ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

ফকা চৌধুরী নামে পরিচিত ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন মুসলিম লীগের নেতা। মুসলিম লীগ করার বদৌলতে এক সময় তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের স্পিকারও হন। এই ফকা ছিলেন চট্টগ্রামে দোর্দন্ড প্রতাপশালী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে মুসলিম ছাত্রলীগ করেছিলেন তিনি। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান আদায় করে হিন্দু প্রতাপশালীদের এদেশ থেকে তাড়িয়ে তাদের জায়গা দখল করেছিলেন এই ফকা চৌধুরীরা। এই ফকার পুত্রই সাকা যার পুরো নাম সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। স্বাধীনতার পর কারাবন্দি থাকা অবস্থায় বাপের মৃত্যু হলেও যথেষ্ঠ প্রতাপ-প্রতিপত্তি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি ছিলেন বহাল তবিয়তে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দেখা গেছে এই জানোয়ারের নানা ধরনের আস্ফালন ও বেফাঁস কথা। মাদক, স্বর্ণ ও অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন এই অপরাধী যার প্রমাণ পরবর্তী সময়ে পাওয়া গেছে। একাত্তর সালে মুক্তিযোদ্ধা নির্মূলে বাপের সঙ্গে সুযোগ্য পুত্র হিসেবে মাঠে ছিলেন তিনি।

১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের রাউজানে কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয়ে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে নিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক নূতন চন্দ্র সিংহকে গুলি করে হত্যা করে সাকা। এই হত্যাকান্ডের পিছনে ছিলো ফকা চৌধুরীর ক্ষোভ। নিহতের ছেলে প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বলেছেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে নূতন চন্দ্র সিংহ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীর রোষানলে পড়েন।

প্রফুল্ল চন্দ্র সিং জানান, ১৯৭০ এর নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবির পর থেকে ফজলুল কাদের চৌধুরী তার বাবাকে হুমকি দিয়ে আসছিলেন।

প্রফুল্লের ভাষ্যে, “আমরা ছিলাম সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায়। প্রতি নির্বাচনের আগে ফজলুল কাদের চৌধুরী ওই এলাকায় আসতেন এবং বলতেন ‘তোমরা ভোট দেবে, ঠিক…তাই তোমরা ভোট কেন্দ্রে যেয়ো না। তাহলেই আমি বুঝব, তোমরা আমাকে ভোট দিয়েছ।”

“কেউ তার নির্দেশ অমান্য করলে আমাদের ওপর নির্যাতন করা হতো।”

তিনি বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাউজানে গিয়ে নূতন চন্দ্র সিংহের বাড়িতে গিয়েছিলেন। এতেও ফজলুল কাদের চৌধুরী ক্ষুব্ধ হন। মুসলিম লীগের প্রার্থী ফজলুল কাদের চৌধুরী সত্তরের ওই নির্বাচনের আগের রাতে তিনবার তাদের এলাকায় যান।

প্রফুল্ল ট্রাইব্যুনালে বলেন, ফজলুল কাদের তার বাবাকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক উচ্চারণে বলেছিলেন, “তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?”

নূতন চন্দ্রের হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিতে গিয়ে ছেলে প্রফুল্ল বলেন, একাত্তরের ১৩ এপ্রিল সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে নিয়ে কুণ্ডেশ্বরীতে তাদের বাসভবনে ঢুকে তার বাবাকে হত্যা করেন।

“তারা আমার বাবাকে মন্দির থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে, তিনি তখন ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তাকে তিনটি গুলি করেন।”

স্বাধীনতার পর মুসলিম লীগ পান্ডা ফজলুল কাদেরকে বন্দি করা হয়। কারাগারে থাকা অবস্থায়ই মারা যায় সে। আর স্বাধীনতার ৪০ বছর পর কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয় ও কুণ্ডেশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূতন চন্দ্র সিংকে হত্যাসহ একাত্তরে মানবতাবিরোধী ২৩টি অপরাধের ঘটনায় বিচারাধীন সাকা চৌধুরী।