ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যে মন্ত্রিত্ব থেকে ইস্তফা দিয়েছেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। বিষয়টি গত কয়দিন ধরে সরকারি ও বিরোধী দলের নেতারা বিভিন্ন কথা বলছেন। সরকারের পক্ষ থেকে আবুল হোসেনকে সাধুবাদ জানানো হলেও বিরোধী দল তাকে নানা গালি দিয়ে চলেছে। তার নামের সঙ্গে করছে বিভিন্ন বিশেষণ।
মূল ঘটনা প্রবাহের দিকে আমরা নজর দিলে দেখতে পাবো- পদ্মা সেতুতে পরামর্শক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে গত বছর ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি স্থগিত করে বিশ্বব্যাংক। তাদের অভিযোগ ছিল সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকজনও এ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। অর্থায়ন চালিয়ে যাওয়ার জন্য বিশ্ব ব্যাংক যে চারটি শর্ত দিয়েছিল তার মধ্যে চতুর্থটি ছিল- যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই সব সরকারি ব্যক্তি অর্থাৎ আমলা ও রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্তদের তদন্ত চলাকালে সরকারি দায়িত্ব পালন থেকে ছুটি দিতে হবে। এ নিয়ে টানাপোড়েনের পর গত ২৯ জুন ঋণ চুক্তি বাতিল করে বিশ্ব ব্যাংক। এরপর গত সোমবার মন্ত্রিত্ব ছাড়েন ওই সময় যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা সৈয়দ আবুল হোসেন। তার সঙ্গে মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াও ছুটিতে যান, যিনি ওই সময় সেতু বিভাগের সচিব ছিলেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পদ্মা সেতু নির্মাণের বিষয়ে সরকার কি সত্যিই আন্তরিক। আমাদের দেশে যেখানে হরদম দুর্নীতি হয়- দুর্নীতির যেখানে হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে স্বাভাবিক ঘটনা, বিশেষত বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দুর্নীতির যে কালো থাবা এদেশকে পেয়ে বসেছিলো- যেখানে দুর্নীতির জন্য পরপর তিন বার বাংলাদেশ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলো, যেখানে তারেক জিয়া, গিয়াস আল মামুন, মোসাদ্দেক আলী ফালুদের দৌরাত্মে অস্থির হয়ে গিয়েছিলো পুরো দেশ সেখানে দুর্নীতির অভিযোগের মুখে একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ করা সত্যিই ইতিবাচক মনোভাবের পরিচায়ক। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এমনটি দেখা গেলেও বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে তা দেখা যায়নি। বরং পাকিস্তানের চিত্র তো ভয়াবহ-বর্তমান প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চালু করার জন্য পদক্ষেপ না নিয়ে প্রধানমন্ত্রীত্ব হারিয়েছেন ইউসুফ রাজা গিলানি। তার জায়গায় নতুন প্রধানমন্ত্রী হওয়া রাজাও আছেন চাপের মধ্যে। কিন্তু আসিফ আলী জারদারির দুর্নীতির বিষয়টি দেশ-বিদেশে অনেকের কাছেই স্পষ্ট, কারণ স্ত্রী বেনজীর ভুট্টো ক্ষমতায় থাকাকালে তার নামই হয়েছিলো মিস্টার ১০ পার্সেন্ট। সেই আসিফ আলী জারদারি তথা পাকিস্তানের ভাবধারাপুষ্ট বিএনপি নেতারা যখন আবুল হোসেনের পদত্যাগ নিয়ে বিভিন্ন বিশেষণ যোগ করেন তখন সেটা হাস্যকরই লাগে। নিজেদের দিকে ফিরে তাকালে তাদের এ ধরনের মন্তব্য করতে লজ্জা পাওয়ারই কথা।

সৈয়দ আবুল হোসেনের পদত্যাগ অবশ্যই পদ্মা সেতু নির্মাণে সরকারের আন্তরিকতার পরিচয় দেয়। কারণ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের কথা বললেও বিশ্ব ব্যাংকের সহজ শর্তে ঋণ নেওয়াটা দেশের জন্য মঙ্গলজনক। আর তাই বিশ্ব ব্যাংকের শর্ত পূরণে আবুল হোসেনের চলে যাওয়া। তিনি যদি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে থাকেন তাহলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো তাকে দেশপ্রেমিক বলতে আমার আপত্তি নেই। আর যদি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদত্যাগ করেন তবে প্রধানমন্ত্রীই আমার ধন্যবাদ পাবেন। এরপরে যদি বিশ্ব ব্যাংকের কাছ থেকে টাকা পাওয়া যায় তাহলে অবশ্যই তা সবার জন্য মঙ্গলজনক। তাই লন্ডনের হোটেল সেন্ট প্যানক্রসে শেখ হাসিনা যখন বলেন, “তারা (বিশ্ব ব্যাংক) এক মন্ত্রীর দিকে হাত তুলেছে। সে পত্র-পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে আমার কাছে রিজাইন লেটার দিয়ে গেল। তার গাটস্ আছে বলেই রিজাইন দিতে পেরেছে। দেশপ্রেম আছে বলেই রিজাইন দিয়েছে” তখন আমার কাছে অত্যুক্তি মনে হয়নি।

বিশ্ব ব্যাংক আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো তথ্য-প্রমাণ দিতে পারেনি বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। তার কথা সত্য হলে সরকার ও সৈয়দ আবুল হোসেন অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার দেশের স্বার্থ বিবেচনার জন্য।