ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

গত শনিবার মসজিদ নির্মাণকে কেন্দ্র করে দিনাজপুরের চিরির বন্দর উপজেলা পল্লীতে হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকটি বাড়িতে হামলা, মারপিট, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও শ্লীলতাহানীর ঘটনা ঘটেছে। আর এই নিষ্ঠুর হামলার পিছনে জামায়াতে ইসলামীর ইন্ধন রয়েছে বলে জনকণ্ঠের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

আপনাদের কি মনে আছে এই একই ধরনের একটি ঘটনা অল্প কয়েক মাস আগে ঘটে গেছে সাতক্ষীরায়। ‘হুজুরে কেবলা’ নামে একটি নাটক মঞ্চায়ন নিয়ে কয়েকটি হিন্দু বাড়িতে একাত্তরের কায়দায় হামলা চালিয়ে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ওই হামলার পিছনে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীদের ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ও তৎপরতা ছিলো বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়।

চিরির বন্দরের হামলায় আক্রান্তরা ঘটনাটিকে একাত্তরের হানাদার বাহিনীর হামলার চেয়েও বর্বর ও নির্মম বলে মন্তব্য করেছেন। ১৪৪ ধারা জারি ও প্রায় দুই শতাধিক পুলিশ, দুই প্লাটুন বিজিবি ও দুই গাড়ি র‌্যাব সদস্য মোতায়েন করার পরও শনিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কয়েক দফায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের বসতবাড়ির ওপর হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর, মারপিট, লুটপাট, শ্লীলতাহানী ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ১৬ জন আহত হয়। গ্রেপ্তার করা হয় আট জনকে। হামলার শিকার লোকজনদের অভিযোগ জেলা জামায়াতের সাবেক আমির ও চিরিরবন্দর উপজেলা চেয়ারম্যানের উস্কানিমূলক বক্তব্যের পরই তাদের ও তাদের বসতবাড়ির ওপর হামলা হয়। তাদের অভিযোগ হামলাকারীদের মধ্যে অনেকেই সরাসরি জামায়াত ও শিবিরের সঙ্গে জড়িত।

হামলার শিকার ভবেশ চন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে জনকণ্ঠের প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলাকারীরা সবাই বহিরাগত। তাদের মধ্যে যে দু’একজনকে চেনা গেছে তারা সবাই জামায়াত ও শিবিরের কর্মী। স্থানীয় জামায়াত নেতা তৈয়ব হাজীর নেতৃত্বে জামায়াতের কাদের, নিন্দালু, কামু, রফিকুল, রায়হান, লিয়াকত ও সুমনকে তিনি চিনতে পেরেছেন।

এই নরপিশাচদের হাতে শ্লীলতাহানীর শিকার গৃহবধূ শোভা রানী রায় (৩৫) বলেন ‘খান নাই, পাঞ্জাবী নাই, এখনও ক্যানে আমাগোরের ওপর অত্যাচার-জুলুম হবে? তোমহারা কি এই দেশে আমাগোরক থাকিবা দিবেন নাই বাহে?’
হামলার পূর্বাপর

দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মো. জামাল উদ্দীন আহমেদের বরাত দিয়ে জনকণ্ঠের খবরে বলা হয়, চিরিরবন্দর উপজেলার ৬ নং অমরপুর ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের বলাইবাজার এলাকায় একটি অস্থায়ী মসজিদঘর ছিল। ওই মসজিদের জমির মালিক চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন কলেজের প্রফেসর হামিদা খাতুন তাঁর নিজ অর্থায়নে তা পাকাকরণের উদ্যোগ নেন। গত সপ্তাহে মসজিদ ঘরের স্থানে পাকা নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। কিন্তু মসজিদঘর থেকে দুইশ’ গজ দূরে অনেক আগে থেকে একটি কালী মন্দির রয়েছে। ওই এলাকায় মুসলমানের চেয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের বসতি অনেক বেশি। এ কারণেই হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন মসজিদ ঘরটি পাঁচশ’ গজ দূরে নির্মাণ করার প্রস্তাব দেয়।

একে ঘিরে ওই এলাকার হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। শুক্রবার এই মসজিদঘর নির্মাণকে কেন্দ্র করে চিরিরবন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান এবং জেলা জামায়াতের সাবেক আমির আফতাব উদ্দীন মোল্লা উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে জনসাধারণের মধ্যে ধর্মীয় বিদ্বেষের সৃষ্টি করেন। ফলে শনিবার ভোরে অসংখ্য লোক একত্রিত হয়। এদের মধ্যে অধিকাংশ লোক বহিরাগত ও জামায়াত-শিবিরের সক্রিয় কর্মী। সকাল ১১টায় তারা রাজাবাজার গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের ১২টি বাড়িতে স্লোগান দিয়ে হামলা চালায়। তারা ১২টি বাড়ির লোকজনকে বেধড়ক মারপিট করে। তারা শোভা রানী রায়ের শ্লীলতাহানী ঘটায়। এসব বাড়িতে লুটপাট শেষে তারা বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। এতে ১২ জন আহত হয়। মারাত্মক আহত ও অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় ৫ জনকে দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

একাত্তরের ওই পরাজিত শক্তি এখনো দেশকে অশান্ত করতে একের পর এক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই শক্তিকে এদেশ থেকে নিশ্চিহ্ন করতে না পারলে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে। মাঝে মাঝে পত্রিকার পাতায় খবরের শিরোনাম হবে সাতক্ষীরা বা চট্টগ্রাম বা দিনাজপুরে হিন্দুদের ওপর হামলা ও নির্যাতন। সম্প্রতি প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় বাংলাদেশ সরকার ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। যদি এটা সত্য হয় তাহলে হিন্দু সম্প্রদায়ের বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষায় একাত্তরের ওই পরাজিত শক্তি জামায়াত-শিবিরের এইসব নরপিশাচকে আইনে আওতায় আনতে হবে-যাতে আর কোনো সাতক্ষীরা বা চিরিরবন্দর আমাদের সামনে না আসে।