ কে মনে করা যায়, যার প্রাতকালীন ভ্রমন দেখে তখনকার দিনে পথচারীরা ঘড়ি মিলিয়ে নিতেন। কিভাবে কান্ট্ সময় নিয়ন্ত্রণ করতেন, অনেকটা যেন কঠিন। কান্ট্ মনে করতেন, স্থান ও সময়ের কনসেপ্ট মানুষের ব্রেইন-এ গাথা।

ঢাকা ভার্সিটিতে টিএসসি’র “শ্রোতে” কবিতা আবৃত্তি শেখার সময় গোল করে বসা হত। এরপর একজন একজন করে রেনডোমলি একটি কবিতার স্তবক বলতে বলা হত। দেখা যেত দুইজন বা জিনজন একই সঙ্গে কথা বলে উঠছেন। এটার কারণ কি! কারণের চেয়ে আমরা সমাধানের দিকে যাই। সমাধান থেকে আমরা নিজেরাই কারণ খুঁজে নিব।

এরপর গোলকরে বসা অবস্থায় সবাইকে “এনার্জি পাস” গেম খেলতে বলা হল। এনার্জি পাস গেমটি এই রকম, সবাই পাশের জনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ধরবে। ডান পাশের জনকে, ডান হাত পাশের জনের বাম হাতের সাথে মিলাবে। বাম পাশের জনকে, বাম হাত পাশের জনের ডান হাতের সাথে মিলাবে। এই ভাবে গোলাকার একটি চেইন তৈরি করবে। এই বার এনার্জি পাসের সময়। যে কেন একজন শুরু করবে। একজন তার ডান হাত দিয়ে পাশের জনের বাম হাতে হালকা চাপ (এনার্জি) দিবে। সে তার পাশের জনকে দিবে। এই ভাবে এনার্জি (চাপ) ট্রান্সফরমেশন গোলাকার চেইন আকারে কিছুক্ষণ চলতে থাকবে। ক্লকওয়েজ ও হতে পারে, এন্টি-ক্লকওয়েজ ও হতে পারে।

গেমটি খেলার পর কথা বলতে বলা হলো। দেখা গেল রেনডোমলি কথা বলতে বলা হলেও, সবাই যেন বুঝে যাচ্ছে কে কখন কথা বলবে। তাই অটোমেটিক একজন একজন করেই কথা বলছিল সবাই। অদ্ভুদ গেম কিন্তু রেজাল্ট চমত্কার। আমরা এই অদ্ভুদ গেম থেকে সময়কে নিয়ন্ত্রনের কিছু তথ্য পাই।

এখন একটু যাই সুফিবাদে। সুফিবাদের নকশাবন্দী তরিকাতে ১১টি নীতির মধ্যে ৯ নম্বর নীতিতে সময় সমন্ধে সচেতনার কথা বলা হয়েছে। এই সচেতনা মানে, একজনের মন কোন মুহুর্তে (বর্তমানে) কোথায় (অতীত, বর্তমান না ভবিষ্যতে)?, সে সমন্ধে সচেতন থাকা। এই সচেতনা সমন্ধে আরো বলা হয়েছে, যখন কেউ বর্তমান অবস্থায় ফিরে আসে, সে যেন কৃতজ্ঞ প্রকাশ করে। প্রতিটি শ্বাস প্রশ্বাসের সময়, সময় সমন্ধে সচেতন থাকতে হবে এই ভাবে যে মনকি এখন বর্তমানে নাকি মন ভুলভ্রান্তিতে। শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে হার্ট বিটের (এনার্জি) ও মিল আছে। তাই অতি সূক্ষ ভাবে বললে, প্রতিটি হার্ট বিটে সময় সচেতন থাকতে হবে।

এখন আসি বাস্তবিক জীবনে সময়ের কিছু উদহারনে। বাংলাদেশে দেখেছি কোন কিছুই যেন সময় মেনে চলে না। এটা একজন জার্মানের কাছে অবাক করার মত ব্যাপার। কিন্তু একজন বাংলাদেশির কাছে স্বাভাবিক। যে দেশে উচ্চশিক্ষিত নামধারী অফিসের বস-ই সময় নিয়ন্ত্রণ করেন না, সেখানে কলিগরা কিভাবে সময় নিয়ন্ত্রণ করবেন! বাংলাদেশে কোন মিটিং এ দেখা যায় অফিসের বস সবার পরে পৌছান, জার্মানিতে সবার আগে অফিসের বস উপস্থিত থাকেন। জার্মানিতে মিটিং-এ কোন কারণ ছাড়া যে ৫ মিনিট পরে পৌছান, উনার দিকে সবাই বাকা চোখে তাকায়। যেমন: ফ্রেঞ্চদের প্রতি জার্মানরা তাকায়।

মানুষের সৃষ্টি মেশিনের সময় মেনে চলা বলে শেষ করি। জার্মানিতে দেখলাম বাস, ট্রাম, ট্রেন সবকিছু যেন সেকেন্ডের কাটার সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে আসতেছে। কিছু সময় ব্যাতিক্রম হয়, হলেও তা আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে দেরি করলে দোষ দেওয়া হয় বাস দেরি করছে, ট্রাফিক জ্যাম, মারামারি- হট্রগোল ইত্যাদি। তার মানে কি দাড়ায় : আমার সৃষ্টিতে আমার-ই নিয়ন্রণ নাই। মানুষের সৃষ্টি মানুষের কথা শোনে না ও মানে না, ব্যাপারটি অদ্ভুদ কি না ! একই কথা এখানে, যে দেশে মানুষ সময় নিয়ন্ত্রণ করবে না, সেখানে মানুষের সৃষ্টি মেশিন কিভাবে সময় নিয়ন্ত্রণ মেনে চলবে!

তাই,

মানুষ যখন সময় নিয়ন্ত্রণ করবে, তখন মানুষের সৃষ্টিও সময় নিয়ন্রণ মেনে চলবে।