ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

চট্টগ্রাম জেলা আদালতের আইনজীবী নির্মল চন্দ্র শর্মা সাকা চৌধুরীর যুদ্ধাপরাধের সাক্ষ্যে বলেন, ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল সাকার নিয়ে যাওয়া পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে নিহত হন তার মা, এক চাচা, ভাতিজা ও ছোটো ভাই। তখন গুলিবিদ্ধ হন তার বাবা। আর তিনি নিজে বেঁচে যান ভাগ্যের জোরে-অনেকটা অলৌকিকভাবে। আর এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেন সাকা চৌধুরী- যিনি একাত্তর সালে চট্টগ্রামের রাউজানে চালিয়েছিলেন হত্যাযজ্ঞ।

নির্মল চন্দ্র গত সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে ওই নিষ্ঠুর ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরেন। সেদিন গ্রাম থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও এবং সেজন্য প্রস্তুতি নিতে থাকলে যাওয়ার আগে শেষ খাওয়া খেতে গিয়ে পরপারে চলে যেতে হয় নির্মলের পরিবারের পাঁচ জনকে। বাড়ি ছাড়ার সবাই খেতে বসলে ঘরের দরজায় পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে উপস্থিত হন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। তার উপস্থিতিতেই নির্মলের পরিবারের পাঁচজনকে পাকিস্তানি সেনারা গুলি চালিয়ে হত্যা করে।

ওই দুঃসহ স্মৃতি মনে করে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়া নির্মলের বক্তব্যে পাওয়া যায় সেদিনের ঘটনার চিত্র যেখানে জীবন ভিক্ষা চেয়ে মানুষগুলো পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সাকা চৌধুরীর পায়ে পড়লেও মন গলেনি কারো-নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষগুলোকে হত্যা করা হয়েছে।

১৯৭১ সালের এপ্রিলের প্রথম দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ব্যাপক প্রতিরোধের মুখে পড়ে। এ ঘটনায় আতঙ্কিত হয় নির্মলের পরিবার। ১৩ এপ্রিল খুব ভোরে তারা গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। এরই মধ্যে কাছাকাছি একটি মসজিদ থেকে লাউড স্পিকারে কাউকে বাড়ি ছাড়তে নিষেধ করা হয়। “কারো কিছু হবে না। একটি শান্তি কমিটি গঠিত হয়েছে- মসজিদ থেকে এ ঘোষণা আসায় আমরা আশ্বস্ত হই, ” বলেন নির্মল। এমনকি নির্মল চন্দ্রের এক চাচা পুরো পরিবার নিয়ে গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার পরও ওই ঘোষণা শুনে ফিরে আসেন।

১৩ এপ্রিল সকালে খাবার খাওয়ার সময় বাড়ির দরজায় পাকিস্তানি সৈন্যরা হাজির হয়। “সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তাদের সঙ্গে ছিলেন,” নির্মলের ভাষ্যে। পাকিস্তানি সেনারা নির্মলকে বেরিয়ে আসতে বলে। তারা বারবার নিশ্চয়তা দেয় যে, তাকে আঘাত করা হবে না। কিন্তু সে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে সেনারা চেঁচিয়ে বলে, ‘হ্যান্ডস আপ!’

এরপর নির্মলের পরিবারের সবাই পাকিস্তানি সেনাদের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে থাকা একমাত্র বাঙালি সাকা চৌধুরীর পায়ে ধরে জীবন ভিক্ষা চায়। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। মাত্র ১০ কদম দূর থেকে তাদের ওপর গুলি করা হয়। গুলিতে নির্মলের মা পঞ্চবালার নাড়িভুড়ি বেরিয়ে যায়, পেটে গুলি লাগে ভাতিজার, তার ছোটো ভাই সুনীল ও চাচা জ্যোতিলাল ও মাখনলালও গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যায়।

এভাবে কখনো পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে আবার কখনো নিজের সশস্ত্র ক্যাডারদের নিয়ে চট্টগ্রামে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে মুসলিম লীগ নেতা ও বিখ্যাত রাজাকার ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে সাকা চৌধুরী। এই মানবতাবিরোধী অপরাধ এখনো মানুষ ভুলে যায়নি। এদেশের মাটি থেকে মুছে যায়নি ওই সব শহীদের রক্ত।