ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে এই প্রকল্পে ঋণচুক্তি বাতিল করেছে বিশ্ব ব্যাংক। ২৯০ কোটি ডলারের এই প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি অর্থ ১২০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা ছিলো তাদের।

আরেক দাতা সংস্থা এডিবি তাদের পথ অনুসরণ করে অর্থায়ন বাতিলের ইঙ্গিত দিলেও অন্য দুই সংস্থা জাইকা ও আইডিবি এ প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে এখনো আগের অবস্থানেই আছে। বিশ্ব ব্যাংকের এই ঋণচুক্তি বাতিলের পিছনে সম্ভাব্য কারণগুলো খতিয়ে দেখলে পাওয়া যায় তিনটি বিষয় যদিও নিজেরাই দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতায় নিমজ্জিত এই প্রতিষ্ঠানটি বলছে শুধু দুর্নীতির কথা।

বিশ্ব ব্যাংকের ভাষ্যমতে এই প্রকল্পে দুর্নীতি যদি হয়ে থাকে তাহলেও তো সরকার তাদের পরামর্শ মতো অভিযোগের আঙুল ওঠা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটা মাত্রায় ব্যবস্থা নিয়েছে। সেতুর কাজ নির্বিঘেœ শেষ করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীকে সরিয়ে দিয়েছে অন্য মন্ত্রণালয়ে। সরিয়ে দিয়েছে প্রকল্প পরিচালক এবং সেতু বিভাগের সচিবকে। কানাডা পুলিশের সহায়তা নিয়ে বিষয়টির তদন্ত চলছে। তাহলে হঠাৎ করে চুক্তি বাতিলের ঘোষণা কেন। তাও চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে ব্যাংকটির সাবেক প্রেসিডেন্ট রবার্ট জেলিকের দায়িত্বের শেষ দিনে। এ বিষয়টি অবশ্যই প্রশ্নের দাবি রাখে। তাহলে সেই বিষয়টি ডশ হতে পারে?

দেশের সবচেয়ে বড় এই অবকাঠামো প্রকল্পের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেছেন, মূল সেতুর ঠিকাদারের প্রাক-যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাংকের সুপারিশ ছিলো একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে। সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় রুষ্ট হয় এই দাতা সংস্থা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক এই অধ্যাপকের বক্তব্য অনুযায়ী, “মূল সেতুর ঠিকাদারের প্রাক-যোগ্যতা নির্ধারণে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ডিজাইন কনসালট্যান্ট ও বাংলাদেশের প্রাক- যোগ্যতা মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশে মতভেদ দেখা দেয়। মূলত একটি চীনা কোম্পানিকে কেন প্রাক-যোগ্য বিবেচনা করা হয়নি, সে বিষয়ে বিশ্বব্যাংক বারবার জানতে চায় এবং তাদের প্রাক-যোগ্য ঘোষণার জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে।”

কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ কমিটি প্রমাণ করে তারা যে অভিজ্ঞতা সনদ প্রস্তাবের সঙ্গে জমা দিয়েছিলো তা ছিলো ভুয়া। তারা বলেছিল, চীনের একটি সেতুতে তারা ইস্পাতের পাইল ব্যবহার করেছে। এর সমর্থনে তারা একটি আলোকচিত্রও জমা দিয়েছিলো। পরে দেখা যায়, আলোকচিত্রের সেতুটি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত।

এই জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ার পরদিন প্রকল্প থেকে সরে যায় চীন ওই প্রতিষ্ঠান। এছাড়া এই প্রকল্পের অন্যান্য সব ক্ষেত্রে পরামর্শক ও অন্যান্য অপারেটর নিয়োগে বিশ্ব ব্যাংকসহ দাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জামিলুর রেজা চৌধুরী জানিয়েছেন। তাহলে ওই অযোগ্য চীনা প্রতিষ্ঠানকে প্রাক-যোগ্য ঠিকাদারের তালিকায় না রাখা কি ভুল ছিলো?

এবার আসা যাক শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনুস প্রসঙ্গে। এই ইউনুস সাহেবকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থপনা পরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার আগে থেকেই তার পক্ষে সরকারের কাছে জোর সুপারিশ এবং চাপও আসতে থাকে মার্কিন মুল্লুক থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশ সফরে এসেও এ বিষয়ে তার অসন্তুষ্টির কথা এবং তথাকথিত ‘দরিদ্রবান্ধব’ গ্রামীণ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। কিন্তু কোনো চেষ্টায়ই ইউনুসকে আবার গ্রামীণ ব্যাংকে ফিরিয়ে আনা যায়নি। একি তাদের জন্য অপমানজনক নয়? এই ইউনুস সাহেব ওই যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের কাছে দিন নেই রাত নেই সব সময় গিয়ে নালিশ জানাচ্ছেন, আকুতি-মিনতি করছেন তার পদ ফিরে পাওয়ার জন্য। আর তার অনুরোধে সাড়া দিয়ে মার্কিন নেতারাও বারবার অনুরোধ জানাচ্ছেন। তারপরেও কাজ হচ্ছে না? কিন্তু বাংলাদেশে তো ইরান বা উত্তর কোরিয়া বা লিবিয়ার মতো পরিস্থিতি বা এ ধরনের কোনো ইস্যু নেই যে একে শাসানো যায়। তাই কি যুক্তরাষ্ট্রের অঙুলি নির্দেশে পরিচালিত বিশ্ব ব্যাংকের তহবিল আটকে দেওয়া ও তা বাতিল করা? প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই বিশ্ব ব্যাংকের যতগুলো প্রেসিডেন্ট হয়েছে তার সবগুলোই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। যুক্তরাষ্ট্র কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই তারা ইরান, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। আর দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বাংলাদেশের অর্থায়ন স্থগিত করা কি তাদের জন্য বড় কোনো ব্যাপার?

এসব প্রশ্ন এড়ানো সম্ভব নয় বর্তমান পরিস্থিতিতে। আমাদের দেশ দুর্নীতিপ্রবণ একথা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এই সেতুতে দুর্নীতির বিষয়টি প্রমাণ হওয়ার আগেই সরকার যেখানে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং তাতে আস্থা রেখেছে জাইকা ও আইডিবির মতো দাতা সংস্থা সেখানে সারাবিশ্বের সবচেয়ে বড় দাতা সংস্থা যাদের তহবিল আসে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী অনেকগুলো দেশগুলো থেকে তাদের এই প্রকল্প বাতিল করার কারণ তো কিছু একটা আছেই। তাদেরই সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই সেতুর ফলে বাংলাদেশের তিন কোটির বেশি মানুষ উপকৃত হবে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে এক দশমিক ২ শতাংশ। তাহলে কেন এভাবে চুক্তি বাতিল করা। এর পিছনে যে কারণই থাক না কেন তা বের করতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।