ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী ১৯৭১ সালে দলটির ছাত্র শাখা ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি ছিলো। পাকিস্তান রক্ষার নামে স্বজাতির রক্তে রাঙিয়ে তোলে মায়ের বুক। বাঙালির স্বাধীনতা লাভের আকাক্সক্ষাকে ধ্বংস করতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী সংগঠন হিসেবে রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনী গঠন করে সেগুলো দিয়ে বাঙালি নিধনে নেতৃত্ব দেয় নিজামী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ নিজামীর বিরুদ্ধে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৬টি ঘটনায় অভিযোগ গঠন করেছে। তার বিরুদ্ধে চতুর্দশ অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর যশোরে রাজাকারদের এক সমাবেশে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে মুসলমানদের উস্কানি দেওয়ার জন্য কোরআন শরীফের একটি সুরার অপব্যাখ্যা করেন নিজামী। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তারা অনুসন্ধান চালিয়ে এর বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত ও প্রমাণ পেয়েছে বলে প্রসিকিউশন বলেছে।

নিজামীর অন্যান্য যুদ্ধাপরাধের মধ্যে রয়েছে, ১৯৭১ সালের জুনে পাবনায় কাশিমউদ্দিন নামে এক মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা। নিজামীর পরামর্শে পাকিস্তানি সৈন্যরা কাশিমউদ্দিনকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করে এবং তার উপস্থিতিতেই কাশিমকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শান্তি বজায় রাখতে চায়-এ ঘোষণা দেওয়ার জন্য একাত্তরের ১০ মে সাথিয়া উপজেলার বাউশবাড়ী গ্রামের বাসিন্দাদের স্থানীয় রুপসী মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে জড়ো হতে বলে নিজামী। ১৪ মে পাকিস্তানি সেনারা সেখানে পৌঁছে উপজেলার বাউশবাড়ী ও ডেমরা গ্রামের সাড়ে চারশ’ মানুষকে হত্যা করে। সে সময় ৩০ থেকে ৪০ জন নারীকে ধর্ষণ করে তারা এবং অনেককে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। আর এসবই হয় নিজামী ও তার সহযোগীদের সহায়তায়। নিজামী নিয়মিত মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেইনিং সেন্টারে যেতেন যেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতার জন্য রাজাকার, আল বদর ও আল শামস বাহিনীর সদস্যদের অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। এখানেই চোখ বেঁধে এনে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়। অনেক নারীকেও এখানে এনে ধর্ষণ করা হয়।

যুদ্ধাপরাধের ষড়যন্ত্র করতে নিজামী সেখানে যেতেন এবং সেখানে সংগঠিত অপরাধের সঙ্গে তার সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন
বলেছে। ১৯৭১ সালের ৮ মে সাথিয়া উপজেলার করম জা গ্রামে মন্দিরের সামনে লাইনে দাঁড় করিয়ে বেশ কয়েকজনকে গুলি করে হত্যা ও তিন নারীকে ধর্ষণ এবং ওই হত্যাকান্ডের পর লুটপাটের ঘটনায় নিজামী জড়িত ছিলেন। একাত্তরের ১৬ এপ্রিল নিজামী ও তার সহযোগীদের সহায়তায় আড়পাড়া ও ভুতের বাড়ি গ্রামে ২১ জন বেসামরিক নাগরিককে হত্যায় জড়িত ছিলেন নিজামী। নিজামী ও তার সহযোগীদের পরামর্শে একাত্তরের নভেম্বরে সাথিয়ায় মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আওয়ালের বাড়িতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে ৩০ জনকে হত্যা করে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী চলে যাওয়ার পর নিজামীর নেতৃত্বাধীন রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা অন্য ২২ জন বাঙালিকে ধরে নিয়ে ইছামতি নদীর তীরে হত্যা করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বলেছে, মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া ছেলের তথ্য জানতে পাবনায় একাত্তরের ৩ ডিসেম্বর ওই মুক্তিযোদ্ধার বাবাকে হত্যায় জড়িত ছিলেন নিজামী। ১৯৭১ সালের ৩০ অগাস্ট নিজামী ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মো. মুজাহিদ রাজধানীর এমপি হোস্টেলে যান। সেখান থেকে নিজামী শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ছেলে রুমিসহ বেশ কয়েকজন তরুণকে হত্যার নির্দেশ দেন। ১২ ডিসেম্বর পাবনার বেড়া থানার বৃশালিকা গ্রাম ঘেরাও করে ৭০ জনকে গুলি করে হত্যা ও ৭২টি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয় নিজামীর ইঙ্গিতে। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে নিজামীর নির্দেশে স্থানীয় রাজাকাররা সাথিয়ায় অনীল চন্দ্র কুন্ডুর বাড়িতে হামলা করে লুটতরাজ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। অগাস্টে ইসলামী ছাত্র সংঘের চট্টগ্রাম শাখা আয়োজিত এক সভায় মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে মুসলমানদের উস্কানি দেওয়ার চেষ্টা করেন নিজামী। “পাকিস্তান আল্লাহর ঘর–পৃথিবীতে এমন কোনো ব্যক্তি নেই যে পাকিস্তান ধ্বংস করতে পারে,” তখন বলেছিলেন নিজামী। একাত্তরের ২২ অগাস্ট ইসলামিক অ্যাকাডেমি হলে এক সভায় মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের উস্কে দেওয়ার জন্য বক্তব্য দেন নিজামী। পাকিস্তানের শত্রুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নেওয়ার জন্য ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। ৮ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা দিবসে স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরুদ্ধে মুসলমানদের উস্কানি দেন ছাত্রসংঘের সভাপতি নিজামী।
বিজয়ের মাত্র দুদিন আগে এদেশকে মেধ্যশূন্য করতে ১৪ ডিসেম্বর যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড হয় তার নির্দেশ দিয়েছিলেন আল বদর বাহিনীর কমান্ডার নিজামী।

এই নিজামীর গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। গাড়িতে পতাকা নিয়ে নয়, বাইরেই আর মুক্ত বাতাসে নিজামীকে দেখতে চাই না-এ যে মানবতার শত্রু, মানুষের শত্রু, মানবাধিকারের শত্রু, বাঙালির শত্রু ও বাঙলা মায়ের পবিত্র ভূমির শত্রু। মহান পরোয়ারদেগার আল্লাহর কাছে দোয়া করি যাতে এই রাজাকারের বাচ্চা নিজামী ও তার দোসররা ধবংস হোক।